- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সোনামিয়া আমার বন্ধু ছিলেন

ড. জাফর সিদ্দিক
সম্ভবত: ১৯৭৯/৮০ সন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের আাবাসিক ছাত্র। হলের একজন নতুন ছাত্র দেখা করতে এলেন; থাকার জায়গা নেই। সংগঠনের সিনিয়র নেতারা পাঠিয়েছেন আমার রুমে ক’দিন থাকার সুযোগ দেয়া যায় কিনা। আলাপ হলে বুঝলাম তার কথা আগে শুনেছি। দিরাই- শাল্লার ধনী কৃষক, জোতদারদের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষক, ক্ষেত মজুরদের আন্দোলন সংগঠনে তার সাহসী অবদানের কথা অনেকেই জানেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। থাকার জায়গা নেই। দেখতে একটু স্বাস্থ্যবান, কিছুটা বয়েসী। ইতোমধ্যে বিয়ে করেছেন, এক সন্তানের জনক। ছেলের নাম লেনিন, বয়স এক কি দুই।
অকপট কথাবার্তায় ভাল লাগল ছাত্রটিকে। সমাজ  পরিবর্তনের একজন সক্রিয় যোদ্ধাকে ঘরে স্থান দিতে পেরে মনে মনে কিছুটা গর্বিতই ছিলাম। আমার কক্ষে খুব বেশিদিন ছিলেন না, সোনামিয়া। তবে তরুণ বয়সে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য বেশি সময় লাগে না। তাছাড়া ‘চড়ষরঃরপং সধশবং ংঃৎধহমবৎং নবফ ভবষষড়’ি প্রবাদটিতো সর্বাংশে সত্যি। সোনামিয়ার কাছ থেকে তার সংগ্রামী জীবনের গল্প শুনে একদিন বিপ্লব হবে এবং সে বিপ্লবের পথ ধরে দেশে একদিন শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, এ স্বপ্ন দেখতাম।
তারপর দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ২০০৩ সনে জহিরকে দেখলাম সুনামগঞ্জে। আমি জেলা প্রশাসক হিসেবে সদ্য যোগদান করেছি। ইতোমধ্যে তার রাজনীতি পরিবর্তনের কথাও শুনেছি। জহির আমার সাথে দেখা করতে এলেন একজন অ্যাডভোকেট এবং রাজনৈতিক হিসেবে; যিনি সরকার বিরোধী দলে আছেন। চেহারায় কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও আমি জহিরকে চিনতে পারলাম। কিন্তু জহির আমাকে চিনতে পারেনি। হলে আমি সবার কাছে কেবল আমার ডাকনামে পরিচিত ছিলাম। সে আমাকে দেখে কিছুটা দ্বিধায় পড়েছিল মনে হয়। কিন্তু আমি পুরানো কোন প্রসঙ্গ না তোলায় সে আমাকে অপরিচিত বলেই ধরে নিয়েছিল।
আমার সুনামগঞ্জ জীবনের মাঝামাঝি কোন এক সময় অ্যাডভোকেট জহির তার লেখা একটা গানের বইয়ের পান্ডুলিপি আমাকে পড়তে দিয়ে ওটা ছাপানোর ব্যাপারে কোন সহায়তা করতে পারি কিনা জানতে চায়। আমি পান্ডুলিপিটি বাসায় নিয়ে আসি এবং অবসরে ওটা পড়তে বসি। সহজ ভাষা, ছন্দ ও মরমিয়া ভাবটি আমার খুব ভাল লাগে। জহিরকে আমার কাছে হাসনরাজা, রাধারমণ, শাহ করিমের একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী বলে মনে হয়। আমি তাকে ডেকে তার লেখার উচ্চ প্রশংসা করি এবং বইটি ছাপানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দেই। জহিরের অনুরোধে বইটির একটি ভূমিকাও আমি লিখে দিই। যদ্দুর মনে হয় সুনামগঞ্জের একজন ব্যবসায়ী, সজ্জন ব্যক্তি জহির আহমদের গানের প্রথম বইটি ছাপানোর ব্যয় বহন করেছিলেন। আমি জহিরকে গানগুলো সুনামগঞ্জের শিল্পীদের গাওয়ানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম।
আমি সুনামগঞ্জ ছেড়ে আসার বেশ ক’বছর পর জহির একদিন আমাকে ফোন করে বাসায় চলে এলেন। সাথে তাঁর ছেলে, সম্ভবত: লেনিন (আমার ঠিক মনে নেই)। তিনি তাঁর গান গানের সদ্য প্রকাশিত অ্যালবামের সিডি আমাকে দিতে এসেছেন। এসময় তাকে একজন সফল ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছিল।
জহির আহমদ সোনা মিয়া আইনজীবী হিসেবে কিংবা রাজনীতিক হিসেবে হয়তো খুব বেশি সফল ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি সফল ছিলেন বলে মনে করি। অনেকে বিরক্ত হলেও তিনি স্পষ্ট কথা বলতেন। তিনি কাউকে তোয়াজ করতেন না। রাজনীতি পরিবর্তন করলেও নিজ এলাকার মানুষের কল্যাণে তিনি সচেষ্ট ছিলেন।
একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। সুনামগঞ্জে একদিন রাত বারটার পরে অ্যাডভোকেট জহির আমাকে ফোনে জানালেন তাঁর নিজ এলাকার একটি বাজারে ডাকাতির চেষ্টা হচ্ছে। ডাকাতরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাজারে হানা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে; আমি যেন কিছু করি। এও জানালেন থানায় যোগাযোগ করতে পারছেন না। ভীষণ দ্বিধায় পড়লাম। এ ধরণের সংবাদ বেশির ভাগ অনুমান নির্ভর। এতে বিশ্বাস করে গভীর রাতে জেলা পুলিশ প্রধানের নিদ্রা ভঙ্গ করা কতটা সমীচীন তাই ভাবছিলাম। যাক, শেষ পর্যন্ত এসপি সাহেবকে ফোন করে বিষয়টি জানালাম। পরের দিন এসপি সাহেব ধন্যবাদ দিয়ে জানালেন যে, সংবাদটি সঠিক ছিল। পুলিশ কাউকে ধরতে না পারলেও বাজারের নিকটবর্তী এলাকা থেকে অস্ত্রসহ নৌকাটি আটক করেছে। এটা ছিল জহির আহমদ সোনা মিয়ার কাজের একটি ধরণ। অন্য কেউ এতরাতে ডিসি, এসপির ঘুম ভাঙাতে যেতেন বলে মনে হয় না। কারণ তথ্য ভুল হলে এতে বিরূপতার আশংকা ছিল।
ফেসবুকে জানতে পারলাম অ্যাডভোকেট জহির দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ঢাকার একটি হাসপাতালে দেহত্যাগ করেছেন। তিনি অসুস্থ হয়ে ঢাকায় ছিলেন এটি জানলে তাঁকে শেষ দেখার সুযোগ পেতাম। এজন্য মনে গভীর দু:খ রয়ে গেল।
জীবনের নশ্বরতা, মৃত্যু, মৃত্যর পর পুনরুজ্জীবন এসব চিন্তা সোনামিয়াকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। এসবই তাঁর গানের মূল বিষয়। সোনা মিয়ার তিরোধানের পরও তাঁর রচিত গানগুলো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে এ প্রত্যাশা আমার।
লেখক: পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সাবেক জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ।

  • [১]