সোমবার জেলার ২১২ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার ভিতর দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের নবীন নাগরিকবৃন্দের ভিতরে নেতৃত্বের গুণাবলী জাগ্রত হবে, তারা একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার যাবতীয় বিষয়াদি সম্পর্কে ধারণা লাভ সর্বোপরি গণতান্ত্রিক রীতি চর্চার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করলেন। এই নবীন নাগরিকদের পরবর্তী জীবনের প্রতিটি স্তরে এই অভিজ্ঞতা ইতিবাচক অর্থে কাজে লাগবে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গিয়েছে। এই দিনে সত্যিকার অর্থেই তারা দেশের একেক জন দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠেছিলেন। বিদ্যালয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার এই সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য আমরা সরকারকে অভিনন্দন জানাই। দেশে এখন নির্বাচনী ডামাঢোল চলছে। গতকালই ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হলো ব্যাপক প্রার্থীতা প্রত্যাহার, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। বড়দের নির্বাচনের এই খারাপ উপসর্গগুলো বিদ্যালয় পর্যায়ে ছোটদের নির্বাচনে ছিল না একদমই। কিন্তু এই ছোটরা যখন বড়দের নির্বাচনে চর্চিত বিষয়গুলি দেখতে পাচ্ছেন তখন তারাও যে এর দ্বারা প্রভাবিত হবেন না তা হলফ করে বলা যায় না। স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচনে মফস্বলের একটি বিদ্যালয়ে প্রার্থীতা হওয়ার জন্য ১৫০ টাকা ফিস গ্রহণ এবং প্রার্থী শিক্ষার্থীদের দ্বারা ভোটার শিক্ষার্থীদের চকলেট খাওয়ানোর খবর শোনা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে হাস্যরসের সৃষ্টি হলেও এর অন্তনির্হিত তাৎপর্য কোন অবস্থাতেই সুখকর নয়। এটি বড়দের নির্বাচনের মন্দ প্রভাবআক্রান্ত বলে ধরে নেয়াই সঙ্গত হবে। ভবিষ্যত এসব ছোটখাট বিষয়েও কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সরকার সাড়ম্বরে স্কুল পর্যায়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেও দীর্ঘ কয়েক দশক যাবৎ বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন করতে দিচ্ছেন না। সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশংকায় হয়তো এটি সরকার করতে চাচ্ছেন না কিন্তু এভাবে কি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংঘর্ষ ঠেকানো গেছে? বরং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে ছাত্র রাজনীতির প্রধান ধারাটি ক্রমশ মূল দলের তাবেদারি ও নিজেদের ব্যবসায়িক বৃত্তির মধ্যে আটকে পড়েছে। এ হলো ছাত্র ও ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী চরিত্র হননের শামিল। আজ দেশের শিক্ষাঙ্গনে বিরাজিত নানা সমস্যাবলী নিয়ে দেশের প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলো কখনও কোন কর্মসূচী গ্রহণ করে না। বামপন্থী কিছু ছাত্র সংগঠন এ নিয়ে তৎপরতা চালালেও তাদের আওয়াজ এতোটাই ক্ষীণ যে সেটি ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করতে পারছে না। আজ যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচন করা হচ্ছে তখন সঙ্গত কারণেই আশা করা যায় যে, সরকার অচিরেই দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
এইসব নির্বাচন ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ভিতরে সুপ্ত নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটে। দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত প্রবীণেরা একসময়ে অবসরে যাবেনই। তাদের জায়গা পূরণ করবে নতুনরা। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার পথগুলো যখন রুদ্ধ হয়ে যায় তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ হয় নেতৃত্ব গুণহীন কিছু মানুষের দ্বারা। জাতীয় রাজনীতির দিকে তাকালে এই সত্য স্পষ্ট হয়। কেন রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এতোটা বেড়েছে যার কারণে রাজনীতিটাই একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে তার নির্মোহ বিশ্লেষণ করা দরকার আজ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব গড়ে তোলার যাবতীয় পথকে রুদ্ধ করে রাখাটা এর একটি অন্যতম কারণ হিসাবে সামনে আসবে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস কাউন্সিল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। সেখানে যদি তারা স্কুল পর্যায়ে চর্চিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ধারাবাহিকতা দেখতে না পান তাহলে প্রচণ্ডভাবে হুছট খাবেন। গণতান্ত্রিক রীতি চর্চায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের এইভাবে হতাশ করা একেবারেই ন্যায়সঙ্গত নয়।