বিশেষ প্রতিনিধি
গণশুমারি ও গৃহগণনায় সুনামগঞ্জ জেলায় লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৫ জন। এরমধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ৮৮.১৬ শতাংশ এবং হিন্দু ১১.৬৭ শতাংশ। শহরে বাস করেন ২২ লাখ ৯২ হাজার ৩৬৪ জন এবং পল্লীতে চার লাখ এক হাজার ৯৬৬ জন। বাকী এক হাজার ১৬৫ জন কোথায় থাকেন এই তথ্য সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান কর্মকর্তারা আরেকটু যাচাই করে জানাতে পরে জানাবেন বলে জানান। জনশুমারির নতুন তথ্যে সুনামগঞ্জে স্বাক্ষরতার হার ৬৪.৭৭ শতাংশ। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বি ০.০১ এবং খ্রিস্টান ০.০৯ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী আছেন ০.০৬ শতাংশ। জনশুমারি ও গৃহগণনার এই পরিসংখ্যন নিয়ে জেলাজুড়ে মিশ্র প্রত্রিক্রিয়া রয়েছে। তথ্যের সঠিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আছে। সুনামগঞ্জ পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন অবশ্য বলেছেন, কেউ বাদ পড়বেন না, এখনো সমন্বয় করার সুযোগ আছে, নতুন তথ্য পেলেই সমন্বয় করা হবে। সঠিক দেবার জন্যই কাজ করছেন তারা।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে চাকুরি করেন প্রকৌশলী সৈকত রায়। সুনামগঞ্জ শহরের স্টেশনরোডের গণপূর্ত কোয়াটারেই পরিবার নিয়ে আছেন এই প্রকৌশলী। জনশুমারী ও গৃহগণনার কোন কর্মী তাদের ওখানে যায় নি জানিয়ে বললেন, কেবল আমার এখানে নয়, আমার পাশের দুই বাসায় ১১ জন এবং এখানকার ডরমেটরিতে সাতজন থাকেন। আমরা কেউই জনশুমারী বা গৃহগণনার কোন কর্মীকে আসতে দেখি নি, আমার কাছে কোন ফোনও জনশুমারী বা গৃহগণনার কোন কর্মীর করেন নি।
সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত উপজেলা শাল্লার ডুমরা গ্রামের শিক্ষিত ও সমাজ সচেতন মানুষ শাল্লা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাস বললেন, আমার বাড়িতে জনশুমারীর কোন কর্মী আসে নি, আমাকে ও আমার স্ত্রীকে কোন ফোনও দেন নি।
জগন্নাথপুরের কলকলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, কলকলিয়ায় জনশুমারী ও গৃহগণনার কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অবনী মোহন দাস জনশুমারী বা গৃহগণনার তথ্য শতভাগ সঠিক বলার পক্ষে নয়। তবে তাঁর বাড়ি জনশুমারি ও গৃহগণনার কর্মী গেছেন বলে জানান তিনি।ভ
জনশুমারী ও গৃহগণনার সঠিকতা নিয়ে সুনামগঞ্জে এভাবেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
সুনামগঞ্জে দুই দফা বন্যা চলাকালীন সময়ে জনশুমারী ও গৃহগণনা হওয়ায় কর্মীরা শতভাগ বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন দাবি করলেও এর সত্যতা খোঁজে পাওয়া যাবে না মনে করেন অনেকেই।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার মল্লিকপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল ওদুদ বললেন, বন্যার সময় ঘর থেকে বের হতে পারছি না, ওই সময় একদিন এক মহিলা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার পরিবারে লোকসংখ্যা কত, জন্ম তারিখ, বয়স ইত্যাদি। আমি ফোনেই তাকে তথ্য জানিয়েছি।
ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা কৃষক নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, জনশুমারি ও গৃহগণনার কেউ আমার বাড়িতে আসে নি। তিনি বললেন, দুই দফায় সুনামগঞ্জে প্রায় দেড় মাস বন্যাই ছিল। সকল বাড়িতে কর্মীরা যাওয়াইতো কষ্টসাধ্য ছিল। গণনায় কোথাও জনসংখ্যা কম দেখানো হলে ওই এলাকার লোকজন বিভিন্নভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
জনশুমারির সুনামগঞ্জের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বললেন, জনশুমারি ও গৃহগণনার কাজ শুরু হয় ১৪ জুন রাত থেকে। ১৪ জুন রাতে ভাসমানদের গণনা চলে। ১৫ থেকে ২১ জুন চলে চলে জনশুমারি ও গৃহগণনা।
১৬ জুন সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা ছিল। সড়ক, বাড়ি-ঘরসহ সকল এলাকায় ৫থেকে ৮ ফুট উচ্চতায় ছিল পানি। এই পানি সকল এলাকায় ২১-২২ জুন পর্যন্ত ছিল। এরপরেও কমপক্ষে ১৫ দিন অনেকে বাড়ি ফিরতে পারে নি, তাহলে এই জেলায় জনশুমারি ও গৃহগণনা কিভাবে শেষ করা গেলো, এমন প্রশ্নের জবাবে সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার মধ্যে ছয় উপজেলার দায়িত্বে থাকা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মিন্টু সরকার বললেন, বন্যার জন্য সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের আংশিক অংশে সাতদিন জনশুমারি ও গৃহগণনার সময় বাড়ানো হয়েছিল। পানি কমতে শুরু হবার পর গণনার কাজ সঠিকভাবে শেষ করা হয়।
সুনামগঞ্জ পরিসংখ্যান অফিসের উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন বললেন, গণনা করেছেন সংশ্লিষ্ট গ্রামের শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কাজে লাগানো হয়েছে। বন্যার কারণে সুনামগঞ্জের জনশুমারি ও গৃহগণনায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহ সময় বাড়ান। ওই সময় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র থেকেও তথ্য নেবার সুযোগ দেওয়া হয়। সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকাই বন্যা কবলিত ছিল। ২৬ জুন আমাদের সকল কর্মীদের ফেসবুক আইডিতে দুটি নম্বর দিয়ে বলা হয়েছিল, গণনায় কেউ বাদ পড়লে ফোন দেবার জন্য। সেখানে অনেকে ফোন দিয়েছেন এবং তাদের সমন্বয় করা হয়েছে। এখনো কেউ এসে জানালে গণনায় সমন্বয় করা যাবে। গণনা পরবর্তী নমুনা ভিত্তিক কিছু কিছু গ্রাম যাচাইয়ের আওতায় আসবে, সেখানে এমনিতেই কোন ভুল হয়ে থাকলে, যাচাইয়ে সমন্বয় হবে। খানা গণনায় কোন এলাকায় ভুল তথ্যের জন্য জনসংখ্যা কম দেখানো হলে ওখানকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সেই চিন্তা মাথায় রেখেই আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।