- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সোনালী বোরো ধান: আশঙ্কার দোলাচল

ডা. মোরশেদ আলম
সুনামগঞ্জ জেলা প্রকৃতিগতভাবে একটি হাওরপ্রধান জেলা। এ জেলায় রয়েছে ছোট বড় অনেক হাওর-বাওর, খাল-বিল, নদী-নালা। এ জেলার প্রধান ফসল হল বোরো ধান। বোরো ধান বৎসরে একবার উৎপন্ন হয়। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কৃষক বোরো ফসল চাষের সাথে সংম্পৃক্ত। এই বোরো ফসল হাওর এলাকার কৃষকের সোনালী স্বপ্নের উৎস। এই সোনালী ধান কৃষকের সারা বৎসরের খাদ্যের চাহিদা মিটায়। উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে কৃষক তার সন্তান-সন্ততির লেখাপড়া, বিয়ে-শাদিসহ সংসারের যাবতীয় খরচ সংকুলান করে থাকেন। বোরো ফসল অনেকটাই প্রকৃতির খেয়ালের উপর নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা, অকাল বন্যা, পাহাড়ী ঢল, শিলাবৃষ্টিসহ প্রকৃতির বৈরি আচরণে কোন কোন বৎসর কৃষকরা স্বপ্নের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারেন না।  ফসল ঘরে তুলতে না পারলে কৃষকদের কষ্টের সীমা থাকে না। অকাল বন্যা অথবা পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল রক্ষার জন্য হাওরে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। পুরানো বাঁধগুলোর ভাঙ্গা অংশ মেরামত করতে হয়। বিভিন্ন হাওরে প্রয়োজনীয় স্থানে স্থানে রয়েছে স্লুইসগেট। স্লুইসগেট বন্ধ করে বাঁধ উঁচু করে পুরানো বাঁধ মেরামত করে পাহাড়ি ঢল থেকে বোরো ফসল রক্ষা করতে হয়। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকেন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড সেই অর্থ দিয়ে পিআইসি ও ঠিকাদারের মাধ্যমে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করে বোরো ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন। কিন্তু গত বছর বাঁধের কাজ নিয়ে দুর্নীতির কারেেণ সময়মত যথাযথভাবে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করা হয়নি। যার ফলে পাহাড়ি ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে সকল হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। কৃষকরা একগোটা ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এমনকি গবাদিপশুর খাবারের জন্য খড়ও জোগাড় করতে পারেননি। ফলে অনেকেই চাষাবাদের অন্যতম উপাদান গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। হাওরে বন্যার পানিতে ধান গাছ পঁচে বিষাক্ত এমোনিয়া গ্যাসের সৃষ্টি হয়ে হাওরে মাছের মড়ক দেখা দেয়। সেই সাথে হাজার হাজার হাঁসও মারা যায়। এ এক দুর্বিসহ করুণ অবস্থা। হাওরপাড়ের কৃষকদের অবর্ণনীয় দুঃখদুর্দশার যেন এক বিষাদসিন্ধু। বাঁধের কাজ নিয়ে দুর্নীতির কারণে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার বোরো ধান ক্ষতি হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বোরো চাষের সাথে সম্পৃক্ত এ জেলার ১০ থেকে ১৫ লক্ষ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জেলার ২৬ লক্ষ মানুষ অভাবের সাথে যুদ্ধ করে আজোবধি খেসারত দিয়ে যাচ্ছেন। মুষ্টিমেয় লোভী দুর্নীতিবাজদের কারণে আজ এ জেলার কৃষকসহ সাধারণ মানুষ খাদ্যাভাবসহ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়ে-শাদি, দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয় সম্পাদনে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে পতিত হয়েছেন। এই মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ সৃষ্টিকারীদের যেন একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় সুনামগঞ্জবাসী সেই প্রত্যাশা বুকে ধারণ করে আছেন।
সুনামগঞ্জ জেলার বোরো ফসল হানির এই দুর্দশার চিত্রটি সদাশয় সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জ সফর করে স্বচক্ষে অবলোকন করে গেছেন এবং মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ওএমএস, ভিজিএফ ও ভিজিডির মতো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী চালু রেখেছেন। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের কোন প্রকার ছাড় না দেয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন। ফসল হারা দুর্দশাগ্রস্ত বিপন্ন সুনামগঞ্জবাসীর প্রতি সার্বিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের জন্য ¯েœহপরায়ন ও জনবান্ধব সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।  
