শুক্রবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে চার চারটি সংঘর্ষের ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। ‘সংঘর্ষের শুক্রবার’ প্রধান শিরোনামের আওতাভূক্ত করে জেলার দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের পৃথক চারটি সংঘর্ষ ঘটনা নিয়ে এই সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংঘর্ষের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এর পিছনে খুবই তুচ্ছ সব কারণ পাওয়া যাবে। এসব কারণে রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটনার কোনই প্রয়োজন থাকে না। এসব ঘটনা কেন কোন ঘটনাই শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী কিংবা প্রাণঘাতি সংঘর্ষে পরিণত হোক সেটি কারও কাম্য নয়। শুক্রবার চার উপজেলায় সংঘর্ষে আহত ব্যক্তির সংখ্যা (সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে) ৭০ জন। দোয়ারাবাজারের নাদামপুর গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধ, তাহিরপুরে গ্রামের পার্শ্ববর্তী ডোবায় মাছ ধরা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পূর্ববীরগাঁওয়ে মসজিদের নারকেল নিলামে বিক্রয় নিয়ে বিরোধ এবং জগন্নাথপুরে পূর্ববিরোধের জের ধরে এসব সংঘর্ষ ও আহত হওয়ার ঘটনাগুলো ঘটেছে। এইসব সংবাদ প্রমাণ করে আমরা জাতি হিসেবে ক্রমশ কতোটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। তুচ্ছ কারণে আমরা একজন আরেক জনের দিকে অস্ত্র তাক করতে দ্বিধা করছি না। শুধু যে শুক্রবারই সুনামগঞ্জে এমন ঘটেছে তা কিন্তু নয়। এরকম সংঘর্ষ ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে জেলার কোন না কোন জনপদে। কয়েকদিন আগেই তাহিরপুরের এক গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে ৫০ পরিবার গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। শুধু আঞ্চলিকক্ষেত্রেই নয় বরং জাতীয়ভাবেও ইদানিং এরকম ঘটনা বেড়ে চলেছে। বরং বলা চলে অপরাধপ্রবৃত্তি দিনদিন হিং¯্র থেকে হিং¯্রতর হচ্ছে। একটি সহিষ্ণু জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির যে পরিচয় ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, এসব ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাহলে কি বাঙালি জাতি তার দীর্ঘদিনের সহিষ্ণু চরিত্র বিষর্জন দিয়ে দাঙ্গাবাজ জাতিতে রূপ নিচ্ছে? এরকম প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানীদের প্রচুর গবেষণা করতে হবে। সমাজকাঠামোয় যেসব অসাম্য ও অন্যায় রয়েছে তার মূল অনুসন্ধান করতে হবে। চলমান এসব বিবাদবিসম্বাদ ও হিং¯্রতার পিছনে সামাজিক কোন কোন উপসর্গগুলো প্রভাব বিস্তার করছে তা বের করে আনতে হবে। তবে নির্দ্ধিধায় বলা যায়, আমাদের সমাজ কাঠামোয় এখন যে দুর্বৃত্তায়ন জায়গা করে নিয়েছে তা নিকট ভবিষ্যতে আরও ভয়ংকর চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হবে। সরকার ও সামজিক শক্তিসমূহকে বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
সংঘর্ষ বা সহিংস বিরোধপূর্ণ অবস্থা সমাজের যাবতীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়। শুক্রবার বা দৈনন্দিন যেসব মারামারির ঘটনা ঘটছে তুচ্ছ সব কারণ নিয়ে এর সাথে জড়িতদের পরবর্তী জীবন কতোটা দূর্বিষহ হয়ে উঠে তার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না। পঙ্গুত্ব বরণ করে, মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে, জেলহাজতে বন্দি হয়ে, নিজের স্বাভাবিক পেশাগত জীবন হারিয়ে এসব ব্যক্তি ও পরিবারের অনেকগুলোরই অস্তিত্ব বিলিন হয়ে পড়ে। অথচ মারামারিতে জড়িতদের অধিকাংশই সংঘর্ষের সূত্রপাত হিসাবে যেসব কারণ তার সাথে সম্পর্কহীন থাকেন। এরা নানা সম্পর্কসূত্রে এসব ঘটনায় জড়িত হয়ে পড়েন। অথচ পরবর্তীতে এইসব পরিবারের বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হয়ে উঠে না।
এরকম সামাজিক বিপর্যয় তৈরীকারী সংঘর্ষগুলো নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষে সমাজে রাষ্ট্র ও সামাজিক শক্তির ব্যাপক সক্রিয়তা কাম্য।