- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সামাজিক অস্থিরতা ও দায় চাপানোর সংস্কৃতিঃ আমার সাদামাটা সুরতহাল

মোঃ হারুন-অর-রশীদ
নিকট অতীত এবং সাম্প্রতিক সময়ে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যা, শিশু হত্যা, ভিন্নধর্মী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্দিষ্ট ও নৃশংস পন্থায় হত্যা, ব্লগার পীর ও সমকামীদের হত্যা, এসপি পতিœ হত্যা ইত্যাদি হত্যাকান্ড জনমনে এবং সমাজ জীবনে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে, অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এ সমস্ত অন্যায় ও বিবেক বর্জিত নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রতিনিয়ত বক্তৃতা-বিবৃতি, সেমিনার, মানববন্ধন হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ও টেলিভিশনের টকশোগুলোতে বিস্তর এবং বিশদ বিশ্লেষণ, বিষোদগার এবং দায়-দায়িত্ব নিরুপনের নামে অনেকটা দায় চাপানোর নির্দয় মহোৎসব চলছে। প্রতিক্রিয়ায় দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ও মাত্রার অভিযান, সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা হচ্ছে মাঝে মধ্যে। এ সমস্ত অভিযান নিয়েও  চলছে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা যা অনেকাংশে একপেশে এবং বিরক্তিকর বটে। মোদ্দাকথা এ সমস্ত জঘন্য নির্মম ও নৃশংস হত্যকান্ড কিছুটা কমলেও একে নির্মূল করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা, হতাশা, আস্থা ও বিশ্বাসহীনতা তৈরি হচ্ছে যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন ও বিনষ্ট করছে।
বাংলাদেশে এই ভয়াবহ সামাজিক অপরাধের সংখ্যা যত বাড়ছে ততই দেশ ও জাতির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই, পেশাজীবি ও বিশ্লেষক নামধারীদের কিছু অংশ বিশেষ করে এক শ্রেণীর মিডিয়া দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পুলিশের দায়িত্বহীনতা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা ও অকর্মন্যতাকে দায়ী করে চলেছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর সমস্ত দায় ও দোষ চাপিয়ে তারা তাদের কর্তব্য শেষ করেন। কিন্তু এর সামাজিক কারণ অনেকেই অনুসন্ধান করেন না।
বিখ্যাত মার্কিন লেখিকা ও সমাজ তত্ত্ববিদ Pearl S Buck এর উপন্যাস “Angry Wife” (রাগী বউ) এর প্রসংগ আপনাদের সামনে আনতে চাই। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে লেখিকা Pearl S Buck   ১৯৪৬ সালে উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। এই উপন্যাসে লেখিকা নিখুতভাবে দেখিয়েছেন যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ এবং দাঙ্গা হাঙ্গামা কি করে একটি জনগোষ্ঠীর ব্যক্তি ও সমাজ জীবন এবং মন মানসিকতা সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে।
লেখিকা উপন্যাসটি শুরুই করেছেন একজন সাধারণ দম্পতির জীবনাচারণ দিয়ে। Pierce Delaney এবং  Lucinda Delaney দম্পতির জীবন ছিল খুবই সুখের এবং রোমান্টিক। তারা ছিল গ্রামের সহজ সরল এক সুখী দম্পতি, বিশেষ করে গৃহবধু Lucinda Delaney এর স্বামী Pierce Delaney ছিলেন সহজ সরল হৃদয়বান গ্রামের মানুষ। তিনি তার স্ত্রী Lucinda Delaney কে গভীরভাবে ভালবাসতেন। কিন্তু  গৃহযুদ্ধের ধাক্কায় তাকেও যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। দীর্ঘকাল তাকে থাকতে হয়েছিল যুদ্ধের মাঠে। ঘরে ফিরতে পারেননি। গৃহযুদ্ধের অবসানে তিনি ঘরে ফিরলেন। বহুকাল নারীসঙ্গ বর্জিত পুরুষ। এতোদিন পর স্ত্রীকে কাছে পেয়ে আসঙ্গ লিন্সায় তার উপর ঝাঁপিয়ে পরেন, স্ত্রীও সানন্দে ধরা দিলেন স্বামীর  বাহু বন্ধনে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন, একি, তুমি আমাকে ব্যথা দিচ্ছো কেন? দস্যুর মতো আমাকে খাবলে খেতে চাও নাকি? আগেতো তুমি এমন ছিলে না।
