- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

স্বপ্নজয়ের পথে প্রণয় বর্মণ

স্টাফ রিপোর্টার
‘ভোর ৭ টায় ক্রাশার মেশিনও যাই, এরলাগি রাইত সকাল সকাল ঘুমাই যাই ভাই, কালকে রাইত ১০ টায় যখন আমার ছেলেডায় কইছে মা আমি ডাক্তারি পড়ার সুযোগ অইছে, আমি পুয়াডারে ধইরা জোরে চিৎকার দিয়া কান্দি, আমার পুয়াডায়ও কান্দে, তার বাপে বুঝায় কাইন্দো না- উপরওয়লায় চাইবা আমরার বায়দি, সকাল ৭ টায় আমি কামও গেছি, তার বাপ খুশিতে আজকে মাছ ধরাত গেছইন না। আমার পুয়াডার লাগি আপনারা আশীর্বাদ কইরইন বাবা।’ নিজের ছেলের এমবিবিএস ভর্তি হবার সুযোগ পাবার আনন্দের কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন পাথর শ্রমিক মনি বর্মণ।
দুই ছেলে ও এক মেয়ের মা মনি বর্মণ। পাথর শ্রমিক স্বামী নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ হাওরে মাছ ধরার কাজ করেন। দুজনের ঘাম ঝরানো শ্রমে জীবিকা চলে ৪ জনের সংসারের। চলে ছেলের পড়াশুনার খরচও। বড় মেয়েটির বিয়ে দিয়েছেন।
ছেলে প্রণয় বর্মণ এবারের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৪৩৬ নম্বরে স্থান পাওয়ায় স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এ যেন আঁধার চেরা আলোর ঝলক’এর মতো খবর।
শিক্ষার্থী প্রণয় বর্মণ জানালো, রাত ১০ টায় মাকে (মনি বর্মণকে) মেডিকেলে ভর্তির খবর জানালে বিছানা থেকে ওঠে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। অন্যান্য দিন রাত ১০ টায় শুয়ে পড়েন তার মা। কিন্তু রোববার রাত ১২ টা পর্যন্ত জেগেছিলেন। প্রতিবেশিদের বাড়ি বাড়ি নিয়ে গেছেন তাকে। ঘুম থেকে ডেকে ছেলের সাফল্যের কথা জানিয়েছেন।
প্রণয় জানালো, তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর বাবা-মা প্রতিবেশিদের কাছ থেকে ধার দেনা করে তাকে সিলেট সরকারি কলেজে ভর্তি করান। ওখানে পড়াশুনার সময় সে টিউশনি করতে চেয়েছে, কিন্তু তার বাবা-মা তাকে টিউশনি করতে দেন নি। অনেক পরিশ্রম করে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। খুবই কম খরচ করে সিলেট শহরের মেজরটিলার একটি ম্যাচে থেকেছে সে। নিজের অবস্থার কথা জানানোয়, প্রাইভেট পড়ার সময় কলেজের কোন শিক্ষকই তার কাছ থেকে কোন টাকা নেন নি।
এখন কীভাবে পড়াশুনার খরচ চালাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রণয় বললো, কোনভাবে ভর্তি হতে পারলে, টিউশনি করেই খরচ চালাবো আমি। আমি বাবা-মা’র স্বপ্নপূরণ করতে চাই।
সোমবার সন্ধ্যা ৭ টায় মনি বর্মণ এ প্রতিবেদককে বললেন, সেই ভোর বেলা ওঠে রান্না-বান্না করে পাথর টানার কাজে গিয়েছি। এখন বাড়ি ফিরেছি। চাল কিনে আনবো, এরপর দুই ছেলে ও তাদের বাবার জন্য রান্না-বান্না করবো।
এভাবে প্রতিদিনই সংগ্রাম করছেন জানিয়ে বললেন, ক্রাসার মেশিনে কাজ করার সময় একবার মাথায় একবার নাকে পাথরের আঘাত পেয়েছি। ক্রাসার মেশিনের মালিক এবং অন্যান্যরা ওষুধের টাকা দিয়েছেন। আমার ছেলেকে ডাক্তার দেখানোর জন্যই উপরওয়ালা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আমি কষ্ট সহ্য করবো তার সাফল্য দেখার জন্যই।

  • [১]