- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সূর্যমুখী চাষে সম্ভাবনার হাতছানি

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
চারপাশে ঘন সবুজের উন্মত্ত উল্লম্ফন। বিস্তৃত ধানী জমির মাঝখানের একাংশ দখল করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ হলদেটে উঁচু সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ সাগরের মধ্যস্থলে সাজানো কোন দ্বীপ। সেই গুছানো দ্বীপে পেখম মেলেছে সূর্যাকৃতির অসংখ্য হলুদ বর্ণালী ফুল। গাঢ় সবুজের বৃহৎ পাতা আর বুকসম উঁচু ডাটায় ভর করে ফুলগুলো হাসছে সূর্য চকচকে হলুদাভ হাসি। সবুজের বুকে এ যেন এক অন্যরকম নজরকাড়া দৃশ্য। দৃষ্টিনন্দন এ দৃশ্যের গায়ে হলুদ রঙ ছিটিয়ে দিয়েছে কৃষকের আবাদকৃত সূর্যমুখী ফুল। আর এ ফুল দেখতে দূর-দূরান্ত আসছেন প্রকৃতিপ্রিয় অসংখ্য মানুষ।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রামপুর সরেজমিনে গিয়ে এমন মনোরম দৃশ্য দেখা গেছে। এর আবাদ করেছেন রামপুর গ্রামের দুই ভাই ফজলুল হক ও মোঃ তাজউদ্দিন। প্রায় ১০-১২ বিঘা জমিতে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষ করে প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। এছাড়া সূর্যমুখীর পাশাপাশি সমপরিমাণ জমিতে ভুট্টা আবাদ করেও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কৃষক।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখানকার কৃষকেরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ধানের ন্যায্যমূল্য অপ্রাপ্তিসহ নানা কারণে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তাই ধানের পাশাপাশি অধিক লাভজনক সূর্যমুখী ও ভুট্টা চাষে কৃষকদের কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায় সেই চেষ্টা চালিয়ে যায় উপজেলা কৃষি অফিস। তারই প্রেক্ষিতে অনেক কৃষকের সাথে যোগাযোগ করে প্রায় ব্যর্থ হচ্ছিলেন তারা। সূর্যমুখী চাষ একেবারে নতুন এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় কেউই এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছিলেন না।
অবশেষে সূর্যমুখী ও ভুট্টা চাষের নিয়ম-নীতি বাতলে লাভজনক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রামপুর গ্রামের কৃষক ফজলুল হক ও তাঁর ভাই তাজউদ্দিনকে সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। পরে সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হন তারা। এর জন্য বিঘা প্রতি দেড় কেজি করে বীজ সরবরাহ করা হয়। প্রতি কেজি বীজের মূল্য প্রায় দেড় হাজার টাকা। এছাড়া প্রয়োজনীয় সার ও বীজ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর।
এ ব্যাপারে কৃষক ফজলুল হক বলেন, ‘কৃষি অফিস থেকে আমাদেরকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও প্রথমে কিছুটা সংশয় কাজ করছিল। পরে সাহস করে সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হই। বর্তমানে ফলন যে হারে হয়েছে তাতে দেখা দিয়েছে উজ্জ্বল সম্ভাবনা। আমাদের আবাদকৃত এ সূর্যমুখী পাপড়ি মেলে নিজেও যেমন হাসছে তেমনি অন্যদেরকেও হাসাচ্ছে। আশা করছি এর ফলন সন্তোষজনক হবে এবং আগামীতে অনেকেই সূর্যমুখী চাষে আকৃষ্ট হবে।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড) জাতের এই সূর্যমুখী প্রতি বিঘায় প্রায় ৮-৯ মণ ফলন হবে। যার উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। এর বাজারমূল্য ২ হাজার টাকা মণ ধরে প্রতি বিঘায় প্রায় ১৬ হাজার টাকা মূল্যমানের ফলন পাওয়া যাবে। খরচ বাদ দিলে প্রতি বিঘায় প্রায় ৮ হাজার টাকা লভ্যাংশ পাবে কৃষক। অন্যদিকে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদন হয় প্রায় ১৫ মণ। এর বাজারমূল্য থেকে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে কৃষকের ভাগ্যে জুটে মাত্র হাজার দু’য়েক টাকা। একই জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে কৃষক পাবেন ৮ হাজার টাকা। তাহলে ধানের চেয়ে সূর্যমুখীতে অধিক লাভ দেখছে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর।
আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিদদের দেওয়া অনলাইন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, সূর্যমুখী তেলে আছে মানবদেহের জন্য উপকারী ওমেগা ৯ ও ওমেগা ৬, আছে অলিক অ্যাসিড। সূর্যমুখীর তেলে শতকরা ১০০ ভাগ উপকারী ফ্যাট ছাড়াও আছে ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, মিনারেল এবং কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও পানি। সূর্যমুখীর তেল সম্পূর্ণ ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলমুক্ত। মুখের যতেœ দাঁতের জন্য উপকারী একমাত্র তেল। হৃদরোগী, ডায়াবেটিসের রোগী উচ্চ রক্তচাপের রোগী, কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখীর তেল নিরাপদ।
দেহের জন্য অনেক উপকারী এই সূর্যমুখী চাষে কৃষক এগিয়ে আসলে কৃষক যেমন লাভবান হবে তেমনি লাভবান হবে দেশ। প্রশিক্ষণসহ সার ও বীজ সুবিধার পাশাপাশি আর্থিক সুবিধা পেলে এখানকার দরিদ্র্য কৃষকেরা এতে ব্যাপক হারে উদ্বুদ্ধ হবে। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সরকারি সহযোগিতা।
সূর্যমুখীর সম্ভাবনাময় বাস্তবতা দেখে রামপুর গ্রামের কৃষক মো. হান্নান ও মানিক মিয়া জানিয়েছেন, ‘সূর্যমুখী এখানে প্রথম চাষ করা হয়েছে। তাই এর উৎপাদন সফলতা নিয়ে আমরা কিছুটা সন্দিহান ছিলাম। তবে ফলন দেখে বেশ ভালোই মনে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে মহিলাদের আগ্রহ বাড়ছে। ধান চাষে তেমন লাভবান না হওয়ায় মানুষ সূর্যমুখীতে লাভ খোঁজার চেষ্টা করবে।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, ‘এখানকার কৃষকের জন্য সূর্যমুখী সম্পূর্ণ নতুন একটা শস্য। ধানের পাশাপাশি কৃষক যদি সূর্যমুখী ও ভুট্টা উভয়ই চাষ করে তাহলে ধানের চেয়েও অধিক লাভবান হবেন তারা। তাই একফসলী এই অঞ্চলে আমরা এগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। এ জন্য সার, বীজ ও প্রশিক্ষণসহ যেকোন ধরনের সহায়তা করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।’
উল্লেখ্য, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রামপুরের এ সূর্যমুখী ক্ষেত স্বপরিবারে পরিদর্শনে এসেছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ। এ সময় তিনি ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সূর্যমুখী, টমেটো, মরিচ, বেগুন, সরিষা চাষের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

  • [১]