- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সাংস্কৃতিক কর্মীদের দুর্দিন, পেশা ছাড়ছেন অনেকে

বিশেষ প্রতিনিধি ও পুলক রাজ
করোনা মহামারিতে থেমে গেছে সংস্কৃতির ‘রাজধানী হিসেবে খ্যাত’ সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক কর্মকা-। মধ্য মার্চ থেকে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা হয় এমন মিলনায়তনগুলো বন্ধ। উন্মুক্ত স্থানে কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না। এমনকি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরে যে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে, সেগুলোও এখন বন্ধ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে মারাত্মক সংকটে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা। আয়-উপার্জনহীন হয়েছেন অনেকে। সুনামগঞ্জ শহরের সাংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৬৫ টি সংগঠনের মধ্যে প্রায় ১০০ কর্মী দীর্ঘ সাত মাস ধরে সংস্কৃতি চর্চা থেকে দূরে। এদের মধ্যে অনেকেই পেশা বদল করেছেন।
সঙ্গীত শিল্পী ও তালযন্ত্রী পংকজ রায় বলেন, বিভিন্ন শহর এবং শহরের বাইরে গান গেয়ে সংসারে অনেক সহযোগীতা হতো। অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমি আবার তালযন্ত্রও মেরামত করি। করোনায় আয় কমে গেছে। অনেক সংস্কৃতি কর্মীদের দেখাই পাওয়া যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ বন্ধন থিয়েটার সাধারণ সম্পাদক নাট্যকর্মী ও তবলা বাদক অমিত বর্মন বলেন, যারা একবারে সাংস্কৃতিক কর্মকা- ছাড়া কিছুই করে না তাদের দিন খারাপ চলছে। সংসারের
তাগিদে কর্ম পরিবর্তন করছেন। দোকানে চাকরি করছেন, ব্যবসা করছেন, দিন মজুরের কাজ করছেন। আমিও ব্যবসা করছি।
তিনি বলেন, সবাই যদি ভিন্ন কাজে চলে যান তাহলে সাংস্কৃতিক কর্মকা- বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারকে এই পেশার মানুষদের সহযোগীতায় এগিয়ে আসতে হবে।
তবলা শিল্পী কপিল পদঋষি বলেন, করোনার আগে জীবনটাই ছিলো অন্য রকম। মাসে অনেক স্টেজ প্রোগ্রাম করে ভালো টাকা রুজি করা যেতো। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ তাই খুব কষ্টে আছি।
কালচারাল ফোরাম’র সভাপতি ও সঙ্গীত শিল্পী সোহেল রানা বলেন, সঙ্গীত রক্তে মিশে গেছে। সঙ্গীত ছাড়া চলা সম্ভব হবে না। দীর্ঘ ৭ মাস যাবত স্টেজে গান করছি না। কবে যে এই মহামারি যাবে তার অপেক্ষায় আছি। স্টেজ প্রোগ্রাম করে সংসারে অনেক সহযোগিতা হতো, এখন তাই ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছি।
সঙ্গীত শিল্পী বাউল কানু বলেন, করোনা ভাইরাসে আমাদের থমকে দিয়েছে। আমরা মানুষের সামনা সামনি থেকে গান গাইতে পাড়ছি না। জেলা ও জেলার বাইরে প্রোগ্রামে গেলে কিছু আর্থিক সম্মানী পেতাম এখনতো সব বন্ধ।
সদর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী’র সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার চন্দ বলেন, লালন, হাছন, রাধারমণ, করিম এঁদের বাদ দিয়ে যেমন বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে চিন্তা করা যায় না। তেমনই আমরা যারা সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে জড়িত তাদেরকে বাদ দিয়ে সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকে চিন্তা করা যাবে না। মার্চ মাস থেকে করোনা মহামারির কারনে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে অন্য সব সেক্টরের মতো শিল্পী, মিউজিশিয়ান, নাট্যকর্মী, সংগঠক এবং কলাকুশলী সহ সংস্কৃতির সাথে জড়িত মানুষ বেকার হয়ে পরেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর্থিক অনুদান, জেলা শিল্পকলা একাডেমী ও জেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় কয়েকবার ক্ষতিগ্রস্ত সংস্কৃতিকর্মীদের সাহায্য করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য।
তিনি বলেন, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতিকর্মীরা জীবিকা বদল করে পরিবারের খরচ যোগানোর চেষ্টা করছেন। আমরা সরকারের কাছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পুনরায় শুরু করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। নইলে মেধাবী সংস্কৃতিকর্মীরা হারিয়ে যাবে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাবেল বলেন, সুনামগঞ্জের বিপুল সংখ্যক শিল্পীরা করোনার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অর্থিক সংকটে পতিত হয়েছেন। বিশেষ করে যে শিল্পীগণ সরাসরি শিল্পকে উপজীব্য করে জীবন ধারণ করেন। তাদের আর্থিক সংকট ভয়াবহ। যদিও সরকারি ভাবে এ জেলার ৯০ জন শিল্পীকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। তবে তা বাস্তবতার নিরিখে খুবই অপ্রতুল। জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকেও কয়েক দফায় জেলা সদরের অসংখ্য শিল্পীদের উপহার সমগ্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পেশাদার শিল্পীদেরকে করোনা ভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য করছে। হয়তোবা করোনা সংকট কেটে যাওয়ার পর অনেক শিল্পী তার পূর্বের পেশায় আসবেন না।
জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীন বলেন, করোনা ভাইরাসের জন্য অনেক সাংস্কৃতিকর্মী বেকার হয়ে পরেন। আমরা ধারাবাহিকভাবে উপহার সামগ্রী তাদের ঘরে ঘরে পাঠিয়েছি। ঈদে সামগ্রীর সাথে অর্থও দেওয়া হয়েছে। স্টেইজ প্রোগ্রাম বন্ধ হওয়ায় অনেকেই জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিকর্মীদের হাতে সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিকর্মীদের ভাতার ব্যবস্থা করার। তিনি বলেন সকল সাংস্কৃতিকর্মীদের কাছে অনুরোধ থাকলো তারা যেন সব সময় সাংস্কৃতিক চর্চা চালিয়ে যান।

  • [১]