- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সুস্থ হবার জন্য হাসপাতাল লাশ হওয়ার জন্য নয়

জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাড়ে তিন মাস বয়সের শিশু আমানের মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ডাক্তার-নার্সদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ এনেছেন। জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে শিশুটিকে জগন্নাথপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ১৩ জানুয়ারি। ওই রাতেই শিশুটির মৃত্যু হয়। স্বজনরা এ ক্ষেত্রে দুইটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এর একটি হলÑ শিশুকে ইনজেকশন দিতে ভুল করা হয়েছে। দুইÑ শিশুর শারীরিক অবস্থা যখন সংকটাপন্ন তখন ডাক্তার কিংবা নার্সকে খোঁজে পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া ও ভুল চিকিৎসার কারণেই শিশুটির মৃত্যু ঘটেছে বলে আমানের স্বজনরা অভিযোগ করে এর বিচার দাবি করেছেন। আমানের অভিভাবকদের ইনজেকশন দিতে ভুল করার অভিযোগের উপর চিকিৎসক ছাড়া আর কেউ সঠিক মতামত প্রকাশ করতে পারবেন না। কিন্তু জরুরি মুহূর্তে ডাক্তার ও নার্সকে না পাওয়ার বিষয়টিকে বিদ্যমান বাস্তবতায় একেবারেই নির্জলা সত্য হিসেবে যে কেউ মেনে নিবেন। চিকিৎসক-নার্সদের এমন অবহেলার কথা এখন সবসময়ই শোনা যায়। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অভিযোগটি অস্বীকার করা হলেও সাধারণ মানুষ মাত্রই এই অভিযোগ বিশ্বাস করেন।
চিকিৎসকের কাজ আর দশটা কাজের মত নয়। এখানে জড়িতদের দায়িত্ব পালনের সাথে মানুষের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে। সরকারি হাসপাতালে যে রোগী ভর্তি করা হয় তারা সমাজের অসচ্ছল শ্রেণির লোকই অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কারণ একটু সামর্থবানরা আর গুরুতর চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর আস্থা রাখেন না। রোগীর অসচেতন অভিভাবকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর সঠিক পরিচর্যার বিষয়টি জানেন না। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপদেশ পরামর্শ প্রদানের দায়িত্ব চিকিৎসক-নার্সদের। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের হাসপাতালগুলোর নার্সরা যেন এখন খুব বেশি অমানবিক হয়ে উঠেছেন। উপযুক্ত পরিচর্যা দূরে থাক একটু মিষ্টি কথায় রোগীর অভিভাবকদের করণীয় বুঝিয়ে দিবেন, তাও হয় না তাঁদের দ্বারা। কর্তব্যসময়ে তারা হাসপাতালে থাকলেও রোগীর প্রয়োজনে তারা বেডে ছুটে যেতে চান না। অনেকেই বলেছেন, ইদানীং নার্সরা সঠিক সময়ে ঔষধ খাওয়ানোর দায়িত্বও পালন করেন না। নার্স শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ করা হয়েছে সেবিকা। সেবিকা শব্দটির সাথে দরদ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা প্রভৃতির সম্পর্ক রয়েছে। নার্সদের যে কোর্স করানো হয় সেখানেও তাদের এসব বিষয়ে পাঠ দান করা হয়। তাঁদেরকে বুঝানো হয়, ঔষধের পাশাপাশি পরিচর্যার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার নার্সদের চাকুরিগত সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়িয়েছেন। কিন্তু নার্সরা তাদের সেবার মান ক্রমাগত কমিয়ে চলেছেন। এই ধরনের অবস্থা আমাদের স্বাস্থ্য কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই জায়গা থেকে অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে।
জগন্নাথপুর হাসপাতালে শিশু আমানের অবস্থা যথন মুমূর্ষু হয়ে উঠেছিল, তখন অনেক খোঁজাখোঁজি করেও ডাক্তার কিংবা নার্সকে না পাওয়ার অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত। ওই সময়ে যে চিকিৎসক ও নার্স কর্তব্যরত ছিলেন তারা কেন হাসপাতালে না থেকে ঘুমিয়ে ছিলেন সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। আমানের বাবা-মা তাদের শিশুটিকে হাসপাতালে ভাল করার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এই হতভাগা দম্পতিকে শিশুটির মৃতদেহ কোলে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হয়েছে। এ যে কত মর্মান্তিক, কত হৃদয়বিদারক সেই কথাটি বুঝতে হবে সংশ্লিষ্টদের। হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে কোনো রোগী মারা যেতে পারে, এই ধারণাটিই উন্নত বিশ্বে অকল্পনীয়। আমরা এখন এতটাই স্বার্থপরায়ণ, আত্মতুষ্টিপ্রবণ, অমানবিক ও অমনোযোগী হয়ে উঠেছি যে, একটি শিশুকে মৃত্যুর মুখে রেখে সুখ নিদ্রায় মগ্ন হতে পারি। ধিক এই শিক্ষা, ধিক এই প্রশিক্ষণ।
শিশু আমান চলে গেছে। সে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। কিন্তু তার পিতা-মাতার চোখে যে বোবা কান্না ও কষ্টবোধ সেটি লাঘব করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য প্রশাসকদের। নতুবা আমানরা সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে আসবে আর লাশ হয়ে বেরিয়ে যেতেই থাকবে।

  • [১]