অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী (সঞ্জু)
অযোধ্যার রাজা দশরথ । তার তিন রানী ছিল যাদের মধ্যে মেজো রানী কৈকেয়ী একদিন দশরথের কাছে দুটি বর চেয়েছিলেন । বর দুটি ছিল, (১) তার ছেলে ভরত কে রাজা করতে হবে আর (২) বড় রানী কৌশল্যার ছেলে রাম কে ১৪ বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে । পিতার আদেশ মেনে রাম বনে গিয়েছিলেন সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সীতাদেবী আর ভাই লক্ষ্মণ । এদিকে ভরত রামের পাদুকা নিয়ে রাজ্য শাসন করছেন । একদিন সীতাদেবী এক মায়া হরিন কে দেখেন এবং তাঁর ইচ্ছে হয় হরিণটিকে কুটির এ এনে লালন পালন করার । এটি ছিল মূলত রাবনেরই চক্রান্ত । সীতা রামকে হরিণটি ধরে আনার জন্য অনুরোধ করেন । রাম সীতাকে লক্ষ্মণের কাছে রেখে হরিণটি ধরার জন্য যান । রাম যখন হরিণটিকে তিরে বিদ্ধ করেন তখন হরিণটি অকস্মাৎ সীতা সীতা বলে চিৎকার করতে শুরু করেন যা শুনে সীতার মনে হয় রাম কোনো বিপদে পরেছেন । সীতা তখন লক্ষন কে রামের সহযোগিতার জন্য যেতে বলেন । লক্ষ্মণ কুটিরের চারপাশে লক্ষ্মণ রেখা টেনে দেন এবং সীতাকে বার বার বলেছিলেন তিনি যেন এই সীমারেখা অতিক্রম না করেন কোনোভাবেই । এর পর লক্ষ্মণ রাম কে খুজতে চলে যান । যাইহোক সীতাদেবী বুঝে উঠতে পারেন নি এবং রাবনের ছলনায় পরে কুটির থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই রাবন সীতাকে অপহরন করেছিলেন । পরের ইতিহাস কি করুন টা সবারই জানা । বানর সেনার সহযোগিতায় এবং হনুমান ও লক্ষ্মণের মতো যোদ্ধা থাকায় সীতাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিলো । বিপত্তি কিছু কাটেনি তখনও । প্রজাগণের নানা কথার কারনে সীতাকে প্রথমে অগ্নিপরীক্ষা, বনবাস এবং পরে পাতালে প্রবেশ করতে হয়েছিলো । সবই কিন্তু সীতার কুটির থেকে বের হওয়ার কারনে হয়েছিলো।
২০২০ সালের শুরুতেই চীনের উহান প্রদেশে প্রথম করোনার উৎপত্তি ঘটে। প্রথমে সবার ধারনা ছিল হয়তো চিন দেশেই এটি সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু একে একে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এর বিস্তার ঘটে। বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে এ রোগের বিস্তার রোধে মার্চ মাসেই লকডাউন ঘোষণা করা হয়। প্রথমদিকে আশার সঞ্চার হয়েছিলো। কেননা পৃথিবীর যে দেশগুলো কার্যকরী লকডাউন দিতে পেরেছে, সেখানে তৃতীয় মাসের শুরুতেই ভাইরাসটির প্রকোপ কমতে শুরু করেছে। আমাদের দেশে প্রতিদিন এর বিস্তার হচ্ছে। এতে অনেকেরই মনে সংশয় দেখা দিয়েছে লকডাউন কতটা কার্যকরী হয়েছে। বাংলাদেশের করোনার ব্যাপারে লেখার পূর্বে আমি আভিবাদান জানাই ডাক্তার, সিভিল প্রশাসন, সাংবাদিক বন্ধুগণ, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, র্যাব এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ইউনিটকে। আমাদের ডাক্তারগণ এই অজানা ভয়ঙ্কর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সেবা দান করেছেন। যদিও প্রথমে তাদের নিজেদেরও সুরক্ষার অভাব ছিল। সাংবাদিকগণ নিজেদের সুরক্ষার কথা চিন্তা না করেই অনেক তথ্য পরিবেশন করেছেন। জেলা-উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তাগণ, সেনা, পুলিশ ও সব বাহিনীকে নিয়ে লকডাউন সহ সরকারি নির্দেশ মানার জন্য কাজ করেছেন ।
করোনা এমনই এক রোগ, নেই কোনো প্রতিষেধক, নেই কোনো ঔষধ। সতর্কতাই যেখানে একমাত্র ঔষধ। যাই হোক আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই কম। এরই মধ্যে দেশে অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন চলছে। সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আমদেরকে একসাথে লকডাউন এর কথা ভাবতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। পৃথিবীর অনেক দেশ অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন করেছে এবং এর কার্যকরী ফলও পেয়েছে। এরা এদের স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রমাণ দিয়েছে। আমাদেরকেও সারাদেশের লকডাউন এবং অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে একসাথে সারাদেশে কার্যকরী লকডাউন করতে হবে। আগামী ১ মাস অথবা ২৫ দিন লকডাউন এর মেয়াদ রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কে স্বাগত জানাই। না হলে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর একত্রে মিলিত হয়ে তাদের সর্বনাশ ডেকে আনবে। সরকারি বেসরকারি বেতন সহ নানাবিধ ফি এই দুর্যোগ মুহূর্তের জন্য নতুন করে নির্ধারন করতে হবে। এই লকডাউন শুরু করার পূর্বে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে। এই সময়টুকু যেন তারা পরিবার পরিজন নিয়ে দুবেলা খেতে পারে। কৃষিঋণ এবং ভুমি উন্নয়ন কর আদায় বন্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে এই এক বছরের সুদ মওকুফ ঘোষণা করতে হবে। গত ২৬-০৬-২০২০ এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে দেখা যায় যেসব দেশে কার্যকরী লকডাউন দেওয়া হয় নি সেসব দেশে পুনরায় করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। তাই লকডাউন এর কোনো বিকল্প কিছু নেই। পৃথিবীতে বিগত ৪০০ বছরে (১০০ বছর অন্তর অন্তর) ৪ টি ভয়ংকর মহামারি হওয়ার রেকর্ড রয়েছে । যেগুলো হচ্ছে,
১৭২০ সালে প্লেগ
১৮২০ সালে কলেরা আউট ব্রেক
১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু
২০২০ সালে করোনা ভাইরাস
করোনা এমনই একটা রোগ, আক্রান্ত রোগীকে দেখতে যাওয়া যায় না। রোগীকে ঘরে রেখে পরিচর্যা করা যায় না। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়, শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও যাওয়া যায় না। তাই আসুন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। ঘরে থাকি, সুস্থ থাকি, সুরক্ষিত থাকি। করোনাকে দূরে রাখি।