- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সুরতহালে নির্যাতনের ক্ষত দেখা গেছে, দাবি স্বজনদের

বিশেষ প্রতিনিধি
শান্তিগঞ্জে পুলিশের মারপিটে উজির মিয়া নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। তদন্ত কমিটিকে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে উজির মিয়ার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার বিকাল ৩ টায় পাগলা হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে শত্রুমর্দন গ্রামের বাঘেরকোণা পঞ্চায়েতি কবরস্থানে উজির মিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় এলাকায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার শত্রুমর্দন গ্রামের উজির মিয়া নামের এক ব্যক্তি পুলিশি নির্যাতনে মারা গেছেন অভিযোগ ওঠায় সোমবার বেলা ২ টা থেকে ৫ টা ৫ মিনিট পর্যন্ত তিনঘণ্টারও বেশি সময় সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক অবরোধ করে রাখে হাজারো মানুষ। একারণে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে কয়েক’শ যানবাহন আটকা পড়ে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগের শিকার হন। অবরোধকারীদের শান্ত করতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে তোপের মুখেও পড়েছিলেন। তার সঙ্গে থাকা আনসার সদস্যকেও মারপিট করে বিক্ষুব্ধ লোকজন। পরে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারুজ্জামানকে। এসময় তার গাড়ি মরদেহের একেবারে কাছ দিয়ে যাওয়ায় লাশের উপরের কাপড় গাড়ির চাকার সঙ্গে উড়ে যায়। এ ঘটনায় আরও বেশি উত্তেজিত হন বিক্ষুব্ধ জনতা। সোমবার সন্ধ্যায় নিহত উজির মিয়ার ছয় নিকট আত্মীয়ের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময়ও উজির মিয়ার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন বলে দাবি করেছেন নিকটজনেরা।
সোমবার সন্ধ্যায় সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম মাহবুবসহ উজির মিয়ার ভাই-ভাতিজাসহ ৬ নিকটজনকে উপস্থিত রাখা হয়। এদের স্বাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এই স্বজনদের মধ্যে ছিলেন শত্রুমর্দন গ্রামের মনোহর আলীর ছেলে গোলাম মোস্তফা, সোনাহর আলীর ছেলে বদরুল আলম টিপু, কাছা মিয়ার ছেলে মো. ডালিম মিয়া, নূর মিয়ার ছেলে হাসান আলম, নছিব আলীর ছেলে সোহেল রানা তালুকদার ও আমিরুল হকের ছেলে দুলাল মিয়া। এছাড়া শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম এসময় উপস্থিত ছিলেন।
মঙ্গলবার সকালে নিহতের ভাই গোলাম মোস্তফা বললেন, মরদেহের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলা জখম ছিল, মাথায় আঘাত ছিল। বুঝাই গেছে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়েছে তাকে। তিনি বললেন, সড়কে বিক্ষোভের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি একেবারে কাছ দিয়ে না গিয়ে, তিনি আরেকটু সরে যেতে পারতেন, চাকার সঙ্গে লাশের দাফনের কাপড় চলে যায়, এ ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ে সকলের।
নিহত উজির মিয়ার ভাতিজা সোহেল রানা তালুকদার বললেন, এই মাসের প্রথম দিকে নিহত উজির মিয়াসহ গ্রামের ১০-১২ টি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। এই নিয়ে বিচার সালিশ হয়। উজির মিয়া থানায় পাশের রসুলপুর গ্রামের শামীম আহমদসহ কয়েকজনের নামে অভিযোগ দায়ের করেন। শামিম আহমদ স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে ধরা দেন। পরে শামীম আহমদকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে আমার চাচা উজির মিয়ার বাড়িতে নিয়ে আসে ১০-১৫ জন পুলিশ। উজির মিয়া পুলিশের ডাকে ঘর থেকে বের হলেই তার মাথায় আঘাত করেন এক এসআই। এ ঘটনায় তিনি এসআই দেবাশীষ, এসআই পার্ডন কুমার সিংহ ও এসআই আক্তারুজ্জামানকে দোষারোপ করেন।
উজির মিয়ার নাতি কামরুল ইসলাম বললেন, আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাড়ি ফেরার পর শান্তিগঞ্জ থানার ওসি তদন্ত মিজানুর রহমান এবং সেকেন্ড অফিসার আলাউদ্দিন বাড়ি গিয়ে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সাংবাদিক সম্মেলন না করার অনুরোধ করেন, কিছু টাকাও তারা দিতে চান, আমরা নেই নি।
উজির মিয়ার নিকট আত্মীয় সৌদি প্রবাসী ফরিদ মিয়া বললেন, ‘উজির মিয়া আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরে সকলকে বলেন, আমি আর বাঁচবো না, আমাকে এমনভাবে মারপিট করেছে, বলে দিয়েছে তুই এক সপ্তাহের মধ্যে মরবে, তোরে বাঁচার জন্য মারি নি।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বললেন, সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় লাশের শরীরে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তিনি জানালেন, লাশের উপর দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি যায় নি। তবে গাড়ি লাশের একেবারে কাছ দিয়ে যাওয়ায় লাশের উপরের কাপড় উড়ে যায়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম বললেন, সুরতহালে মাথায়, হাতে, পিঠে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। লাশের উপর দিয়ে গাড়ি ওঠলে থেতলে যেত, এমনটা দেখা যায় নি।
মঙ্গলবার দুপুরে উজির মিয়ার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. আহমদ হোসেন বলেছেন, হাসপাতালে দায়িত্বশীল একটি চিকিৎসক দল এই ময়নাতদন্তের সময় উপস্থিত ছিলেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেবার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের চেষ্টা থাকবে।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, নিহতের নিকটজনের উপস্থিতিতে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জমা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ঘটনা তদন্তের জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন। এ ঘটনাকে পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেখছে। কেন এতো মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নামলেন, এই বিষয়টিও ভেবে দেখার বিষয় আছে, এজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি কমিটি করা হবে। তিনি জানালেন, শামিম আহমদ নামের চোর নিহত উজির মিয়ার গরু নিয়েছেন বলে পুলিশকে জানিয়েছিল এটি সত্য। এমন রেকর্ড শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে আছে।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সোমবার সন্ধ্যায়ই এ ঘটনা সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়ছে। কমিটির আহ্বায়ক হলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার-উল-হালিম, সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সজীব কবীর ভুইয়া।
প্রসঙ্গত. গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ উজির মিয়াকে গরু চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। অসুস্থ্য উজির মিয়াকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির করা হয়। আদালত থেকে জামিন নিয়ে, ওইদিনই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন উজির মিয়া। কয়েকদিন পর বাড়ি ফিরলেও সোমবার আবার অসুস্থতা বোধ করলে সকালে তাকে কৈতক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানেই কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর তার মরদেহ সড়কে রেখে অবরোধে নামেন স্বজনসহ হাজারো মানুষ।

  • [১]