ডা. মুরশেদ আলম
জেলা সরকারি গ্রন্থাগারে বই আনতে মাঝে মধ্যেই আমি যাই। আমি গ্রন্থাগারের একজন সদস্য। জেলার একমাত্র সরকারি গ্রন্থাগারটি বইপত্রের দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ। শুধু বইপত্রের দিক থেকে কেন অন্যান্য দিক যেমন সাদা রঙের একতলা ভবন, বাহির থেকে ভেতর পর্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে সুন্দর নীরব একটা পাঠোপযোগি পরিবেশ যে কোন শ্রেণির বই পিপাসুদের পাঠাগারের ভেতরে অবশ্যই টেনে নিয়ে যাবে। এইতো ক’দিন আগে গিয়ে দেখি ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার পাঠকবৃন্দ কেউ পত্রিকা, কেউ স্কুল-কলেজের সহায়ক বই পড়ছেন। একদিকের টেবিলে দেখলাম এজন মহিলা কয়েকটি বই সামনে নিয়ে বসেছেন। কোন কোনটির পাতা উল্টাচ্ছেন পড়ছেন আবার একটি প্যাডে নোট নিচ্ছেন। ধারণা করলাম হয়তো কোন বিষয়ে গবেষণা করছেন বা হতে পারে তিনি শিক্ষকতা পেশায় আছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর সুবিধার্থে রেফারেন্স হিসাবে নোট নিচ্ছেন। যাই হোক এই সরকারি গ্রন্থাগারে যে, একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই গ্রন্থাগারে এনসাইক্লোপিডিয়া আছে ৩৩টি ভলিউম, বাংলাপিডিয়া আছে ১৪টি ভলিউম, বঙ্গবন্ধুর উপর এটলাস, মুক্তিযুদ্ধের উপর এটলাস, বিভিন্ন প্রকার ঐতিহাসিক বই, মুক্তিযুদ্ধের দলিল, বিভিন্ন দেশ পরিচিতি মূলক বই, সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ক বই, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বই, অর্থনীতি বিষয়ক বই, মনস্তত্ব সংক্রান্ত বই, বিজ্ঞান বিষয়ক বই, নবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য সম্ভার, লেঅক সাহিত্য, বাউল সাহিত্য বিষয়ক বই, বিভিন্ন ধর্মসংক্রান্ত মূল্যবান বই সহ আছে ইয়ার বুক ইত্যাদি অনেক বই।
দৈনিক পত্রিকা আছে ৯টি, স্থানীয় পত্রিকা আছে ১টি। আমার দৃষ্টিতে পাঠকের চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম এই সুনামগঞ্জ জেলার সরকারি গ্রন্থাগারটি।
এই সরকারি গ্রন্থাগারটি শুধুমাত্র বই পাঠের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রতিটি জাতীয় দিবসে ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকদের মাঝে আয়োজন করা হয় রচনা প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, বইপাঠ এবং সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ীদেরকে পুরস্কৃত করা হয়।
এই গ্রন্থাগারে বর্তমানে যিনি কর্মরত আছেন তার নাম মো. আনিসুর রহমান, জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান। উনার ব্যবহার এতো মিষ্টি যে, কি বলবো আপনি যদি যান তাহলে দেখবেন উনি আপনাকে হাসিমুখে সম্ভাষন জানাবেন তারপর লাইব্রেরির বিষয়ে যতরকমের সহযোগিতা লাগে সবই তিনি হাসিমুখে করে দেবেন। দায়িত্বশীল ও সজ্জন মানুষ।
সে জন্য এই লেখার অবতারণা তার কারণ বলি। অন্যান্য দিনের মতো আজো বেলা সাড়ে এগারটার দিকে বই ফেরত দিতে লাইব্রেরীতে গেলাম। দরজায় পৌঁঁছতেই আনিস সাহেব আগেই সালাম বিনিময় করলেন। সদা হাস্যোজ্জল মানুষটিকে দেখলাম কেমন যেন মনমরা এবং ক্লান্ত মনে হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম আনিস ভাই কেমন আছেন? উত্তরে বললেন, ভাই বেশি ভাল নেই দায়িত্বের চাপে একেবারে নুয়ে পড়েছি। এতবড় বিশাল একটা লাইব্রেরীতে সপ্তাহে পাঁচদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একা একা সকল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নামাজ পড়া, খাওয়া-দাওয়া, বাজার করা, পরিবারের প্রয়োজনীয়তা মেটানো, পরিবারকে সময় দেয়া, ওদের সঙ্গ দেয়া এমনকি নিজের বিশ্রমের সুযোগটুকুও পাই না। উনি একা একা গ্রন্থাগারের সব দায়িত্ব পালন করছেন শুনে ইচ্ছে হলো গ্রন্থাগারের পুরো হালচাল নিয়ে একটা অনুচ্ছেদ লিখি না কেন। আর ঐ সুবাদেই এই লেখাটা লিখলাম।
