- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য আমৃত্যু কাজ করতে চাই

হাওরের রাজধানী অন্যতম বৃহৎ হাওর জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর পাড়ের বাউধরন গ্রামে জন্ম আকলাকুর রহমান আকির। বাবা মায়ের কোলে চড়ে শিশু বয়সে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখান থেকে একজন প্রথম মুসলিম বাংলাদেশী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয় পর্বত জয় করার গৌরব অর্জন করেন। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন জন্মভূমিতে। সারাদিন কাটানো সেখানকার অনুভূতির গল্প তিনি লিখেছেন সুনামগঞ্জের খবরের পাঠকের জন্য –
আকি রহমান
মাত্র ১৮ মাস বয়সে বাবা মায়ের কোলে চড়ে লন্ডনে যাই। সেই সময়ের গ্রামের কোন স্মৃতি মানসপটে নেই। তবে আমি নয় বছর বয়সে আবার বাবা মায়ের সাথে বেড়াতে গ্রামে আসি। তখন ১৫ মাস গ্রামে ছিলাম। বাংলা ভাষা ও সিলেটি আঞ্চলিক ভাষা হৃদয়ে গেঁথে যায়। এসময় আমি গ্রামের মানুষের অভাব অনটন দারিদ্রতা দেখে খুব কষ্ট পাই। শিশু বয়সে নিজের কাছে এত টাকা পয়সা নেই যে সাহায্য করব। তবে মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখে মনটা বিষন্ন হয়ে পড়ত। তাদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে তৈরি হয়। বাবা মায়ের কাছ থেকে টাকা এনে গ্রামের গরিব দুঃখিদের দিতাম। এক টাকাও দান করেছি। এরপর যুক্তরাজ্যে বিজনেস ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে সংসার জীবনে শুরু করি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৭ সালে আবার দেশে আসি। তখন গ্রামে বেশ কিছুদিন কাটাই। সেই সময়ের একটি দৃশ্য আমাকে মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ দেয়। একদিন গ্রামের বাড়িতে এক দরিদ্র মহিলা তার অসুস্থ শিশু কন্যাকে নিয়ে হাজির হয়, টাকার অভাবে ঔষধ কিনে দিতে পারছে না। চিকিৎসার অভাবে শিশুটি কাহিল হয়ে পড়ে দেখে তখন খুব কষ্ট পাই মনে হয় আমার মেয়ে শিশুটি কত ভালো আছে আর এই শিশুটি টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না, অপুষ্টিতে ভুগছে। এলাকার হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে খুব ইচ্ছে করে। লন্ডনে ফিরে গিয়ে নিজে ব্যতিক্রমী কিছু করার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। এসব ভাবনা থেকে পর্বত জয়ের স্বপ্ন দেখি। ২০১৯ সালে প্রথমে যুক্তরাজ্যর স্থানীয় পর্বতারোহীদের সঙ্গে পর্বত অভিযানে যাই। ওয়েলসের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় স্নোডেন জয় করার পর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে মাউন্ট এলব্রুসে যাই। কিন্তু তীব্র বাতাসের কারণে শৃঙ্গের মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে হয়। এরপর ২০২০ সালের এপ্রিলে আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারো জয় করি। কিলিমাঞ্জারো জয়ের কিছুদিন আগে দ্বিতীয়বার এলব্রুস জয়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে তখন এলব্রুস বন্ধ ছিল। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় স্কাফেল পাইক ও স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় বেন নেভিস জয় করি। বন্ধুদের পরামর্শে পর্বতাভিযানে যাওয়ার সময় তহবিল সংগ্রহ করি। তহবিলের সংগৃহীত টাকা দিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াই।
২০১৯ সালে এলব্রুস অভিযান ব্যর্থ হলেও প্রায় আড়াই লাখ টাকার তহবিল সংগ্রহ করেছিলাম। সে অর্থে বিশুদ্ধ পানির জন্য আমার জন্মভূমি জগন্নাথপুরে ১০টি নলকূপ স্থাপন করে দেই। এছাড়াও সে সময় বিশ্বনাথ ও নবীগঞ্জের আরও ২০টি পরিবারকে গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেই। কিলিমাঞ্জারো অভিযানের সময় প্রায় ১০ লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহ করে সে টাকা ম্যানচেস্টার শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে দান করি। চলতি বছরের ১৪ মে হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী মুসলিম এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে গৌরব অর্জন করি। জুন-জুলাই মাসে ভয়াবহ বন্যায় জন্মভূমির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পেয়ে মনটা বিচলিত হয়ে উঠে। দেশে ছুঁটে আসতে মন চায়।

নিজ বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে এভারেস্ট জয়ী আকি রহমান।


দেশে আমার বোন ফাতেমা খানম সহ চাচাতো ভাই ও অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছেন। আমার মা গত জুন মাসে দেশে এসে ছয় মাস থেকে ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে ফিরে যান। আমার বড়ভাই ভাই লুৎফুর রহমান সুযোগ পেলেই দেশে আসেন। আমিও সুযোগ পেলেই ছুঁটে আসি নাড়ীর টানে। এ টান এক অন্য রকম অনুভূতি। উন্নত জীবন যাপনের সুযোগ সুবিধা না থাকলেও এক মায়াময় ভালোবাসা জন্মভূমিতে আমাকে বার বার টানে। হাওরের উতালপাতাল ঢেউয়ের দৃশ্য মন জুড়িয়ে যায়। ৬ অক্টোবর নৌকায় করে নলুয়ার হাওর পাড়ি দিয়ে গ্রামে এসে গ্রামবাসীর সাথে মিশতে পেরে খুব আনন্দ উপভোগ করি। বিশেষ করে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা তুলে দিতে পেরে মনটা জুড়িয়ে যায়।মানুষের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ এক অন্য রকম ভালোলাগা। লন্ডনে বন্যা উপলক্ষে ইসলামি রিলিফের সহায়তায় ফান্ড সংগ্রহ করে দেশে বন্যা কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যাগ নেই। আমি আমার গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্য সহায়তা তুলে দেই। বন্যায় এসব মানুষ খুব ক্ষতিগ্রস্ত হন। খাদ্য সহায়তা পেয়ে তাদের মুখে কিছুটা হলেও হাসির ঝিলিক অনুভব করতে পারি।
মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কিছুতে নেই। সারাজীবন আমি এ কাজ করতে চাই। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জন্য নিজেকে আমৃত্যু জড়িয়ে রাখতে চাই।

  • [১]