স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদাল হোসেন (৩৬) কৃষিকাজ করেন। জীবনে কখনো ঢাকায় যাননি। অথচ ঢাকার আশুলিয়া থানার একটি প্রতারণা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ২৭ দিন জেল খেটেছেন। পরে জানা যায়, এই মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দুটোই ভুয়া ছিল।
শুধু আবদাল হোসেনই নয়, একইভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আদালত ও থানা থেকে আসা ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় সুনামগঞ্জের নিরীহ আরও কয়েকজন মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে। জেল খেটেছেন কেউ কেউ।
ভুয়া পরোয়ানায় কারাবাস ও হয়রানির শিকার চারজন ব্যক্তি সম্প্রতি সুনামগঞ্জের আদালতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান। সুনামগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ জি এম আল মাসুদ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার বাইরের অন্য কোনো জেলা থেকে জিআর মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসলে এ বিষয়ে কোর্ট ইন্সপেক্টর এবং সিআর মামলার ক্ষেত্রে আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সুনামগঞ্জের সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নির্দেশ দেন।
সুনামগঞ্জে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় কারাবাস ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এমন চার ব্যক্তি গতকাল বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এর মধ্যে দুজন কৃষক, একজন শিক্ষার্থী ও একজন ব্যবসায়ী রয়েছেন। পৌর শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলন হয়।
সংবাদ সম্মেলনের আবদাল হোসেন জানান, গত বছরের ১৫ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার বাড়িতে ছাতকের জাউয়াবাজার ফাঁড়ির একদল পুলিশ যায়। তখন পুলিশ জানায়, আবদাল হোসেন ও তাঁর ভাতিজা কামরান হোসেনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। পরে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে পুলিশ। কামরান হোসেনের অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা ছিল একদিন পর। বিষয়টি জানিয়ে আদালতে তাঁর পক্ষে আবেদন করলে ১৬ নভেম্বর আদালত তাকে জামিন দেন। আর আবদার হোসেনকে পাঠানো হয় কারাগারে। পরে পরিবারের লোকজন খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন পরোয়ানাটি ভুয়া। এর মাঝখানে একই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় একই গ্রামের আমিনুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু আমিনুল হক একদিন পর ছাড়া পান। আবদাল হোসেন ২৭ দিন কারাবাসের পর মুক্তি পান। পরে পুরো বিষয়টি জানিয়ে আদালতে আবেদন জানানো হয়। আবদাল হোসেন বলেন,‘আমি দিন আনি দিন খাই। ২৭ দিন জেলে থাকায় পরিবারের লোকজন সীমাহীন কষ্ট করেছে। গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে জমি নিয়া বিরোধ আছে। মনে হয় এর লাগি শত্রুতাবশত কেউ এসব করেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে তাহিরপুর উপজেলার মাটিকাটা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল আল মাসুদ জানান, তিনি কয়লা ও চুনাপাথর আমদানির সঙ্গে যুক্ত। গত ৪ জানুয়ারি তাহিরপুর থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায় মাদারীপুর থানা থেকে তার নামে একটি অস্ত্রমামলায় সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে। মাসুদ কখনো মাদারীপুর যাননি, তার নামে কোনো মামলা নেই বলে জানান। পরে তাহিরপুর থানা পুলিশ মাদারীপুর থানায় যোগাযোগ করলে ওই পরোয়ানাটি ভুয়া বলে জানা যায়। এরপর তাকে পরিবারের জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়। আদালত এসব ভুয়া পরোয়ানার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে এই ব্যক্তিদের এসব মামলায় দায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
গতকাল বহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে থাকা সুনামগঞ্জের আইনজীবী আবুল বাশার বলেন, এলাকায় জমিজমাসহ নানা বিষয়ে মানুষের বিরোধ থাকে। মূলত এসব দ্বন্দ্বের জের ধরেই প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে এসব করা হয়। সুনামগঞ্জে ইদানিং এটা বেড়ে গেছে। যারা এসব অপকর্মের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত তাদের খোঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।