বিশেষ প্রতিনিধি
ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডব সইতে পারে নি সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার প্রায় ২২ শ’ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ সড়ক। কঙ্কালের মতো ভেসে ওঠেছে জেলা সদরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়ক। ভেসে ওঠা যোগাযোগ পথের মধ্যে ১৮৪ কিলোমিটার অংশ সড়ক ও জনপথ বিভাগের। অন্য অংশ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের। ভেসে ওঠা সড়কে যান চলাচল করাতো দূরের কথা পায়ে হেঁটেই চলাই কষ্ট। কোথাও কোথাও মোটর সাইকেল বা সিএনজি চললেও এটি পথ নয় যেন মরণ ফাঁদ।
সুনামগঞ্জ-দোয়ারা-ছাতক সড়কে যাত্রী বহনকারী সিএনজি চালক আমবাড়ির সিরাজ মিয়া জানালেন, সুনামগঞ্জ-দোয়ারা-ছাতক সড়কের মান্নারগাঁও এলাকার পুটিপুসি সড়কের মুখে, বান্দেরবাজার যাবার আগে গভীর খাল হয়ে গেছে, ওখানে এখন নৌকা চলে। ডাউকাখালি, ব্রাহ্মণগাঁও ও আমবাড়ী বাজারের পাশের সড়ক অংশে বিটুমিন ওঠে গেছে, অনেক পাথর ঢলে ভেসে গেছে, বুঝাই যায় না, ওখানে কয়েকদিন আগেও সড়ক ছিল। তিনি জানান, সড়কের দোহালী-কাঞ্চনপুরের পাশের সেতু এক মাসের আগের বন্যায় ভেসে গেছে।
সিরাজ মিয়ার পাশে দাঁড়ানো এই স্ট্যান্ডের সিএনজি চালক আব্দুল মতিন ও জিয়াউর রহমান বললেন, ‘এই পথে গাড়ী চালাইবার আগে চিন্তা করা লাগে, বাড়িত ফিরা যাইবো কি-না, গাড়ির তো বারোটা বাজেরঔ।’
দোয়ারাবাজারের ভোগলা এলাকার আব্দুল খালেক বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের থানার পাশের তিন চাকার সিএনজি স্টেশন থেকে বাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। কীভাবে পৌঁছাবেন জানতে চাইলে, উত্তর বললেন ‘যেখানে যেভাবে যেতে হবে, যাবো, আমার যাওয়া জরুরি।’ তিনি জানালেন, সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিএনজিতে করে মান্নারগাঁও ভাঙনে যাবেন, ওখান থেকে নৌকায় ভাঙা পাড় হয়ে আবার সিএনজিতে পরে কিছু অংশ পায়ে হাঁটা, এরপর খেওয়া পাড় হয়ে কয়েক দফায় নৌকা ও সিএনজিতে করে বাড়ি পৌঁছাতে হবে।
এরচেয়েও খারাপ অবস্থা সুনামগঞ্জ- সাচনা-জামালগঞ্জ সড়কের। বড় বড় গর্তের মাঝে মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরই জানান দেয়, ওই পথেও কয়েকদিন আগে যানবাহন চলতো।
এই পথে যাত্রী বহনকারী রহিমাপুরের মোটর সাইকেল চালক জগন্নাথ রায় বললেন, সুনামগঞ্জ শহরের পাশের আব্দুজ জহুর সেত’ুর অ্যাপ্রোচের পরের অংশে খাল হয়ে গেছে, মঙ্গলবার ওখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিধিরচর এলাকার বিকল্প সড়কের অস্তিস্তই নেই। জরুরি ছাড়া কেউ মোটর সাইকেলে ওঠেন না। তিনি জানান, সাচনাবাজার থেকে সুনামগঞ্জে ৪০ মিনিটের পথ দুই ঘণ্টায় ট্রলারেই যাতায়াত করছেন লোকজন।
সুনামগঞ্জ—দিরাই সড়কেরও বেহাল অবস্থা। সড়কের গণিগঞ্জ, শরিফপুর, বোগলাখাড়াসহ ১৫ কিলোমিটার অংশের ভিটুমিন ওঠে গেছে।
দিরাইয়ের গণামাধ্যম কর্মী আবু হানিফ চৌধুরী জানালেন, দিরাই-শাল্লার যোগাযোগ সড়ক দিরাই-শ্যামারচর সড়কে খানাখন্দ এমনভাবে হয়েছে, পায়ে হেঁটে চলাচলই দায়, শহর থেকে মূল সড়কে ওঠার পথও বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।
জেলা সদরের একেবারে নিকটবর্তী উপজেলা বিশ^ম্ভরপুরে যাতায়াত করাও কষ্টসাধ্য এখন। রাধানগর থেকে চালবন্ধ পয়েন্টের খানাখন্দ দেখলে ভয় পাবেন যে কেউ।
সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর সড়কের দাঁড়াখাই, ভমভমি ও নলজুর নদীর পাড়ের অংশের ভিটুমিন ওঠে বেহাল অবস্থা হয়েছে। এই সড়কের ১০ কিলোমিটারেরও বেশি অংশে চলাচল দায়।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রাং বললেন, এখনো বন্যা যায় নি, জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার ১৮৪ কিলেমিটার সংযোগ সড়ক চলাচল অনুপযোগি হয়ে গেছে। ৩০ টি সেতু ও কালভার্টের অ্যাপ্রোচ ভেঙে গেছে। তিনশ’ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বললেন, বেশিরভাগ সড়ক এখনো পানির নীচে। যুগ যুগ ধরে উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক তছনছ হয়ে গেছে। ১২০ টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫ শ’ কোটি টাকারও বেশি সড়ক পথ নষ্ট হয়ে গেছে।