হোসেন তওফিক চৌধুরী
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, ভাষা সৈনিক, কবি-সাহিত্যিক, ইসলামি চিন্তাবিদ ছিলেন মুহাম্মদ আব্দুর রহীম সাহেব। এই বরেণ্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন সুনামগঞ্জের তিন প্রজন্মের সফল এবং প্রিয় শিক্ষক। গতকাল শনিবার পহেলা ফেব্রুয়ারি তারিখে তিনি ৯৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। সুনামগঞ্জ শহরের পাশর্^বর্তী আলমপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে তিনি জন্ম লাভ করেন। তিনি ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে এবং বিধবা স্ত্রী সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আমার শিক্ষকদের মধ্যে তিনি ছিলেন জীবিত সর্বশেষ ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুতে আমার আর কোন শিক্ষক জীবিত নেই। তাঁর আচার আচরণ, ব্যবহার থেকে সহজেই বোঝা যেতো তিনি প্রকৃত অর্থে একজন সাদা মনের মানুষ। সকল মানুষের প্রতি তাঁর ¯েœহ ভালোবাসা শ্রদ্ধাবোধ ছিল অপরিসীম। তাঁর জীবনধারা ছিল সহজ, সরল। কোন রূপ দাম্ভিকতা বা কালিমা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
আমি যখন সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী স্কুলে পড়ি তখন ১৯৫৮-৫৯ সালে তাঁর রচিত ‘চোখের জলে হাসি’ কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। পরে ‘কোরান কুঞ্জিকা’ নামে অপর একটি কবিতা গ্রন্থ তিনি প্রণয়ন করেন। এই দুটো গ্রন্থই পাঠক ও সুধী মহলে সমাদৃৃত হয়েছে। তাঁর রচিত অসংখ্য কবিতা ও প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি সরকারি জুবিলী হাই স্কুলের ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন এক নাগাড়ে দীর্ঘদিন। সুনামগঞ্জ থেকে ছাত্রদের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘মহানবী স্মরণীকা’ নামে প্রকটি ম্যাগাজিনের তিনি ছিলেন প্রধান সম্পাদক। তিনি সুনামগঞ্জে ১৯৬৪ সালে অনুষ্ঠিত কৃষ্টি ও সাহিত্য সম্মেলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘সুরমা’ পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের পুরো ভাগে থেকে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনের সময়ে তিনি একটি জারী গান লিখে সুনাম অর্জন করেন।
শিক্ষাবিদ-ভাষা সৈনিক এবং কাব্য সাধনার জন্য সিলেটের রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) এজন্য তাঁকে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে সম্মানিত করেছে। সুনামগঞ্জের যে কোন সাহিত্য সমাবেশ-সুধী সমাবেশে তাঁর উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য্য। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাই স্কুলের ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গঠিত উদযাপন কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি। তিনি সরকারী জুবিলী স্কুল থেকে অবসর নেয়ার পর শহরের সুনামগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে খ-কালীন শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষানুরাগী হিসাবে তিনি এই স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন শিশু শিক্ষা বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় উপদেষ্টা হিসাবেও কাজ করেছেন। তিনি পবিত্র হজ¦ব্রত সম্পন্ন করেছেন। তাঁর জীবন ছিল কর্মময়। কাজ করতে কখনো ক্লান্তি বোধ করেননি। এজন্য তিনি সকল মহলের প্রশংসা-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে সুনামগঞ্জ একজন হিতৈষী অভিভাবক হারালো। এটা সুনামগঞ্জের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর স্মৃতি এবং অবদান শোক-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবে। আমি তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করি এবং দোয়া করি আল্লাহ যেনো তাঁকে বেহেস্ত নসিব করেন।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিষ্ট