এই একটি সংলাপের মধ্য নিয়ে উপন্যাসটিতে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের আগের এবং পরবর্তীকালের সমাজ ও ব্যক্তি মানুষের মন-মানসিকতায় বিরাট পরিবর্তনের চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও প্রাপ্তি যাই হোক, যুদ্ধ সফল বা ব্যর্থ যেটাই হোক, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বাই প্রডাক্ট হল যুদ্ধ মানুষের চরিত্র বদলায়। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সহিংসতা ও হিং¯্রতার বিস্তার ঘটায়। গৃহযুদ্ধের আগে যে স্বামী ছিলেন একজন হৃদয়বান কোমল স্বভাবের প্রেমিক পুরুষ, যিনি সহজ সরল স্ত্রীর প্রতি ছিলেন ভালবাসায় অনুরক্ত, সহানুভূতিশীল। যুদ্ধের মাঠ থেকে তিনি ফিরে এসেছেন কঠোর হৃদয় এক ধর্ষকের মতো চরিত্র ও আচরণ নিয়ে যা তার স্ত্রীকেও বিচলিত করছে। ক্রুদ্ধ করেছে। গৃহযুদ্ধের পর মার্কিন সমাজ জীবন ও ব্যক্তি জীবনে  যে বড় ধরনের একটি পরিবর্তন ঘটে, তার নিখুঁত ছবিটি ধরা পড়েছে  Pearl S Buck এর উপন্যাসটিতে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নাৎসি বর্বরতায় জর্জরিত ইউরোপের দেশগুলোতে মানুষের মনেও তাদের অজান্তে এই বর্বরতার বিষ সংক্রমিত হয়েছিল। দেশগুলোতে খুন, জখম, ধর্ষণের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন সমাজ জীবনে মানসিক অসুস্থতার মাত্রা ও হিং¯্রতা বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল। আমেরিকাসহ কোনো কোনো দেশে অসুস্থ মানসিকতার তরুণ স্কুলগৃহে ঢুকে নির্বিচারে শিশু হত্যা করেছে। সমুদ্র সৈকতে নিরীহ ¯œানার্থী নরনারী হত্যা করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এই বর্বর ঘাতকদের কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা তরুণ সৈন্য। যুদ্ধের হিং¯্রতা তাদের মানসিকতা বিকৃত করে ফেলেছে। তাদের মধ্যে অকারণ হিং¯্রতার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর সামাজিক অপরাধ বহুগুণ এবং বহুমাত্রায় বেড়েছে। খুন, জখম, ধর্ষণ এখন সংবাদপত্রের নিত্য নৈমিত্তিক খবর। সম্প্রতি সিলেটের শহরতলী কুমারগাঁওতে শিশু রাজনকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা, ভিডিও ধারণ তা সংবাদপত্র, টিভির কল্যাণে বিশ্ববাসী দেখেছে এবং বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তারই কয়েকদিন পরে সিলেটের আম্বরখানায় রাস্তার উপর একজন মহিলা দর্জি অসুস্থতার জন্য তিন দিন কর্মস্থলে না আসতে পারায় মালিক কর্তৃক তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে শতশত লোকের সামনে নির্মম লাঠিপেটা করে আহত করা হয়। অথচ শতশত লোক শুধু নির্বাক নির্দয় হৃদয়ে তা দেখেছে প্রতিরোধের চেতনায় তাড়িত না হয়ে। সমসাময়িক সময়ে খুলনায় মোটর গ্যারেজের শিশু শ্রমিক রাকিবকে সামান্য অজুহাতে তার মলদ্বার দিয়ে মেশিনের সাহায্যে বাতাস ঢুকিয়ে তার করুণ কাকুতিকে উপেক্ষা করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পবিত্র শবেবরাতের রাতে সাভারের আমিন বাজারে পাঁচ যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা, যশোরে তিন যুবককে পিটিয়ে হত্যা ইত্যাদি বাঙালির সমাজ জীবনের সহজ সরল চেতনাকে বিপুলভাবে নাড়া দিয়েছে। কেউ যদি কোন অপরাধ করে থাকে সেজন্যে আইন আছে, আদালত আছে। তাদের পিটিয়ে বা কুপিয়ে মারার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। এসব হত্যাকান্ড বিচার নয়, বর্বরতা।
