- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সাত কোটি বাঙালি অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-বঙ্গবন্ধু

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১-এর ১০ মার্চ ছিল বুধবার। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ৭ মার্চে সূচিত পূর্বঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের তৃতীয় দিবস। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সমস্ত সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দশম দিনের জন্য বন্ধ রয়েছে। দেশব্যাপী সর্বাত্মক অসহযোগে কার্যত পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানচিত্রের সাথে সজ্জিত বাংলাদেশের পতাকা প্রতিটি পরিবারের ছাদেও উড়ে, এমনকি রাজারবাগ পুলিশ লাইন, থানা, হাইকোর্ট এবং বিচারপতি নিবাসেও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এদিন নারায়ণগঞ্জের সাব-জেলের ২২৩ জন কয়েদি পলায়নকালে পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়। বিগত ৩ ও ৪ মার্চে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে যারা আহত হয়েছিল, আজ তাদের মধ্যে এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদের মৃত্যুবরণ করে।
আগের দিন পল্টন ময়দানে ন্যাপ প্রধান মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর শেখ মুজিবের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থনের প্রতিফলন দেখা যায় বামপন্থীদের মাঝে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থিদের অংশগ্রহণ আরো শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবপড়ে পশ্চিম পাকিস্তানেও। আন্দোলনের তীব্রতা বুঝতে পেরে পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো তাদের সুর পাল্টে ফেলে। এদিন পাকিস্তানী জান্তা নিয়ন্ত্রিত বাংলা সংবাদপত্র ‘দৈনিক পাকিস্তান’ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল ‘আর দেরি নয়’। এছাড়া ‘দি পিপল’ পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তানে রক্তপাতের জন্যে ভুট্টোকে দায়ী করে লেখে, ‘বাঙালির রক্তপাতের জন্যে ভুট্টো দায়ী’ সেখানে অতিসত্বর জনপ্রতিনিধিদের কাছে শাসনভার বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
এদিন বঙ্গবন্ধু বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতি প্রকৃত ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে ধানম-িস্থ বাসভবনে লন্ডন টাইমস পত্রিকার সাংবাদিককে বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালি আজ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং যে কোনো মূল্যে এ অধিকার আদায়ে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ পর্যন্ত বাঙালিরা বহু রক্ত দিয়েছে। এবার বাঙালিরা এ রক্ত দেওয়ার পালা শেষ করতে চায়।’
বর্তমান গণবিক্ষোভের কারণ ব্যাখ্যা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘৭ কোটি বাঙালি আজ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি চায়। এ ব্যাপারে তারা কোনো আপস করতে রাজি নয়। বিগত ২৩ বৎসর যাবৎ এ দেশকে শাসক ও শোষক শ্রেণি কলোনি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বাঙালিরা আজ শাসন ও শোষণের অবসান চায়। খাদ্য সমস্যা সমাধানসহ দেশ ও জনগণের স্বার্থে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও প্রণয়ন করার ক্ষমতা বাঙালিদের নাই। দেশের জনসাধারণ আজ অমানুষিক ও দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। বাংলার মানুষের এসব বিষয় বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরুন।’
বিকেলে ওয়ালীপন্থী ন্যাপের উদ্যোগে শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলার দাবিতে ঢাকা নিউমার্কেট এলাকায় পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সভাপতিত্ব করেন। ‘লেখক-শিল্পী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে লেখক ও শিল্পীরা রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। নিউইয়র্কে প্রবাসী বাঙালি ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ছাত্ররা নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি করে মহাসচিব উ-থান্টের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন।
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে কর্মীসভা হয়। কর্মীসভায় ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরিত স্বাধীন- বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এক বিবৃতিতে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি পাকিস্তানী উপনিবেশবাদী সরকারের সাথে সহযোগিতা না করার আবেদন জানান।
ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশে জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই আজ শেষ কথা। বাংলাদেশের জনগণের নামে আমরা যে নির্দেশ দিয়েছি- সেক্রেটারিয়েটসহ সরকারি ও আধা সরকারি অফিস-আদালত, রেলওয়ে, স্থল এবং নৌ-বন্দরসমূহে তা পালিত হচ্ছে। যারা মনে করেছিল, শক্তির দাপটে আমাদের ওপর তাদের মত চাপিয়ে দেবে, বিশ্বের কাছে আজ তাদের চেহারা নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। বিশ্বজনমতের কাছে তারা বাংলার নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর শক্তির নগ্ন প্রয়োগের যৌক্তিকতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। এতদসত্ত্বেও বিবেকবর্জিত গণবিরোধী শক্তি তাদের সশস্ত্র পথই অনুসরণ করে চলছে। তাদের সমরসজ্জা সমানে অব্যাহত। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনীর লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র আসছে। রাজশাহী ও রংপুরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। বিনাশী শক্তির এই সমাবেশ ঘটিয়েও মনোবাঞ্ছা তাদের পূরণ হয়নি। তাই ক্ষমতাসীন চক্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মারণ আঘাত হানার চক্রান্তে মেতে উঠেছে। দীর্ঘ ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশে জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশার আরও অবনতি ঘটানোর জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোবৃত্তি নিয়ে আজ তারা এ চক্রান্তে লিপ্ত। সর্বত্র এক ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে বিদেশি বিশেষজ্ঞগণকেও তারা ভীতসন্ত্রস্ত করে বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। সামরিক সজ্জা অব্যাহত রেখে বাংলার বুকে তারা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। যাবতীয় কাজকর্ম আজ বন্ধ। এমনকি বন্যাদুর্গত এলাকার রিলিফ ও পুনর্বাসনের কাজকর্মও স্থগিত রয়েছে। ত্রাণ-পীড়িতদের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে যে উদারহস্তের প্রচুর সাহায্য এসেছে বারংবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও আজতক তার হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের কর্মচারীদের অপসারণের অনুমতি দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর লোকেরা বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশিদের জীবন ও ধনসম্পত্তি কতটা বিপন্ন করে তুলেছেন- মহাসচিবের এমন উদ্যোগে তারই স্বীকৃতি মেলে। জাতিসংঘের সদস্যদের বোঝা উচিত যে, কেবল জাতিসংঘের সদস্যদের অপসারণের ব্যবস্থা করলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেননা, যে হুমকি আজ উদ্যত হয়েছে, সে হুমকি গণহত্যার হুমকি। সে হুমকি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য। আর তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না করে তাদেরকে গণহত্যার হুমকির মুখে ফেলে রাখা জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক মানবাধিকার সনদ লঙ্ঘনের শামিল। মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বসবাসের অধিকার অর্জনের জন্য বাংলাদেশের আপামর মানুষ সর্বস্ব পণ করে শেষমুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ। তাদের এই উচ্চ মনোবল স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষমাত্রেরই অনুপ্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের মানুষ জানে, ইতিহাসের রায় তাদেরই অনুকূলে। ধ্বংসকারী যত অস্ত্রেই সজ্জিত থাকুক না কেন, কোনো শক্তিই আর তাদেরকে চূড়ান্ত বিজয় হতে বঞ্চিত করতে পারবে না।’
এদিকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান ও তাহরিখ-ই-ইশতিকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান এদিন করাচীর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। এদিন তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনবার দেখা করেন এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একান্তে আলোচনা করেন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবের ওপর কোনোরূপ দোষ দেবার আমি কোনো কারণ দেখি না। তিনি সঠিক এবং ন্যায্য ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে এ ছাড়া তার পক্ষে অন্য কোনো ভূমিকা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আমি তার এ অবস্থানকে সমর্থন করি।’
করাচিতে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য ১৩ মার্চ ঢাকায় আসবেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমতা যাতে হস্তান্তর করা যায় সে জন্য আগে আমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের চেষ্টা করতে হবে।
ব্যাঙ্কে টাকা তোলার আবার নতুন সময় করা হয়েছে- নয়টা-বারোটা। এখন থেকে শেখ মুজিবের নির্দেশে তাজউদ্দিন মাঝে মাঝে খবরের কাগজে বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশ দিতে থাকবেন।

  • [১]