বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জেলার ১১ উপজেলার ৭ উপজেলাতেই বিভক্ত কর্মসূচি পালিত হয়েছে। পৃথক পৃথক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে দলের সাংগঠনিক আলোচনার চেয়ে একে অপরকে বিষোদগারই হয়েছে বেশি।
সুনামগঞ্জ জেলায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বহু দিনের। প্রায় ২০ বছর পর ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নতুন জেলা কমিটি গঠনের পর কোন্দলের কিছুটা অবসান হয়েছিল। সম্প্রতি ৬ ইউনিটে আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র আবার সংগঠনে বিভক্তি দেখা দেয়। এক মাসেরও কম সময়ে এই বিভক্তি উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও সক্রমিত হয়েছে।
গেল ২৩ জুন জেলার ১১ উপজেলার ৭ উপজেলায়ই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হয়েছে আলাদা আলাদাভাবে। জেলা কমিটির কর্মসূচিও হয়েছে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে। এসব কর্মসূচিতে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারাও বিভক্ত হয়ে অংশ নিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ্য সহসভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুটের নেতৃত্বে শহরের ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান দলীয় নেতৃবৃন্দ। এসময় অন্যান্যের মধ্যে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল ও সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শংকর দাস ও জুনেদ আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে একই স্থানে শ্রদ্ধা জানান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সমর্থক অংশ। এই অংশের নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেন, যুগ্মসম্পাদক অ্যাডভোকেট নান্টু রায় ও অ্যাডভোকেট হায়দার চৌধুরী লিটন, সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুর রহমান সিরাজ প্রমুখের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানান দলীয় নেতা কর্মীরা।
পরে এক পক্ষ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমনের বাসভবনে এবং আরেক পক্ষ শহরের জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম তাঁর সমর্থক নেতা কর্মীদের নিয়ে জগৎজ্যোতি পাঠাগারে কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কর্মসূচি পালন করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সদর উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক মোবারক হোসেন ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রশিদ বখ্ত নজরুল সহ নেতাদের নিয়ে ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।
ছাতক উপজেলা ও ছাতক পৌরসভা আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপ আলাদা-আলাদা কর্মসূচি পালন করে। ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী’র সমর্থকরা ছাতক শহরের ম-লী ভোগের অস্থায়ী কার্যালয়ে কেক কাটা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। অপরাংশের নেতা সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মানিকের সমর্থক আব্দুল ওয়াহিদ মজনুর নেতৃত্বে ছাতক উপজেলা পরিষদ চত্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে ছাতক শহরে র্যালি করেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে কর্মসূচি পালন করলেও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আলতাব উদ্দিনের নেতৃত্বে দলীয় কার্যালয়ে কেক কাটা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মঞ্জুর আলম চৌধুরী ও দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশারফ মিয়ার নেতৃত্বে লঞ্চঘাটে আলাদা কর্মসূচি পালন হয়।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন খাঁন ও সাধারণ সম্পাদক অমল করের নেতৃত্বে বেলা ১১ টায় দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা হয়। বেলা ২ টায় হয় অপরাংশের নেতা আব্দুছ ছোবহান আখঞ্জির নেতৃত্বে একই স্থানে আলোচনা সভা।
ধর্মপাশায় দলীয় কার্যালয়ে কর্মসূচি পালন করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সমর্থক। হাসপাতাল রোডে কর্মসূচি পালন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ সমর্থকরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের নেতৃত্বে একাংশ স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে। ফরিদ আহমদ তারেক ও শামীমুল ইসলাম শামীমের নেতৃত্বে আরেকাংশ দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে।
দলের এমন বিভক্তি প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বললেন, সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিটে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে এবং জেলা কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করার পর দিনই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান দেশের বাইরে চলে গেছেন। প্রস্তুতি কমিটিতে স্থান পান নি এমন অনেকে ক্ষুব্ধ আছেন। তারা হয়তোবা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলাদা কর্মসূচি পালন করেছেন। সভাপতি সাহেব দেশে ফিরলে সকলকে নিয়ে বসে যেখানে যারা ক্ষুব্ধ আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনে কমিটিতে কোআপ্ট করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করে সুসংগঠিত করা হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ্য সহসভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট বললেন, প্রস্তুতি কমিটি গঠন নিয়ে দলের কোন ফোরামাইে আলোচনা হয় নি। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মানিক ঢাকায় বসে মনগড়া প্রস্তুতি কমিটি চাপিয়ে দিয়েছেন। এই কারণে উপজেলায় উপজেলায় ইউনিটে ইউনিটে দলে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। দলের বিভক্তির জন্য তারা দায়ী। কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা এসব কমিটি বাতিল ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত. ৬ মে সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, ছাতক উপজেলা ও ছাতক পৌরসভা, দোয়ারাবাজার এবং সুনামগঞ্জ সদর ইউনিটের আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন। এই কমিটিগুলো গণমাধ্যমে ছাপা হলে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে ক্ষুব্ধ হন দলের অন্য অংশের নেতা কর্মীরা।