- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সোনালী ধানে কৃষকের তৃপ্তির ঢেঁকুর, ধানের সরকার নির্ধারিত মূল্য বাড়ানোর দাবি

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই- ছোটো সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কবিতার এ পঙক্তিমালা যেন এবারের বৈশাখে উৎপাদিত ফলনের সন্তুষ্টিজনক ভাবের জানান দিয়ে যাচ্ছে। সোনার ধানে গোলাভরা আনন্দ প্রকাশ করতে সুনামগঞ্জের কিষাণ-কিষাণীসহ হাওরের মানুষেরা ফসল তোলার প্রায় শেষপর্যায়ে এসে কবিগুরু রচিত এ দুটি লাইনের সাথে সুর মেলাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে সোনার ধানে যে ভরে গেছে কৃষকের গোলা তার আনন্দ হাওর পারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
করোনাকালীন অদ্ভুত পরিস্থিতিতেও সোনালী ফলন প্রাপ্তির জোয়াড়ে ভাসছে সুনামগঞ্জের হাওর তীরবর্তী গ্রামগুলো। নতুন ধান ও কাঁচা খড়ের মৌ মৌ গন্ধে এখনও মাতাল হাওরের জনপদ। পর্যাপ্ত ফলন, প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশ, সরকারের যান্ত্রিক সহযোগিতাসহ তুষ্টিদায়ক দামের কারণে কৃষকের মনে তৃপ্তির ঢেঁকুর উঠছে। সবকিছু মিলে আনন্দে আত্মহারা কৃষক তাদের গোলাভর্তি স্বপ্নের ফলন সন্তোষজনক দামে বিক্রি করতে চান। এর মাধ্যমে ধারদেনা পরিশোধ করে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনে ফিরতে চান হাওরর পারের কৃষকেরা। এ জন্য ধানের বর্তমান বাজার দর থেকে অন্তত ২০০ টাকা বাড়িয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্য পুনঃনির্ধারণ করলে কৃষকেরা উপকৃত হবে বলে জানিয়েছেন কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা।
জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এ বছর হাইব্রিড জাতের ধান চাষ হয়েছে ৫৭ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে। গত বছর যা ছিলো ৩৬ হাজার ৫১০ হেক্টর। আবাদকৃত জমি থেকে ৯ লাখ ১ হাজার ১০ মে.টন চালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লাখ টন নির্ধারণ করা হলেও বাম্পার ফলন হওয়ায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। সুনামগঞ্জে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ধান উৎপাদন হয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার ১৪০ কোটি টাকার ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জে ধান কাটার জন্য এ বছর সরকার ৭০ ভাগ ভর্তুকীতে ১১৫টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন বিতরণ করে। পুরানো মেশিন ছিলো ১২৯টি। হাওরে মোট ৩০৭টি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হয়েছে। একই পরিমাণে ভর্তুকী দিয়ে এবার ১৯টি রিপার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। মেশিনের পাশাপাশি ২ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক ধান কেটেছে হাওরে। সব মিলে এ বছর ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা যায়।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ওই আড়তে ২৯ জাতের ধান কেনা হয়েছে ৯২৫ থেকে ৯৩০, ২৮ জাতের ধান ৯৪০ থেকে ৯৪৫ এবং মোটা ধান বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকায়।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শাহানা আল আজাদ বলেন, অনেক বছর পর হাওরের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত বাম্পার ফলন নিরাপদে ঘরে তুলতে পেরেছেন। এ জন্য করোনাকালেও কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। ফসল উৎপাদনের খরচের তুলনায় সরকারের কাছ থেকে সঠিক মূল্য আশা করছে তারা। বাজার মূল্য থেকে সরকার যদি কমপক্ষে ২০০ টাকা বেশি দামে ধান ক্রয় করে তাহলে কৃষক উপকৃত হবে। এতে আগামী বছর ফসল উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে।
শাল্লার আটগাঁও ইউনিয়নের ছায়ার হাওর তীরবর্তী মামুদনগর ফরিদপুর গ্রামের কৃষক মো. রিয়াজ উদ্দিন ও মো. মতিউর রহমান জানিয়েছেন, এবারের সোনার বৈশাখ দিয়েছে। গত ত্রিশ বছরের ভেতরে এমন বৈশাখ হয়নি। কোন বৃষ্টিপাত ঝড়-ঝাপটা কিছু নেই। যদিও গরম হাওয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে, তারপরও ভালো। সুন্দরভাবে তারা ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। আল্লাহর রহমতে ধানও ভালো হয়েছে, দামও ভালো। বর্তমানে ধানের যে দাম আছে, আগামীতে আরও বাড়বে। তখন সব কৃষকই লাভবান হবে।
বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওর পারের পদ্মনগর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক হীরেন্দ্র নাথ সুবল বলেন, আমার বয়স প্রায় ৬০। এই বয়সে আমি এত সুন্দর বৈশাখ আর দেখিনি। ফসল হয়েছে ভালো, ধানের দামদরও ভালো, দিনও দিয়েছে ভালো। এছাড়া সরকারও দ্রুত ধান কাটতে হাওরে হাওরে ধান কাটার (হারভেস্টার) মেশিন দিয়েছে। সব মিলে এবারের বৈশাখটা কৃষকের মনে বাড়তি প্রশান্তি এনে দিয়েছে। এমন হলে কৃষকের মনে আর দুঃখ থাকবে না।
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক ও উপজেলা কৃষক লীগের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক খসরু ওয়াহিদ চৌধুরী বলেন, এবার ধান ভালো হয়েছে। ধানের বর্তমান বাজার দরও অন্য বছরের তুলনায় ভালো। সরকার বর্তমানে ২৭ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৮০ টাকা যে দাম নির্ধারণ করেছে তাতে কৃষক তেমন লাভবান হবে না। কারণ বর্তমানে ধানের দাম ৯০০ টাকা। কয়দিন পর আরও বাড়বে। তাহলে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে কৃষক কতটুকু লাভবান হবে?
এ ব্যাপারে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, সরকার ধানের দাম ১ হাজার ৮০ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে এই দাম আরেকটু বাড়লে কৃষকরা আরও উৎসাহিত হবে। নইলে বর্তমান দামে সাধারণ কৃষক সরকারি গুদামে ধান দিতে যাবে না।

  • [১]