বাঙালিকে এককালে বলা হত ভেতো বাঙালি, মার খেয়েও যারা মার দিতে জানতো না। স্বাধীনতার পর  তাদের চরিত্র এমন রাতারাতি পাল্টে গেল কেন, ভেতো বাঙালি কি করে নিষ্ঠুর বাঙালিতে পরিণত হলো, যারা অপরকে মারতে জানতো না, তারা কেন এখন অকারণে অপরকে হত্যা করে, নারী শিশু বাছ বিচার করে না, গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে তার কারণ অনুসন্ধান এবং এই ক্রমবর্ধিষ্ণু সমাজব্যাধি নিরাময়ের উপায় সম্পর্কেও আলোচনা হওয়া উচিত। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেও  এই সামাজিক ব্যাধি বাড়ছে; কিন্তু তার প্রতিকার নিয়েও খোলামেলা আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে তা হয় না। সরকারের উপর দোষ চাপিয়ে অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার দোষত্রুটি দেখিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের আলোচনা ও গবেষণা শেষ হয়।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা এনেছে, সেই সঙ্গে আমাদের সামাজিক জীবনেও বিরাট পরিবর্তন এনেছে। যুদ্ধ মানুষের চরিত্র বদলায়, সমাজ ও ব্যক্তি মানসে হিং¯্রতার বিস্তার ঘটায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শহর গ্রাম থেকে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের কর্তৃক নির্মম পৈশাচিক হত্যাকান্ড, নারী ধর্ষণ, লুটপাট হয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা জাতির মুখপাত্র, জাতির বিবেক, দেশগড়ার কারিগর। তারা জাতির অমূল্য সম্পদ। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা আমাদের এই বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে। মায়ামমতা, সামাজিক বন্ধন এবং আদর্শের ধারণ, লালন ও বিপণন করে মায়েরা। সেই মা-বোনদের নির্বিচারে ধর্ষণ করে তাদের সম্ভ্রমহানি করা হয়।  মা-বোনদের ইজ্জত লুটে নেয়া মানে দেশকে ইজ্জতহীন করা, আদর্শহীন করা। সর্বোপরি, দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের সম্পদ লুন্ঠন করে ভিখারীর দেশ বানানো হয়, বুভুক্ষ করা হয় সমগ্র জাতিকে।
যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী এদেশে যে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যবোধ ধ্বংস করে গিয়েছিল তা  পুননির্মাণ এবং পুনর্গঠনের কোন সচেতন চেষ্টা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র ফেরত নেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও তাদের প্রশিক্ষণকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে না লাগিয়ে তাদের একটি অংশকে নানারকম আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে তাদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেছিল। তাদের মধ্যে বেকার একটা অংশ বিপথগামী হয়েছে।
যুদ্ধের পর শুধু বিধ্বস্থ ঘর বাড়ী নয়, মানুষের বিধ্বস্ত মন মানসিকতাও পুননির্মাণের  প্রয়োজন হয়। নইলে যুদ্ধ মানুষের মনে ধ্বংস প্রবণতা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বহু দেশে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে ইরাক-ইরান ও আফগানিস্তান সহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের পর সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ইউরোপের সাথে বাংলাদেশের পার্থক্য হল- ইউরোপের বহু দেশে যুদ্ধের পর “Movement for moral re-armament”  নামে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আন্দোলন হয়েছে যা বাংলাদেশে হয়নি। ফলে বাংলাদেশের সমাজ মানসে ইতিবাচক কোন পরিবর্তন হয়নি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে যেহেতু সমাজ ও ব্যক্তি মানসে পুননির্মাণ ও পুনর্গঠনের কোন সচেতন চেষ্টা হয়নি বরং বড় একটা অংশ নানা শ্লোগানে ও নানা ধ্যান ধারণায় বিপথগামী হয়েছে। ফলে তারা নির্মম হত্যা, অপহরণ ও জিঘাংসায় মেতে উঠে। একই সাথে দেশে লুটেরাতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। দেশে একটা বিশাল সুবিধাবাদি ও ভোগবাদি শ্রেণী তৈরি হয়েছে যাদের কাছে কোন ধরনের মূল্যবোধের কোন মূল্য নেই। তারা সহজেই অন্যের গলা ও হাত পায়ের রগ কর্তন করতে পারে। কখনো তা ধর্মের নামে, কখনো রাজনীতির নামে।