১। গ্রন্থাগারের নামÑজেলা সরকারি গ্রন্থাগার, সুনামগঞ্জ। স্থাপিত ১৯৫৫সালে আর জাতীয়করণ হয় ১৯৮২ সালে। পূর্বে গ্রন্থাগারের নাম ছিলÑবাংলাদেশ জাতীয় পরিষদ পরবর্তীতে নামকরণ হয় জেলা সরকারী গ্রন্থাগার।
২। অবস্থানÑপূর্বে ছিল কাজির পয়েন্টে মোবারকবাদ মসজিদের পশ্চিম পাশে। বর্তমানে হোসেন বখত চত্বরের পূর্ব-উত্তর কোণে ডায়াবেটিস হাসপাতালের পূর্বে অবস্থিত দ্বিতল ভিত্তির উপর একতলা ভবন। শান্ত নিরিবিলি পাঠোপযোগী পরিবেশ।
৩। জনবল সংক্রান্ত তথ্যাবলীÑমঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা ৪টি। ১ম শ্রেণির লাইব্রেরীয়ান পদ ১টি, ননগেজেটেড জুনিয়র লাইব্রেরীয়ান ১টি, লাইব্রেরি এসিস্ট্যান্ট ১টি এবং অফিস সহায়ক কাম নিরাপত্তা প্রহরী ১টি।
বর্তমানে কর্মরত আছেন ২ জন। ১ জন স্থায়ীভাবে আর একজনকে প্রেষণে পদায়ন করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে যিনি আছেন তার নাম হচ্ছে মো. আনিসুর রহমান, জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান এবং প্রেষণে যিনি আছেন তান নাম হচ্ছে মোজাহিদ খান, পদবী হচ্ছে লাইব্রেরি এসিস্ট্যান্ট। অনেক অনুরোধের পর জনাব মোজাহিদ খানকে বিগত ২২/১২/২০১৫ তারিখে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রেষণে পদায়ন করা হয়। তবে তিনি আগামী ৩১/১২/২০১৬ তারিখে অবসরে চলে যাবেন। তাছাড়া চাকুরী জীবনের শেষের দিকে এসে নানান কারণে তিনি ছুটিতে থাকতে বাধ্য হন। তার বেতনও মৌলভীবাজার থেকে আনতে হয়। ফলে আনিস সাহেবকে একাই গ্রন্থাগারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়।
অফিস সহায়ক কাম নিরাপত্তা প্রহরীর পদটি অবসরজনিত কারণে ২০১৩ সাল থেকে শূন্য আছে। আর ১ শ্রেণির লাইব্রেরিয়ান পদে কখনোই কাউকে পদায়ন করা হয়নি। জনবল পদায়নের জন্য বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নিকট সর্বমোট পাঁচবার লিখিতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। বা জনবলও পদায়ন করা হয়নি।
৪। ল্ইব্রেরির বইয়ের সংখ্যাÑ সুনামগঞ্জ জেলা সরকারি গ্রন্থাগারে মোট একুশ হাজার আট ’শ বই আছে। তন্মধ্যে মূল্যবান বই আছে এনসাইক্লোপিডিয়া ৩৩ খন্ড, বাংলাপিডিয়া ১৪ খন্ড ৩ সেট, ইয়ার বুক ৫খন্ড, একাত্তর সম্পর্কিত এটলাস ৫টা, আইন বিষয়ক বই, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত, অর্থনীতি বিষয়ক, ইতিহাস, সাহিত্য, লোক সাহিত্য, সাউল সাহিত্য, বিজ্ঞান বিষয়ক, স্বাধীনতা দলিল একখন্ড ১৫ টা, বাংলা ইংরেজী উন্নতমানের অভিধান, নজরুল বিষয়ক বই, রবীন্দ্র বিষয়ক বই, কোলকাতার দূষ্প্রাপ্য ইংরেজী বই, বিভিন্ন ধর্মীয় বই, বিসিএস পরীক্ষার গাইডসহ চাকুরী সহায়ক বই এবং অনেক বিখ্যাত ও বিশিষ্ট লেখকদের বই।
৫। পত্রপত্রিকাÑজাতীয় দৈনিক আছে ৯টা। প্রথম আলো, সমকাল, ইত্তেফাক, জনকন্ঠ, কালের কন্ঠ, যুগান্তর, ইনকিলাব, সংবাদ এবং ইংরেজী ডেইলী স্টার। এছাড়া সিলেটের ডাক এবং সুনামগঞ্জের স্থানীয় পত্রিকা হিসেবে আসে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর। পত্রিকা প্রসংগে একটি বিষয় অবশ্যই উল্লেখযোগ্য যে, এই গ্রন্থাগারে শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ২২ বছরের সমকাল পত্রিকা যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে।
৬। যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচারÑকম্পিউটার ৩টা, প্রিন্টার ২ টি, ফটোকপিয়ার ১টা, কুশন চেয়ারসহ চেয়ার ১৩২টা, সেক্রেটারিয়েট টেবিল ৪টা, পাঠক টেবিল ২৩টা, বুক সেলফ কাঠের ১৬টা স্টীলের ২২টা, আলমীরা স্টীলের ১টা এবং ফাইল ক্যাবিনেট ১টা।