গত বছরের বোরো ফসল হানির পর এ বছর সরকার কাবিটা প্রকল্পের নীতিমালা সংশোধন করেছেন। কাবিটা নীতিমালা’২০১৭ অনুসারে এবার বাঁধের কোন কাজ আর ঠিকাদারকে দিয়ে করানো হবে না। পরিবর্তে হাওরের জমির মালিক ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে ৫ থেকে ৭ সদস্যের সমন্বয়ে পিআইসি গঠন করে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতের বরাদ্দ থেকে বাঁধের কাজ করানো হবে। সে মোতাবেক এবার উন্নয়ন খাতে ৩১ কোটি ৫২ লক্ষ পয়ত্রিশ হাজার টাকা এবং অনুন্নয়ন খাতে ২৮ কোটি ৮৮ লক্ষ বায়ান্ন হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান করেছেন। অনুন্নয়ন খাতে অতিরিক্ত আরও ৪৬ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ চেয়ে প্রকল্প প্রেরণ করা হয়েছে। উন্নয়ন খাতের অর্থ দিয়ে বাঁধ উঁচুকরণের কাজ এবং অনুন্নয়ন খাতের বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে বাঁধের ভাঙ্গন অংশ মেরামত করা হবে।
সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলার ৩৬ টি বড় হাওর ও ১৭টি উপ প্রকল্পসহ মোট ৫৩টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ৯১৪ টি পিআইসি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হযেছে। কাবিটা নীতিমালা’২০১৭ অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সকল পিআইসি গঠন শেষ করতে হবে এবং পিআইসিগুলো ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু করবে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ সমাপ্ত করবে। আমরা সুনামগঞ্জবাসী প্রত্যাশা করব জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি এবং সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিগণ সুনামগঞ্জের ২৬ লক্ষ মানুষের খাদ্যের জোগান এই বোরো ফসল চাষাবাদে বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে ধান গোলায়  
তোলা পর্যন্ত যে যে কাজ করা প্রয়োজন, সে সকল বিষয়ে সময়কে প্রাধান্য দিয়ে সঠিকভাবে ও গুরুত্বের সাথে প্রতিটি বিষয়ে কৃষকদেরকে সহায়তাসহ সততার মাধ্যমে নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবেন। কৃষি সহায়তা হিসেবে সরকার বিনামূল্যে কৃষকদেরকে বীজ, সার ও নগদ অর্থ প্রদান করেছেন। সরকার কৃষকদের জন্য যথেষ্ট সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। এখন আমাদের কর্তব্য নিজেদেরকে কর্মে নিয়োগ করা। জানা মতে হাওরের পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর না হওয়ায় কৃষকরা এখনো বীজতলা তৈরি করতে পারেননি। অগ্রহায়ন মাসের আজ ১৬ তারিখ। এখনও যদি কৃষকরা বীজতলা তৈরি করে ধানের চারা উৎপাদন করতে না পারেন তাহলে  পৌষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে হাওরের জমিতে বোরো ধানের চারা রোপন করবেন কিভাবে? কমপক্ষে ধানের চারার বয়স ৪০ থেকে ৪৫ দিন হতে হবে। এর চেয়ে কম  বয়সী চারা রোপন করলে ফলন কম হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হাওরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য সরকার কর্তৃক ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে মর্মে জানা যায়। ২৬ নভেম্বর জেলা কমিটির অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক মহোদয়ের ভাষ্যমতে হাওরের পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণার্থে ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের জন্য ৪ লক্ষ টাকা এবং অন্য প্রত্যেক উপজেলার জন্য ২ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। হাওরের পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কর্মকর্তা (এসও)। ১৫৪ টি হাওরে ৫৬টি স্লুইসগেট ও ১৮টি পাইপ স্লুইসগেট রয়েছে। এগুলোর ৯০ ভাগই সমস্যায় আক্রান্ত। হয় খাল ভরাট হয়ে আছে। না হয় স্লুইস গেটের ভার্টিক্যাল গেট পলবোর্ড ঠিকমত নেই। আমরা ঘরপুড়া সুনামগঞ্জবাসী আশা করব সঠিক সময়ের মধ্যেই হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। নতুবা ধান রোপন পিছিয়ে গেলে অকাল বন্যা অথবা পাহাড়ি ঢলে আবারও ফসল হানির আশংকা সৃষ্টি হবে।
