- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সেই পুরনো টাঙুয়ার জন্যই আমাদের যত আকুতি

গত মঙ্গলবার তাহিরপুর উপজেলায় টাঙুয়ার হাওর বিষয়ক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বলে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউএনডিপি ছিলো ওই কর্মশালার যৌথ আয়োজক। বুঝা যায় টাঙুয়ার হাওরে নতুন কোনো প্রকল্প আসতে যাচ্ছে। এর আগে দাতা সংস্থার অর্থায়নে এই হাওরে যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিলো তার অভিজ্ঞতা কারও জন্যই সুখকর ছিলো না। মিঠা পানির মাছের অন্যতম প্রজনন স্থল ও উৎপাদনস্থল হিসাবে বিবেচিত, বৃক্ষ-লতা-গুল্ম সজ্জিত এবং বহু বিরল প্রজাতিসহ অতিথি পাখিদের বিচরণ স্থল এই টাঙুয়ার হাওর সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে শেষ পর্যন্ত যেমন মৎস্য শূন্য হয়েছে তেমনি হয়েছে পাখি শূন্য। মূলত প্রকল্প প্রস্তাবনায় কোনো গলদ ছিলো না। ছিলো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। আর এ কারণেই নির্বিচারে মাছ চুরি হয়েছে হাওরের। কেটে নেয়া হয়েছে হিজল-করস গাছ। এই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকে সাবেক ইজারাদার বা জল-সর্দাররা প্রকল্পের দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত করে ইজারাদারি প্রথার আবশ্যকতাকে সামনে আনার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। এখন যখন নতুন আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে তখন সবার আগে ভাবতে হবে, কীভাবে হাওরের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা যায়।
প্রকল্প-ব্যবস্থাপনা কালে টাঙুয়ার হাওরে মাছ উৎপাদনে স্থানীয় এলাকাবাসীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু কার্যত সম্পৃক্ত মানুষরা হাওরের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেননি। বিশাল টাঙুয়ার হাওরকে জন-পাহারাদারির পরিবর্তে গুটি কয়েক আনসার ও পুলিশ সদস্যের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। চোরচক্র এর সুযোগ গ্রহণ করেছে ভালভাবে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত ছিল যে, এই চোরচক্রের সাথে অবৈধ যোগসাজস ছিলো সরকারি পাহারাদারদের। অন্যদিকে বিশাল হাওর যার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত কয়েক কিলোমিটার বিস্তৃত, সেখানে গুটিকয়েক পোশাকধারী পাহারাদার দ্বারা গোটা জলমহালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কখনও সম্ভব নয়। এই হাওরে স্থানীয় এলাকাবাসী ও মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ততা ব্যতীত মাছ রক্ষা যে সম্ভর হবে না অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সেটি বুঝতে হবে।
হাওরের মাছের বংশ বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাছ ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এই সময়টাতে যাতে হাওর তীরবর্তী লোকজনের জীবন রক্ষা পায় সেজন্য বিকল্প পেশার সন্ধান করতে হবে। জড়িত ব্যক্তিদের মানসিকভাবে বুঝাতে হবে যে তারাই হাওরের মৎস্যসম্পদের প্রকৃত মালিক। মানুষ যখন নিজের মালিকানার বিষয়টি বুঝতে পারবে তখন যে ভালবাসা, ঐকান্তিকতা ও আন্তরিকতা নিয়ে হাওর রক্ষায় নিয়োজিত হবে তা আর কোনো কিছুতে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রচলিত সরকারি-বেসরকারি দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তথাকথিত সভা-সেমিনার-ওয়ার্কশপের চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে জন-সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে সবচাইতে বেশি। হাওর সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে যত ওয়ার্কশপ-কর্মশালাই করা হোক না কেন সেখান থেকে হাওর-বান্ধব কোনো পরিকল্পনা বেরিয়ে আসবে না।
টাঙুয়ার হাওর সারা বাংলাদেশের জন্য সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্যসম্পদ তো রয়েছেই। প্রাকৃতিকভাবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই হাওর বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ। হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনও বিকশিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। হাওরের সবগুলো অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আর এজন্য মতামত নিতে হবে হাওরবাসীর নিকট থেকে। এরা বংশ পরাম্পরায় হাওরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছেন। এই জ্ঞান পুঁথিগত বিদ্যার চাইতে কম নয়। এদের জ্ঞান এদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত করতে হবে। তবেই আমরা আবারও টাঙুয়াকে করতে পারব মৎস্যবতী, বৃক্ষশোভিত। লতাগুল্মের সবুজ মায়াবী রাজ্যে নিয়ে যেতে পারব হাওরকে। আর তখন নানা জাতের পাখিরা আবার হাওরে ডানা মেলবে। আমরা ফিরে পাব পুরনো টাঙুয়াকে। সেই পুরনো টাঙুয়ার জন্যই আমাদের যত আকুতি।

  • [১]