৭। পাঠক সংখ্যাÑপ্রতিদিন লাইব্রেরীতে এসে পড়াশোনা করেন গড়ে প্রায় দেড়শ থেকে দুইশ পাঠক। অনেক গৃহিণীরাও আসেন। বাসায় বই নিয়ে পড়েন এমন সদস্য সংখ্যা ষাট জন।
৮। প্রতিযোগিতাÑসকল জাতীয় দিবসে রচনা, বইপাঠ, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়ে থাকে।
৯ সমস্যাবলী-
(১) একজন জনবল দিয়ে পুরো লাইব্রেরির সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব। যেমন-মূল্যবান গ্রন্থসমূহের নিরাপত্তা বিধান, প্রতিদিনের পাঠকদের বইপত্র থেকে শুরু করে পত্র পত্রিকা সরবরাহ করা, আবার সেগুলো যথাস্থানে তোলে রাখা, বাড়ীতে যারা বই নেন তাদেরকে বই সরবরাহ করা যথারীতি রেজিস্টার এন্ট্রি করা, লাইব্রেরির দরজা খোলা, টেবিল চেয়ার বুক সেলফ ঝাড়মোছ করা, দিনের শেষে লাইব্রেরী বন্ধ করা এমনকি ওয়াশরুমের দিকেও তাকেই নজর রাখতে হয়। কারণ নিরাপত্তা প্রহরী নেই।
(২) নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় লাইব্রেরি ভবনের আঙিনার সামনে পাঠককক্ষের বাহিরে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা আড্ডা জমায়, হৈ-চৈ করে, গান গায়, ধূমপান করে, প্রায়শই বারান্দার লাইট জ্বালিয়ে দেয়, বাথরুমের পানির ট্যাপ ছেড়ে দেয়, ওয়াশরুমের তালুগুলোও চুরি করে নিয়ে গেছে। তাদের এই আড্ডার কারণে পাঠকদের পড়াশোনায় ভীষণ ব্যাঘাত ঘটে। কখনো কখনো তা অসহনীয় হয়ে উঠে। নিষেধ বাধা করতে গেলে তারা অশোভন আচরণ করে থাকে।
(৩) বিগত ৭/৪/২০১৬ তারিখে লইব্রেরির উত্তর পূর্ব কোণের উত্তর দিকের বাউন্ডারী দেয়ালের উপরের প্রায় দশফুট লোহার গ্রীল ভেঙে চুরির চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ থানায় জিডি করা হয় ( জিডি নং-৪৫৩ তারিখ ০৯/০৪/২০১৬)।
১০। সমস্যা সমাধানের সুপারিশমালাÑ
এজন পাঠক হিসেবে কিংবা সরকারি লাইব্রেরির শুভাকাঙ্খী হিসেবে সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে বিনয়ের সাথে নি¤œবর্ণিত অনুরোধগুলো করবো।
(১) ছয়জন লোকের দায়িত্ব একজন লোক কখনোই যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। তাছাড়া কর্মরত লোকটিরও তো ব্যক্তিগত প্রয়োজন, পারিবারিক সুবিধা-অসুবিধা অথবা অসুস্থতা থাকতে পারে। তারও তো ছুটির প্রয়োজন হতে পারে। উপরের অনুচ্ছেদে যে সকল কাজ ও সমস্যার কথা উল্লেখ করা হলো সেগুলো কোনভাবেই একজন লোক পালন করতে সক্ষম হয় না। তাই মানবিকতা বিবেচনায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জরুরিভাবে নিরাপত্তা প্রহরীসহ শূন্য পদে জনবল পদায়নে সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, পাঠক মহলের এটাই একান্ত প্রত্যাশা।
(২) চুরির উপদ্রব থেকে নিরাপদ রাখার জন্য রাতের টহল পুলিশকে ল্ইব্রেরির দিকে বিশেষ নজর দেয়র জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষকে লইব্রেরির উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করতে পারেন। তাছাড়া উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের উৎপাত প্রতিরোধের জন্য প্রতিদিন হোসেন বখত চত্বরে যে সকল পুলিশ সদস্যরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাদের মধ্য হতে দু’ একজন যদি মাঝে মাঝে লইব্রেরির আঙিনায় এসে টহল দিয়ে যান তাহলে হয়তো আড্ডাটা কমে যাবে। আর এতে করে বাড়তি পুলিশও লাগবে না অপরদিকে লাইব্রেরির পাঠের পরিবেশও নির্মল থাকবে।
সর্বোপরি একজন পাঠকের কৃত অনুরোধগুলো গ্রন্থাগারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সদয় বিবেচনা করবেন এই প্রত্যাশা রেখে সরকারি গ্রন্থাগারের আরো সমৃদ্ধি ও পাঠক সমাবেশ বাড়ার কামনা করেই শেষ করলাম।