এবার হাওরের বাঁধ নির্মাণ কাজকে সুষ্ঠু ও সাবলীল করার জন্য জেলার ১১টি উপজেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেমন- পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর)-বিভাগ ১ ও বিভাগ ২। পওর-১ এর অধীন উপজেলাগুলো হলোÑ সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং জামালগঞ্জ এই ৫টি। এর দায়িত্বে আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব আবু বকর ছিদ্দিক ভূইয়া। পওর-২ এর অধীন উপজেলাগুলো হলোÑ ছাতক, দোয়ারাবাজার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই এবং শাল্লা এই ৬টি উপজেলা। এর দায়িত্বে আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব মো: শাহীনুজ্জামান।
নদী ভরাট এ জেলার একটি প্রধান সমস্যা। এ জেলার হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে পলি ভরাট হওয়ার কারণে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসলে নদীগুলো তা ধারণ করতে পারে না। ফলে অল্পতেই নদীর পানি ফুলেফেঁপে হাওরে প্রবেশ করতে চায়। তাই হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলো নদীর পানির প্রবল চাপের সন্মুখীন হয় এবং কোনো কোনো সময় বাঁধ ভেঙ্গে পানি হাওরে প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে যায়। তাই নদী খনন করে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ পানি ভাটির দিকে নেমে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারলে এই বিপদ অনেকটাই লাঘব হবে বলে আশা করা যায়। জেলার হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৬টি নদীর ৯৮ কিলোমিটার খননের জন্য সদাশয় সরকার ২৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেছেন। জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রক্তি নদীর ৬ কিলোমিটার খননের জন্য ১৭.০৮ কোটি টাকা। তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত জাদুকাটা নদীর ৬.১২৫ কিলোমিটার খননের জন্য ১১.৬৫ কোটি টাকা। ধর্মপাশা-জামালগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত আপার বৌলাই নদীর ১৬ কিলোমিটার খননের জন্য ৩০.৭০ কোটি টাকা। দিরাই-শাল্লা ও কিশোরগঞ্জের মিঠামইন এলাকার পুরাতন সুরমা নদীর ৪০ কিলোমিটার খননের জন্য ১০০ কোটি টাকা। জগন্নাথপুর-দিরাই উপজেলার নলজোড় নদীর ১০ কিলোমিটার খননের জন্য ২৩.৫০ কোটি টাকা এবং দিরাই-শাল্লা উপজেলা অংশের চামতি নদীর ২০ কিলোমিটার খননের জন্য ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে সার্বিক কাজগুলো যেমনÑ (১) হাওরের জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনক্রমে বীজতলা তৈরিতে কৃষকদেরকে সহায়তা প্রদান (২) ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন করা (৩) পিআইসি কর্তৃক ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরু করা এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করা (৪) সঠিক ও মজবুদভাবে বাঁধ নির্মাণ কাজ নিশ্চিত করা (৫) নদী খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো নিশ্চিত করা। ঠিক ঠিক মত এই কাজগুলো সততার সাথে সম্পন্ন করতে পারলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বোরো চাষের সাথে সম্পৃক্ত কৃষক ও সুনামগঞ্জবাসী প্রত্যাশা করতে পারি সোনালী বোরো ফসল পাওয়া থেকে পরম দয়ালু সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না। কৃষক, জনসাধারণ, জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাগণ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে জেলার বোরো ফসল আবাদে সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন তাহলে ইনশাল্লাহ সুনামগঞ্জবাসী সোনালী বোরো ধান ঘরে তোলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। তাই বোরো চাষের সকল কাজে সকলের আন্তরিক সাহায্য সহযোগিতা কামনা করে সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম।
তথ্যসূত্র: ২৭,২৮,২৯ নভেম্বর’২০১৭ তারিখের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকা ও অন্যান্য সূত্র।   

  • [১]