- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সাম্য, দ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িকতায় অদ্বিতীয় নজরুল

মোহাম্মদ এমরান হোসেন
উপপরিচালক, স্থানীয় সরকার, সুনামগঞ্জ
আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে চেতনার, তার নাম মানবতা। আজকের পৃথিবীর অন্যতম বড় সমস্যা দেশে দেশে বিরাজমান ধর্মীয় সংকীর্ণতা, ধর্ম নিয়ে জঙ্গিপনা। নিজ নিজ ধর্ম রক্ষার দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এক ধরনের অলিখিত প্রবণতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সারা বিশ্বে প্রায় প্রতিটি সমাজে। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র চেতনার নাম অসাম্প্রদায়িকতা। মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা আর নারী-পুরুষ তথা সমাজের সাম্য রক্ষা জাতীয় কবি কাজী নজরুলের লেখনীতে প্রতিফলিত এই তিনটি প্রবণতার বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে বর্তমান প্রবন্ধে।
সকল দেশের, সকল ভাষার, সকল জাতির কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরাই ধর্মের চেয়ে মানবতা বড় এ চেতনাকে সামনে নিয়ে তাঁরা নিজেদের মতো শিল্পসাধনা করে গেছেন। বাঙালি কবিদের মধ্যে মধ্যযুগে যেমন চ-ীদাস বলেছেন, ‘শুনহ মানুষ ২য় পৃষ্ঠায় দেখুন
ভাই,/সবার ওপরে মানুষ সত্য/তাহার ওপরে নাই। আর নজরুল আরও স্পষ্ট করে মানবতাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় সাম্য বজায় রেখে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন অসাধারণ ছন্দমালায়। আর প্রতিটি ধর্মের অবতারদের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখিয়ে বলেছেন,
গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান।…
এই রণ-ভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।
(‘সাম্যবাদী’, সাম্যবাদী)
তিনি আরো বলেছেন :
মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।
এক সে আকাশ মায়ের কোলে।
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।
নজরুল লেখনীতে ¯্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকট হয়েছে… ‘শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদেরে ক’রো না ক’বীর, ভয়,/তাহারা খোদার খোদ প্রাইভেট সেক্রেটারি ত নয়।/সকলের মাঝে প্রকাশ তাহার, সকলের মাঝে তিনি।/আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি।’ (‘ঈশ্বর’, সাম্যবাদী) মনুষ্যসৃষ্ট নানা বিভেদরেখায় বিভক্ত এই সমাজকে দেখে যারপরনাই বিচলিত ছিলেন কবি নজরুল। এসব থেকে কায়মনোবাক্যে মুক্তি চান তিনি। সেই কারণেই তার রচিত সাহিত্যের প্রধান উপাদান হয়েছে মানবতাবাদ, সাম্যবাদ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে না পারা নজরুল নিজের জ্ঞান-দর্শন-অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে লেখনী হাতে তুলে নিলেন; লিখলেন। যেখানে প্রতিজ্ঞা করলেন এই সমাজের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার। বাজালেন অগ্নি-বীণা। হয়ে উঠলেন আজন্ম ‘বিদ্রোহী’। বলে উঠলেন, পুরনোকে, জীর্ণকে, প্রচলিত সমাজের গ-িকে ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে। সেই আহ্বান জানিয়ে তিনি নতুনের জয়ধ্বনি করতে করতে বললেন, ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন! আসছে নবীন-জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন!/…কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!’ (‘প্রলয়োল্লাস’, অগ্নি-বীণা)
সকল বর্ণ-ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ভেদাভেদহীন-জাতপাতহীন এক উন্নত সমাজ প্রত্যাশা করেছেন কবি। ফলে চোখের সামনে যা দেখেছেন, যা কিছু তার কাছে অন্যায় বলে প্রতীয়মান হয়েছে, তারই প্রতিবাদ করেছেন, প্রতীকার চেয়েছেন। সনাতন সবকিছুর বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন। কোনো ধর্মের মধ্যে উঁচু জাত-নীচু জাত বলে এক ধরনের অলিখিত রীতি চালু ছিল তাঁর সময়ে (হয়তো এখনো আছে)। সেই জাতের ধুয়া তুলে যারা সমাজকে বিভক্ত করতে চান, তাঁদের প্রতি বিষোদগার করেছেন কবি। আর পৃথিবীর সকল ধর্মব্যবসায়ীর প্রতি ঘৃণা ছুড়ে বলেছেন, ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া/ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।/…ভগবানের ফৌজদারি-কোর্ট নাই সেখানে জাত-বিচার,/(তোর) পৈতে টিকি-টুপি টোপর সব সেথা ভাই এক্কাকার।’ (‘জাতের বজ্জাতি’, বিষের বাঁশী)
তিনি মনে-প্রাণে সেই উচ্চাশা করে গেছেন, নিজ নিজ ধর্ম বিনাদ্বন্দ্বে পালিত হবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা একজন মানব সন্তানের বড় পরিচয়, সে মানুষ। নির্দ্বিধায় বলেছেন :
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
(‘মানুষ’, সাম্যবাদী)
এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মে কবি কীভাবে মনে প্রাণে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠলেন সে আলোচনা আজ জরুরি। যার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিলো মাদ্রাসায় এবং যে জীবনের তাগিদে মুয়াজ্জিনের কাজও করেছেন সেই ব্যক্তি আবার কী করে বলেন, “মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয়,ধর্মে মুসলিম। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা, বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলায় মুয়াজ্জিনের কাজ আর মক্তবে পড়ে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যেমন জেনেছেন আবার ঠিক তেমনি যখন লেটো গানের দলে যোগ দিলেন তখন শিখলেন জানলেন রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবত আর পুরাণ। দুটো ধর্মকেই মোটামুটি নিবিড ভাবে জানতে পেরেছিলেন বলেই তিনি এক হাত দিয়ে লিখতে পারতেন গজল আর ইসলামি গান, আবার ঐ একই হাতে লিখতেন শ্যামা সঙ্গীত, ভজন আর কীর্তন অঙ্গের গান। তাই তিনি ঐ সময়ে সাহসী উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন:
“তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’
কোথা চেঙ্গিস, গজনী মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুড়ি-শাবল চালা!
