- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

স্বাগত বঙ্গাব্দ ১৪৩০

আজ শুরু হচ্ছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩০ সন। আদিতে বাংলা সন প্রবর্তনের পিছনে কর আদায়ের মতো একটি অর্থনৈতিক কর্মকা- যুক্ত এবং বর্তমানে হালখাতা নামে প্রায় অভিন্ন অর্থনৈতিক প্রপঞ্চ বজায় খাকলেও; ক্রমশ এই নববর্ষ নাগরিক বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয়ের উৎস হিসাবে জায়গা করে নিতে পেরেছে। নানা ধরনের উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে নববর্ষ বরণ করা বাঙালি নাগরিক সমাজের কাছে অবশ্য করণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরকেন্দ্রিক বৈশাখ উদযাপনের ব্যাপকতা বেড়ে গেছে সত্য কিন্তু হারিয়ে গেছে গ্রামীণ বৈশাখ বরণের লোকজ ধারাটি। এখন গ্রামাঞ্চলে নতুন বর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে লোকজ মেলার আয়োজন কমে গেছে। যেকোনো সমাজ-সংস্কৃতি গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়। বৈশাখের নাগরিক সংস্কৃতির বর্তমান স্বরূপটি আমাদের কৃষক, শ্রমিক তথা উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর জীবন-সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন ধারায় এগিয়েছে। অন্যদিকে এই উদযাপনের মধ্য দিয়ে অন্তত শহুরে সমাজে কিছুটা হলেও সর্বজনীন বাঙালি উৎসবের মেজাজ আনা সম্ভব হয়েছে, এও ইতিবাচক দিক বটে। জাতিসত্ত্বার ঐক্য দৃঢ়করণে এই উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম।
এবার পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা নিষিদ্ধকরণে জনৈক আইনজীবীর আইনি নোটিশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা লক্ষ্য করা যায়। যদিও আদতে এরকম নোটিশ বা আইন-আদালতের মাধ্যমে কোনো জাতির সংস্কৃতিই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবু উদ্বেগের বিষয় হলোÑ এ রকম পদক্ষেপের কারণে জাতিগত বিভাজনের বিপদ বাড়িয়ে তোলে। বলাবাহুল্য এই বিভেদ বাড়ানোর শক্তি এদেশে বেশ সক্রিয় ও উদ্দেশ্যপ্রবণ। এই শক্তিটি জাতিগত অভিন্ন অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতি প্রবল বিরোধ ভাবসম্পন্ন। এমন শক্তির সাথে লড়াই করে বাঙালি জাতির সুদৃঢ় ঐক্য স্থাপন করা এই সময়ের বড় কর্তব্য বটে। আশার বিষয় হলোÑ বিভিন্ন মহল থেকে এমন অশুভ তৎপরতার সক্রিয় বিরোধিতা জারি আছে এবং সর্বজনিন বৈশাখ পালন বোধ করি এবার বেশ বড় আকারেই আয়োজন হবে।
বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিত্ব সুদীর্ঘ সময়ের পথপরিক্রমায় গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। সম্প্রতি এই সংস্কৃতির আদি ও অকৃত্রিমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে নতুন আরেকটি গোষ্ঠী নানা রকম বিতর্ক সামনে আনছে। জটিল তত্ত্বের অবোধ্য কথামালার মাধ্যমে তাঁরা সম্মিলন, আত্মীকরণ, বিয়োজন ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে বিকশিত সংস্কৃতিকে বি-উপনিবেশিকরণের এক ধরনের কথা বলে মূলত বিকাশমান ধারাটিকেই থামিয়ে দিতে চায়। এরা কথা ও আচরণে প্রগতিশীলতার আভরণ গায়ে চাপালেও কার্যত মানুষের সহজাত অগ্রগতির বিষয়টিকে অস্বীকার করে। আজ থেকে হাজার বছর আগের সংস্কৃতি ও আজকের সংস্কৃতির মধ্যে ফারাক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যই এরকম। একে নিশ্চল ও আদিম মনে করার অর্থ হলো ভ্রান্তিবিশেষ। আমাদের এই ভ্রান্তিবিলাসের পথ থেকেও সরে আসতে হবে।
এ বছর আবহাওয়া বেশ ভালো মনে হচ্ছে। কৃষকদের মনে আনন্দভাব জাগিয়ে তুলেছে অনুকূল আবহাওয়া। আশা করা যায় বোরো ধানের মনকাড়া গন্ধে এবার কৃষকদের ঘর মোহিত হওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু উৎপাদক কৃষক সমাজ তাঁদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে বরাবরের মতো এবারও উদ্বিগ্ন। দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় উর্দ্ধগতি গ্রামবাসী এই কৃষকদের দৈনন্দিন জীবন যাপনকে অসহনীয় করে তুলেছে। কৃষকের মুখে স্বতস্ফূর্ত আনন্দ উদ্ভাস ব্যতীত নাগরিক বর্ষবরণের বিষয়টিও খ-িত ও অপূর্ণ। নতুন বছর মানে পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুন করে এগিয়ে যাওয়া। আমরা যদি শহর-গ্রামে সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সমতা ও সাম্যের একটি সমাজ গঠনের দিকে সামান্য হলেও এগিয়ে যেতে পারি তাহলেই বর্ষবরণ তার সার্থকতা খোঁজে পাবে। আনন্দ বা সুখ কৃত্রিমভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না। দরকার জীবন ও জীবীকার স্বস্তি, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা। ওই লক্ষ্যপানে দেশবাসী নতুন করে চিন্তা শুরু করবে এই প্রত্যাশায় সকলকে শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪৩০ বঙ্গাব্দ।

  • [১]