বিন্দু তালুকদার
করোনা দুর্যোগে চিকিৎসক দম্পতি হিসেবে সুনামগঞ্জে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় দায়িত্বপালন করছেন দুইজন চিকিৎসক। তাঁরা হলেন- সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন এবং তাঁর স্ত্রী অব্স এন্ড গাইনী বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. লিপিকা দাস। এই চিকিৎসক দম্পতি করোনা দুর্যোগের শুরু থেকেই দায়িত্বপালন করছেন নিরলসভাবে।
ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন বৈবাহিক সূত্রে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের জামাতা। তাঁর স্ত্রী ডা. লিপিকা দাস দিরাই পৌর শহরের চাঁন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ডা. লিপিকা দাস ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের অব্স এন্ড গাইনী বিভাগের দায়িত্বপালন করছেন। তাঁর স্বামী ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর অর্থোপেডিক্স বিভাগে যোগদান করেন। তবে সদর হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে সরাসরি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন। পরিবার পরিজন ছেড়ে ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন রোস্টার ডিউটি হিসেবে তিনি শহরের একটি আবাসিক হোটেলে থেকে প্রতি মাসে টানা ১০ দিন করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর হোটেলেই আরও ১৪ দিন কোয়ারাইন্টানে থাকেন। চিকিৎসা ও কোয়ারাইন্টসহ মোট ২৪ দিন তাকে হোটেলেই অবস্থান করা ও হোটেলের খাবার খেতে হয়। এভাবেই করোনা প্রতিরোধে সন্মুখভাগে থেকে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন।
ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন ২০০২ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএস স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে গাইবান্ধা জেলার দাড়িয়াপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগদান করেন। ২০০৭ সালে রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। ২০০৯ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদী অর্থোপেডিক্সে এম.এস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ওই বছর সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অর্থোপেডিক্স বিভাগে আবাসিক সার্জন (ক্যাজুয়ালটি) হিসেবে হিসেবে যোগদান করেন। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে তিনি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে অথোপেডিক্স বিভাগে দায়িত্বপালন করছেন। ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন সুনামগঞ্জ শহরের হিলিং ল্যাবে নিয়মিত রোগী দেখেন।
তিনি গাইবান্ধার সদর উপজেলার দাড়িয়াপুর ইউনিয়নের উত্তর ঘাগোয়া গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্থায়ীভাবে সিলেট শহরের করেরপাড়া আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজেই দিরাইয়ের বাসিন্দা ডা. লিপিকা দাসের সাথে পরিচয় হয় ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মনের। সেই পরিচয় থেকেই প্রনয়; ২০০৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুইজন সন্তান রয়েছে। ছেলে ৬ষ্ঠ ও মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
ডা. লিপিকা দাস ২০০৪ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ২০০৮ সালে ২৭তম বিসিএস স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। ২০১৫ সালে ঢাকার মহাখালী বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান এন্ড সার্জন থেকে (অব্স এন্ড গাইনী) এফ.সি.পি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৫ সালে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবাসিক সার্জন অব্স এন্ড গাইনী হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে অব্স এন্ড গাইনী বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। করোনা দুর্যোগের কারণে সদর হাসপাতালে অন্যসব অপারেশন বন্ধ থাকলেও ডা. লিপিকা দাস জরুরি প্রসূতি সেবার পাশাপাশি নিয়মিত সিজারিয়ান অপারেশনও করছেন।
ডা. লিপিকা দাস পারিবারিকভাবেই চিকিৎসা পেশায় এসেছেন। তাঁর কাকা শংকর চন্দ্র দাসও একজন ডাক্তার। ডা. লিপিকা দাস করোনাকালেও সুনামগঞ্জ শহরের হিউম্যান ল্যাবে নিয়মিত রোগী দেখছেন।
করোনার চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ হিসেবে ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন বলেন,‘ করোনা পজেটিভ, এমন খবর পাওয়া মাত্রই মানসিকভাবে ভেঙে না পরে নিজেকে যতটুকু সম্ভব শক্ত রাখতে হবে। আইসোলেশনে থেকে কেবলমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শে ঔষধ সেবন ও মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতে হবে। শরীরে অন্য কোন জটিল রোগ না থাকলে এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে গেলে করোনা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। তবে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করতে হবে, ঘরে থাকতে হবে। ’
শুধু ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মন ও ডা. লিপিকা দাস নয় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সুনামগঞ্জে সরকারি চিকিৎসা সেবায় অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্বপালন করছেন আরও এক দম্পতি। তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জ শহরের নবী নগরের বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের চিকিৎসক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অতনু ভট্টাচার্য ও তাঁর স্ত্রী সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কান্তা নারায়ন চক্রবর্তী। সম্প্রতি কোন ধরনের উপসর্গ ছাড়াই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন ডা. কান্তা নারায়ন চক্রবর্তী। তিনি করোনাকালের শুরু থেকেই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি এখনও উপসর্গহীন। পাশাপাশি তাঁদের ছয় বছর বয়সী শিশু সন্তানও করোনা পজেটিভ হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছে। ডা. অতনু ভট্টাচার্য সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগরে বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের দায়িত্বপালনের পাশাপাশি শহরের হিউম্যান ল্যাবে ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখছেন। করোনা দুর্যোগকালীন সময়ে চিকিৎসাসেবায় জড়িত সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অশেষ শুভ কামনা।
লেখক: বিন্দু তালুকদার, গণমাধ্যমকর্মী।