হায়রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভ- গাহে স্বার্থের জয়!”
কবির বেড়ে ওঠার সময় কবি বারবার প্রত্যক্ষ করেছেন সাম্প্রদায়িক বিভেদের কলুষিত রূপ। দেখেছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কবি মনে তা গভীর রেখাপাত করেছিলো, যার কারণে তিনি বারবার চেয়েছেন মানুষের মুক্তি। তাই প্রলয় শিখায় কবি লিখেছিলেন:
“ভাঙি’ মন্দির, ভাঙি’ মসজিদ
ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত,
এক মানবের একই রক্ত মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।”
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক গান বা কবিতার কারণে সবসময় তিনি ছিলেন ধর্মান্ধদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। মুসলমানরা বিভ্রান্ত হয়েছেন তার সৃষ্টিতে দেব-দেবীদের আরাধনা দেখে, আবার সনাতনীরা খেপেছেন যখন তিনি বলেছেন “আমি বিদ্রোহী ভৃত্য, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।”
নজরুল রসুল(সা.) কে নিয়ে নাত: “তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে। মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে। যেন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে।”
এই নজরুলই আবার কালীকে নিয়ে শ্যামাসংগীত লিখেছেন: “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন। (তার) রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।”
কুলি-মজুর শ্রমিক-কৃষাণ-মানুষের এই শ্রেণি-পরিচয়ই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ; হিন্দু কিংবা মুসলিম হিসেবে নয়। সা¤্রাজ্যবাদ, জাতিশোষণ, শ্রেণিশোষণ-বিরোধী চিরকালীন প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সঙ্গে নজরুলের শিল্পীসত্তা অবিচ্ছেদ্যসূত্রে জড়িত। আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি প্রগতিশীল, গণতন্ত্রকামী সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আন্দোলনে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা এ সূত্রেই নিরূপিত। তবে বর্তমান বিশ্বে চলমান মানবতার সংকট, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ সত্ত্বেও নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধির এই প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে নজরুলের অমর বাণীসমৃদ্ধ কবিতা পাঠের বিকল্প নেই।
সেই কবিই আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মায়ের জাত মেয়েদের যে আমরা অবমূল্যায়ন করি, সমযোগ্যতা সত্ত্বেও তাদের আমরা সমভাবে দেখি না। কিন্তু তিনি সবক্ষেত্রে সাম্য চান। তাঁর মতো বাংলার আর কোনো কবি নারীদের প্রতি যুগ যুগ ধরে চলমান অসাম্যকে সামনে এভাবে আনেননি। ফলে তিনি বলতে পেরেছেন :
সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর।
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
(‘নারী’, সাম্যবাদী)
নজরুল তাঁর চারটি সন্তানের নাম রেখেছিলেন হিন্দু মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য ও পুরানের আলোকে। তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মুহাম্মদ। বাকিদের নামকরণ করা হয়; অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ।”
নজরুলের মত সাম্প্রদায়িকতা ও ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেনি কেউ।”
বাস্তবে নজরুল সুনির্দিষ্ট কোনো ধর্ম, দর্শন কিংবা জীবন চর্যায় তিনি দীর্ঘকাল স্থির থাকতে পারেননি; তবুও সকল ধর্মের সার্বজনীন মূল্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় আস্থা। আর এই আস্থা তাঁকে হিন্দু কিংবা মুসলমানের কবি না করে, করেছে বাংলা ও বাঙালির কবি। তাই তো মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে এবং পরমত সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি সাধনায় তাঁর কবিতা ও গান বাঙালিকে যোগায় অনিঃশেষ প্রেরণা”

  • [১]