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেশের তরুণ প্রজন্মকে ঠিকভাবে তাদের আদর্শকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দলীয় স্বার্থে তাদের বিপথগামী করেছে। ছাত্র রাজনীতিকে বিপথগামী বা দুর্বৃত্তায়নের দায়িত্ব দেশের সব রাজনৈতিক দলগুলোকে বহন করতে হবে। সামরিক শাসকেরাও তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে ছাত্র রাজনীতিকে বিপথগামী করার জন্য তাদের হাতে টেন্ডার, লাইসেন্সসহ অস্ত্র তুলে দেয়। কাউকে আবার সম্মানীয় রাষ্ট্রীয় পদ মর্যাদা দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় তাদের মধ্যে আত্মঘাতী নৃশংস খুনোখুনি, সুবিধা লোটার নির্মম খেলা। এর ধারাবাহিকতা হ্রাস না পেয়ে বর্তমান পর্যন্ত অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলেছে।
অতি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতার নতুন মাত্রা ও পদ্ধতি যোগ  হয়েছে।  সোশাল মিডিয়ায় অতি আসক্তি এবং সামাজিক  ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এর প্রধান কারণ। প্রযুক্তি কিংবা প্রাযুক্তিক সুবিধা মানুষ যেকোনো সময়ই লাভ করতে পারে। একটু আগ্রহ ও প্রশিক্ষণ এবং কিছুটা সময়ই এর জন্য যথেষ্ট। ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমÑ একথাও সত্য। কিন্তু এতে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি এর ইউজারদেরকে যে তাদের চারপাশের জীবন ও জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়Ñ এটাও তো অনেক বড় সত্য। মানুষের সাথে মানুষের  যে সম্পর্কÑ সেটা মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। এই সম্পর্ক মানুষকে অনেক কষ্টে, অনেক শ্রম ও সময়ের বিনিময়ে তৈরি করে নিতে হয়। একদিনে এই সম্পর্ক যেমন তৈরি হয় না তেমনি মানবিক দুর্যোগেও এই সম্পর্ক এগিয়ে আসে। ফেসবুকের বন্ধু নয় বরং মানবিক সংস্পর্শের মাধ্যমে সৃষ্ট বন্ধুত্বই ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্য অনেক বেশি জরুরি। যেভাবে একলা তরুণের কান্না-হাসির ‘সঙ্গী’ হয়ে ওঠছে ফেসবুকÑ সেখানে সম্ভাবনার চেয়ে শঙ্কাই বেশি দেখা যাচ্ছে। কেননা, যদি এভাবেই চলতে থাকে তবে ভবিষ্যতে তারুণ্যের মাঝে যে বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম হবে, ক্রমাগত সেটা প্রকট হবে এবং বিস্তার ঘটবে। আর এর পরিণতি কতোটা ভয়াবহ হতে পারে সেটা আমরা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি নামের রেস্তোরা এবং শোলাকিয়ার ঈদগাহে বেদনাবিধুর শোকাবহ ঘটনায় অনুমান করতে শুরু করেছি।
অবশ্য এই সমস্যাটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। সাংস্কৃতিকভাবে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা আমাদের দেশে সংকুচিত হয়ে আসছে। তরুণরা এখন ফেসবুক, ট্যুইটার, ইন্টারনেট এগুলোর মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সামজিকভাবে এই তরুণরা যে অন্যদের সঙ্গে মিশবে, বড় জায়গায় যাবে, খেলাধুলা করবে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হবে তা হচ্ছে না। এমনকি তারা যে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা পেয়েছে সেখানেও  এ বিষয়গুলো নেই। ফলে তাদের সাংস্কৃতিক জীবন সংকুচিত এবং তারা সামাজিকভাবেও বিচ্ছিন্ন। অর্থাৎ একদিকে নতুন প্রজন্মের সাংষ্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল অন্যদিকে তাদের বিচ্ছিন্নতাবোধও প্রবল হয়ে উঠছে। এর ফলে এরা বড় ও দুঃসাহসিক কাজের দিকে ঝুঁকছে এবং কোন কাজটি ভালো এবং কোনটি  মন্দ তা বিচার করতে পারছে না। এ কারণে তারা নিজেদের লক্ষ্যও স্থির করতে পারছে না। এর সঙ্গে আবার আর্দশহীন রাজনীতি এবং সংকীর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামির অশুভবলয় এসব তরুণদের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্বক কাজের জন্য প্ররোচনা দিচ্ছে।
