আকরাম উদ্দিন
প্রথমবারের মতো সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের উঁচু জমিতে সূর্যমুখি ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। হাওর অঞ্চলের উঁচু জমিতে সূর্যমুখি চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য কৃষি বিভাগের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার ও বীজ প্রণোদনার মাধ্যমে জেলার ৮ উপজেলায় এই সূর্যমুখি ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। এ বছর প্রায় আড়াই শ’ বিঘা জমিতে সূর্যমুখির চাষ হয়েছে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখি চাষে বেশি লাভবান হবেন এমন প্রত্যাশা চাষীদের।
একাধিক চাষী জানান, সূর্যমুখি ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তৈল, খইল ও ব্যাপক জ্বালানী পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তৈল উপাদন সম্ভব। প্রতি কেয়ারে ৭ মণ থেকে ১০ মণ বীজ উৎপাদন হয়। তৈল উপাদন হবে প্রতি কেয়ারে ১ শ’ ৪০ লিটার থেকে ২ শ’ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তৈল বাজার মূল্য সর্বনি¤œ ২ শত ৫০ টাকা। প্রতি কেয়ার জমিতে খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা।
সদর উপজেলায় ১০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি চাষ হয়েছে। উপজেলার সুরমা ইউনিয়নে, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে, রঙ্গারচর ইউনিয়নে, মোল্লাপাড়া ও গৌরারং ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে এই সূর্যমুখি’র চাষ করেছেন কৃষকেরা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট (দ.) ইউনিয়নে ও সলুকাবাদ ইউনিয়নে ২০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি চাষ হয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলার রামপুর, শাহপুর, বাহাদুরপুর সহ বিভিন্ন স্থানে ২০ বিঘা জমিতে এবার সূর্যমুখি চাষ হয়েছে। ছাতক উপজেলায় কালারুকা ইউনিয়নে, গোবিন্দগঞ্জ সৈদেরগাঁও, নোয়ারাই ইউনিয়নে, জাউয়াবাজার ইউনিয়ন ও ভাতগাঁও ইউনিয়নে ১০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি’র চাষ হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলায় ২০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি’র চাষ হয়েছে। উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নে, তাহিরপুর সদর ইউনিয়নে, বাদাঘাট (উ:) ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে সূর্যমুখির চাষ হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলায় ২০ বিঘা জমিতে, জগন্নাথপুর উপজেলায় ১০ বিঘা জমিতে এবং ধর্মপাশা উপজেলায় ১০ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি’র চাষ হয়েছে।
সলুকাবাদ ইউনিয়নের ছালামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান সূর্যমুখি’র চাষ করেছেন ৩ কেয়ার জমিতে। তিনি বলেন,‘আমার ৩ কেয়ার জমি আবাদ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। এই তিন কেয়ার জমিতে বীজ উৎপন্ন হবে অন্তত: ২০ মণ। এই ২০ মণ বীজ থেকে তৈল হবে প্রায় ৪ শ’ লিটার। প্রতি লিটার তৈল বাজারে বিক্রি হবে কমপক্ষে আড়াই শত টাকা হিসাবে। এই হিসাবে আমি তৈল বিক্রি করতে পারব ১ লাখ টাকার।’
একই ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক ফজলু মিয়া সূর্যমুখির চাষ করেছেন ১ কেয়ার জমিতে। প্রথম বারের মতো ১ কেয়ার জমিতে সূর্যমুখির চাষ করলেও পরবর্তী বছর আরও বেশি চাষ করবেন বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
শহরের গোবিন্দাস রেস্টরেন্টের ম্যানেজার পিংকু তালুকদার বলেন,‘আমরা ‘সূর্যমুখি’ তৈল বিক্রি করি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একাদশীতে এই তৈল ব্যবহার করা হয়। হৃদ রোগীরাও এই তৈল কিনে নেন। শহরের সৌখিন ট্রেডার্স থেকে এই সূর্যমুখি তৈল কিনে আনি প্রতি ৫ লিটার ১ হাজার টাকায়। এই দুই দোকান ছাড়া কোথাও নেই। ঢাকায় এই তৈল বিক্রি হয় ৮২০ টাকায়।’
সুনামগঞ্জের বিনা উপ-কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন,‘সূর্যমুখির বীজ থেকে যে তৈল উৎপন্ন হয়, সেই তৈল স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন। অলিভ ওয়েলের পরেই সূর্যমুখি তৈলের অবস্থান রয়েছে। সোয়াবিন ও সরিষা ভোজ্য তৈলের ঘাটতি পুরণ করবে সূর্যমুখি তৈল।’
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার সালাহ উদ্দিন টিপু বলেন,‘সূর্যমুখি ফুলের চাষ খুবই লাভজনক। প্রথমবার কৃষকেরা চাষ করে লাভবান হবেন কিনা এ নিয়ে শংকিত আছেন অনেকে। তবে এই চাষে কৃষকদের অনেক লাভ হবে এটা আমাদের বিশ্বাস। আগামীতে উপজেলায় সূর্যমুখি ফুলের চাষ আরও বাড়বে।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার দীপক কুমার দাস বলেন,‘বেশি লাভজনক ফসল সূর্যমুখি। এটা থেকে তৈল, খৈল ও ব্যাপক জ্বালানী পাওয়া যাবে। তৈল বিক্রিতে কৃষকের যেমন লাভ, তেমন খৈল ও জ্বালানী বিক্রিতে কৃষকেরা লাভবান হবে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার সিরাজুল হক বলেন,‘হাওর অঞ্চলের উঁচু জমিতে সূর্যমুখি ফুলের চাষে অপর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমবার যারা সূর্যমুখি ফুলের চাষ করেছেন। ফসল উঠার পর তাঁরা অনেক লাভবান হবেন। পরবর্তীতে বেশি পরিমাণে সূর্যমুখির চাষ করতে আগ্রহী হবেন কৃষকেরা।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সফর উদ্দিন বলেন,‘জেলার ৮ উপজেলায় এবার দুই শতাধিক বিঘা জমিতে সূর্যমুখি’র চাষ হয়েছে। সূর্যমুখির চাষ লাভজনক। এই চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াবে। এবার আমরা সূর্যমুখি চাষের জন্য কৃষকদের সার ও বীজ প্রণোদনা দিয়েছি। আগামীতে আরও বেশি পরিমাণে সূর্যমুখির চাষ হবে এমন প্রত্যাশা আমাদের।’