সাইদুর রহমান আসাদ
সুস্থ থাকার প্রধান নিয়ামক হলো সুষম খাবার। প্রতিদিন খাবারে শর্করা, আমিষ, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ লবণ পরিমাণমতো একজন মানুষকে খেতে হয়। খাবার শুধু সুষম হলেই চলবে না, খেতে হবে সময়মতো। তবে সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ মানুষ সুষম খাবার খেতে পারেন না। এতে ওজন কম হওয়া, খাটো হওয়া ও ঠিক মতো মানসিক বিকাশ ঘটছে না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এছাড়াও রোগ প্রতিরোধে দিনে তিনবার পরিমাণমতো খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই বলছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, সুনামগঞ্জ জেলায় ২৯ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৪০ জন মানুষের বসবাস। এদের মধ্যে পুরুষ ১৪ লক্ষ ৬০ হাজার ৪২৮ জন ও মহিলা ১৪ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫১৩ জন। এই মোট জনসংখ্যার মধ্যে বেশিরভাগ গ্রামে বসবাস করেন। বাকি অল্প সংখ্যক লোক শহরে বসবাস করছেন। গ্রামের বসবাসের সংখ্যা ২০ লক্ষ ৮১ হাজার ৯২৭ জন ও শহরে বাস করেন মাত্র ৮৩ হাজার ৬১৩ জন।
মোট জনসংখ্যার মাঝে পাঁচ মাস বয়সি শিশু রয়েছে ২৮ হাজার ৭৩ জন, ২ বছর বয়সি শিশু রয়েছে ১ লক্ষ ৬২১ জন ও পাঁচ বছর বয়সি শিশু রয়েছে ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৮৭ জন। এই মোট শিশুদের সুষম খাবারের অভাবে ৩০ ভাগের কম ওজন, ৪৪ ভাগের সঠিত উচ্চতায় না বাড়া ও ৮ ভাগ শিশু ক্ষয়রোধ প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হয় না। ফলে অপুষ্টিহীনতা নিয়েই ভেড়ে উঠছে এসব শিশু।
এ বিষয়ে ডা. সৈকত দাস বললেন, শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কারণ শিশু বয়সেই একজন মানুষের ব্রেন ও শরীর গঠন হয়। এসময় সুষম খাবার ঘাটতি থাকলে শিশুদের সঠিক শরীর ও ব্রেন বৃদ্ধি হবে না। তাই শিশুদের নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়াতে হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলার উত্তর জামালগঞ্জ ইউনিয়নের লম্বাবাঁক গ্রামের বাসিন্দা মো. নবী হোসেন বললেন, আমরা সকালে ভাত খাই। সঙ্গে আলু ভাজি ও ডাল থাকে। দুপুর ও রাতে ভাতের সঙ্গে মাছ খেয়ে থাকি। সুষম খাবার কি, তা জানেন না বলে জানান তিনি।
এদিকে বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার মেরচয়াখলা মোমিনিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ ৫০ জন ছাত্রীকে নিয়ে পুষ্টি সম্পর্কিত একটি গবেষণা করে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়। ছয় মাসের গবেষণায় শিক্ষার্থীর প্রতিদিন সুষম খাবার খাওয়ানো হয়। দুপুরে খিচুড়ি, ডিম ও সবজি খাওয়ানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে ৫০ জন ছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক পরির্বতন। এই কয়েক মাসে শিক্ষার্থীদের ওজন ও মানসিক পরিবর্তন দেখা গেছে। যা তাদের আচরণ ও শ্রেণিক্ষকে অধিক মনোযোগী করে তুলে।
মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আবু সাঈদ বললেন, ছাত্রীদের বারটান প্রতিদিন দুপুরে খিচুড়ি, ডিম ও সবজি খাইয়েছে। এসব খেতে প্রথম দিকে শিক্ষার্থীদের অনিহা ছিলো। কারণ তারা সবসময় ভাত, ভর্তা ও মাঝে মাঝে ছোট মাছ খাওয়ার অভ্যাস। মাংস বছরে একবার খাওয়া হয় তাদের। কোনো সময় মাংসের দেখাই পায় না তারা। ছয় মাস বারটানের সুষম খাবার গ্রহণের পর তাদের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। মাদ্রাসার অন্যান্য ছাত্রীর থেকে সুষম খাবার নেয়া ছাত্রীদের ওজন বেড়েছে ও মানসিক বিকাশ হয়েছে। তারা অন্য ছাত্রীদের চেয়ে ক্লাসে মনোযোগী ও শান্ত স্বভাবের দেখা গেছে তাদের।
বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বললেন, গড়ে একজন মানুষকে কমপক্ষে বাইশ’ থেকে চব্বিশ’ ক্যালরি গ্রহণ করতে হয়। দিনের ভালো শুরুর জন্য সকালের খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সারা রাত ঘুমিয়ে থাকার পর সকালে পাকস্থলী খালি থাকে। এজন্য পরিমাণ মতো রুটি, পরোটা, ভাত, খিচুড়ি, কিংবা মুড়ি খেতে হবে। আমিষের জন্য সঙ্গে ডিম, ডাল, এক থেকে দুই টুকরা মাংস ও সবজি খেতে হবে। দুপুরে ভাত, ডাল, ডিম কিংবা এক থেকে দুই টুকরা মাছ অথবা মাংস ও সবজি খেতে হবে। এতেই শরীরের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। রাতের খাবারে ভাত ডাল, ডিম কিংবা এক থেকে দুই টুকরা মাছ অথবা মাংস ও সবজি খেতে হবে।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আহম্মদ হোসেন বললেন, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। সঠিক পুষ্টিকর খাবার না খেলে একজন মানুষের নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার প্রভাব পড়ে কাজে। তাই আমাদের সুষম খাবার খেতে হবে। মানুষকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া সম্পর্কে সচেতন করছি। জেলার মোট জনসংখ্যার বেশির মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। এসব মানুষকে সচেতন করতে পারলে পুষ্টিহীনতা কমে যাবে।