আসলে এখন দরকার আমাদের আর্থ-সামাজিক  ব্যবস্থা ও রাজনীতি থেকে হিংসা ও সন্ত্রাস দূর করার জন্য তার কারণ ও প্রতিকারের পন্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। অর্থনৈতিক উন্নতি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়কে কমাচ্ছে না বরং বাড়াচ্ছে। ঘরে ঘরে সন্ত্রাস লালন করছি নিজেদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সুবিধার জন্য।
ভেতো বাঙালির চরিত্র পরিবর্তন একটি আকস্মিক ঘটনা নয়। আবার আকস্মিকভাবে তার অবসানও ঘটবে না। এই সর্বগ্রাসী সামাজিক ব্যাধিটি দূর করার জন্য একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আন্দোলন করা প্রয়োজন। সমাজের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য সরকারেরও উচিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয় রোধের পরিকল্পনা গ্রহণ। সর্বাগ্রে আমাদের রাজনীতিতে সন্ত্রাসের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনা আবশ্যক। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, Democracy বা গণতন্ত্র কোন সরকার ব্যবস্থা নয়। Democracyএকটা মূল্যবোধ। আর এই মূল্যবোধ হল অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা (respect)  করা, অন্যের সমালোচনা সহ্য করে গঠনমূলকভাবে সংশোধন হওয়া। Democracyমানে সংখ্যাগরিষ্ঠের জবরদস্তি নয়।
ধর্ম এক জিনিস। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অন্ধত্ব আরেক জিনিস এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা ধর্মীয় রাজনীতি আরেক বস্তু। ধর্ম মানুষকে হিংসা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে, অন্তর নির্মল হয়ে সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তা করে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে। ধর্মীয় রাজনীতি মানুষকে অসহিষ্ণু ও হিং¯্র করে তোলে।
এই পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে ধর্ম ছিল। ভবিষ্যতেও ধর্ম স্বমহিমায় থাকবে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি থাকতেই হবে। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিও থাকবে। কোনটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেউ কারও জন্য বাধা নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজের সহাবস্থান অতীতে যেমন করেছে, এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতেও তেমনিভাবে করবে। তবে যখন এই তিনের মধ্যে কোনো কারণে বিরোধ দেখা দেয়, তখন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে তার মীমাংসা করা।
অন্যদিকে শুধু বল প্রয়োগ করে বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সমাজ থেকে এ ধরনের গুরুতর সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। অপরাধী গ্রেফতার করে বা কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে এর প্রতিকার মিলবে না। বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লালনভূমির যে জায়গা সেটিকে পরিষ্কার করতে হবে। এ জায়গাগুলোয় বন্ধ্যাত্ব এসেছে একে উর্বর করতে হবে। তরুণদের মানসিক বিকাশে সমাজের জন্য মঙ্গলজনক আদর্শবাদকে উৎসাহিত করতে হবে। এ কাজে সবাইকে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। কারো উপর দায় না চাপিয়ে। দায় কম বেশি সবার।
লেখক:পুলিশ সুপার, সুনামগঞ্জ। বিপি-৭০৯৮০২০৮৬৬

  • [১]