- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সুনামগঞ্জ বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজে ধীর গতি

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ পিটিআইস্থ বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ চলছে ধীর গতিতে। চলতি বছরের মার্চে কাজ শুরু হলেও এই ৯ মাসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মাত্র ২টি কাজ করেছেন। এরমধ্যে বধ্যভূমির দখলকৃত জায়গায় দেয়াল অপসারণ ও মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে মাত্র। কাজের এমন ধীর গতির কারণে ক্ষোভ জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষ। অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশোধিত প্রাক্কলন তৈরির জন্য কাজ সারতে বিলম্ব হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সুনামগঞ্জ পিটিআই বধ্যভূমিতে টর্চারসেল প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানি খান সেনারা। দালাল, রাজাকার, আল বদরদের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে পিটিআই হোস্টেলের নীচতলার পূর্ব দিকের একটি কক্ষে রেখে চরম নির্যাতন করতো। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে হিন্দু, মুসলিমসহ মুক্তিকামী বাঙালি-নারী পুরুষদের ধরে এনে পিটিআই-এ রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। নারীদের উপর সংঘবদ্ধ পাশবিক নির্যাতন চালাতো। নির্যাতনে যারা মারা যেতেন পাকবাহিনী ক্যাম্পের পশ্চিম দিকে অবস্থিত পিটিআই হোস্টেলের পুকুরের পশ্চিমের খালি জায়গায় তাদের লাশ মাটি চাপা দিয়ে রাখতো। একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ত্রিমুখি আক্রমণ করে হটিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। তখন স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা ওই বধ্যভূমির মাটি খুঁড়ে প্রায় ৫০-৬০টি মাথার খুলিসহ শহীদদের হাড়গোড় উদ্ধার করেন। এই হাড়ের স্তূপের মধ্যে মহিলাদের চুল, ব্লাউজ, পেটিকোট, অন্তর্বাসসহ নানা বস্তুও উদ্ধার হয়। এরপরই এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চে এই ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংবলিত জায়গায়টি দখল মুক্ত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা-২। বলা হয় পিটিআই সুপারের বাসভবন সংলগ্ন পূর্ব দিকের ৯২ ফুট সীমানা প্রাচীরটি ৮ ফুট পশ্চিম দিকে প্রতিস্থাপনপূর্বক বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার। তখন কাজ শুরু হয়।
এবিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুর মিয়া বললেন, সুনামগঞ্জ বধ্যভূমিতে পাকবাহিনী আমাদের লোকদের ধরে এনে নির্যাতন করতো। যারা মারা যেতো পুঁতে ফেলতো এখানে। লোমহর্ষক স্মৃতি বিজরিত জায়গাটিতে দ্রুত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি তাঁর।
এদিকে কাজ শুরুর নয় মাসেও মূল স্মৃতিস্তম্ভের কাজ শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সংশোধিত প্রাক্কলন তৈরি, করোনা পরিস্থিতি ও বর্ষার কারণে মুল কাজ শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলা এলজিইডি’র নির্বার্হী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম।
তিনি বললেন, এটা আমাদের মুল প্রাক্কলনে ছিলো না। সংশোধিত প্রাক্কলনে থাকায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। করোনা এবং বর্ষার কারণেও কাজটি বিলম্ব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পিটিআই বধ্যভূমির কাজ স্থান সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো। প্রাক্তন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগের ফলে সে জটিলতার সমাধান হয়েছে। পিটিআই সুপারের বাসভবনের দেয়াল ভাঙা হয়েছে। মাটি ভরাটের কাজ চলছে। এটা শেষ হলে নকশা মোতাবেক কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যেই এই কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জহিরুল আহমদ সোহেল বললেন, আমাদের সুনামগঞ্জের বধ্যভূমি অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন ছিলো বুদ্ধিজীবী দিবসেও। অন্য সময় তো ডাস্টবিন হয়ে থাকে। যা আমাদের জন্য লজ্জার। স্বাধীনতার পরে এই বধ্যভূমিকে আড়াল করতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আশার কথা বধ্যভূমির জায়গা দখলমুক্ত করে এখন কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
শিক্ষক মো. আবু তাহের মিয়া বললেন, আমাদের বধ্যভূমিটা অবহেলায় পড়ে আছে। দখলে ছিলো দীর্ঘদিন। এখন কিছুটা দখল মুক্ত করা হলেও স্মৃতিস্তম্ভের কাজ ধীর গতিতে চলছে। আমরা কাজের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। বিজয়ের পঞ্চাশ বছরে এসে আমরা দেখি বধ্যভূমি অপরিষ্কার অবহেলায় পড়ে থাকে। পলিথিনের ময়লা, প্লাস্টিকের বোতল পড়ে থাকে।
জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরি ভট্টাচার্য্য বললেন, আমাদের পিটিআইস্থ বধ্যভূমিটি দীর্ঘদিন অবহেলা, অযতেœ ছিলো। প্রগতিশীল সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো দাবি করার পরে জায়গাটি দখলমুক্ত হয়। এখন মাটি ভরাট করা হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাবো দ্রুত এই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, এলজিইডির মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। আমরা আশা করছি সেটি আগামী বৃষ্টি বা বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই কাজটি শেষ হয়ে যাবে।

  • [১]