- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ যখন হাসির খোরাক….

বিশেষ প্রতিনিধি
১৭ বছর ধরেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ দেখছেন এলাকাবাসী। কাজ বন্ধ ও চালু হয়েছে কমপক্ষে ৩০ বার। প্রায় দেড়যুগ পর ভবনটির অবয়ব তৈরি হলেও এখনো পানির ব্যবস্থা হয় নি। জরুরি অনেক কাজও এখনো বাকী রয়েছে। কাজ বাকী থাকায় জেলা পরিবার কল্যাণ বিভাগ ভবনটি গ্রহণ করছে না। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ শেষ করে দেবে আশ^াস দিলেও এলাকাবাসী বিশ^াস করছে না তাদের। সুনামগঞ্জ শহরতলির কোরবাননগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থা এরকম। ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামে ১৭ বছর ধরেই হচ্ছে এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজ। ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের হামিদা বেগম বললেন,‘আমি বউ হইয়া আইয়া (এসে) দেখছিলাম হাসপাতালের কাম (কাজ) অর, অখন (এখন) আমরার পুরিন (মেয়েরা) বউ অইযার, পুয়াইনতে (ছেলেরা) বিয়া করিলার, অখনো ইটার কাম চলের, ইটা হাসির খোরাক অইগেছে।’
কোরবাননগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কাজ কবে শুরু হয়েছিল, এর সঠিক তথ্য স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে নেই। এই প্রকল্পের কোন ফাইলও নেই এই অফিসে। কাজ শুরুর সময় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোন অফিস সুনামগঞ্জে ছিল না। বিভাগীয় অফিস সিলেট থেকে এটি দেখভাল হত।
কোরবাননগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল মান্নœান বললেন, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়। কয়েকবার কাজ চালু ও বন্ধ হতে হতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চলে। এরপর আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালে আবার কাজ শুরু হলেও কয়েকদিন কাজ হবার পর আবার বন্ধ হয়। এভাবে কমপক্ষে ৩০ বার কাজ চালু ও বন্ধ হয়েছে।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ নারী আখলিমা বেগম বললেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এর দরজা জানালার গ্লাস ভেঙেছে। অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি চালু হবার আগে আরেকবার সংস্কার করতে হবে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল বরকত জানালেন, তিনি প্রায় ১১ বছর ধরে এই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কাজ, তাঁর প্রথম মেয়াদেরও আগে শুরু হয়েছে। তিনি বললেন, ইউনিয়নের উত্তর-দক্ষিণ ব্রাহ্মণগাঁও, মনোহরপুর, আসপিয়ানগরসহ ২০-২৫ টি গ্রামের মাঝখানের এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র হাজার হাজার মানুষের উপকারে আসবে। কিন্তু এটি নির্মাণ শেষ হয়ে কাজ শুরু হবে, এটি বিশ^াস করতে পারছেন না এলাকাবাসী।
এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ কাজ দেখভালকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল মিয়া বললেন, আমি সুনামগঞ্জে এসেছি তিন বছর আগে। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী তখন। আমি এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নির্মাণ প্রকল্পের কোন ফাইলপত্র পাই নি তবুও অনেক কাজ শেষ করেছি। এই প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যও তাঁর কাছে নেই জানিয়ে তিনি বললেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির প্রকল্প ব্যয় তখনকার সময়ে ৮০ লাখ টাকা ছিল। এখন এটি করতে তিন কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে। তিনি জানালেন, দুই বছরের মধ্যে এই প্রকল্পটি শেষ হবার কথা ছিল, কেন হলো না, এর জবাব তাঁর কাছে নেই বলেও মন্তব্য করলেন এই প্রকৌশলী।
সুনামগঞ্জের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের একজন বিভাগীয় প্রকৌশলী বললেন, এই ভবনটি হস্তান্তর হতে না হতেই আরেকবার এর সংস্কার কাজের দরপত্র আহ্বান করতে হবে। সরকারী অর্থের অপচয় এবং দায়িত্বহীনতার উদাহরণ এটি। দুই বছরের কাজ ১৭ বছরেও শেষ হয় নি। এরসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কী না, সেটিও খুঁজে দেখার বিষয়।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার শীল বললেন, এই প্রকল্পটির কাজ শুরু হবার সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা এখন হয় চাকুরিতে নেই, না হয় পদন্নোতি পেয়ে অনেক উপরে চলে গেছেন। আমিও নতুন এসেছি, এখনকার বিষয় ছাড়া আগের কিছুই বলতে পারবো না। এই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবনের নীচতলায় পাঁচ কক্ষ এবং উপরতলায় দুটি কোয়ার্টার আছে। এই ভবনের কাজ প্রায় শেষ। গেল বন্যায় দরজা-জানালা নষ্ট হয়েছে। পানির জন্য সাবমার্জিবল টিউবওয়েল বসিয়ে এবং দরজা জানালার কাজ করে আগামী মাসের মধ্যে এটি হস্তান্তর করার চেষ্টা করবো আমরা।
সুনামগঞ্জ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. ননী ভূষণ তালুকদার বললেন, সেবা কেন্দ্রটির ভবনের কাজ দীর্ঘদিন আগে শুরু হয়েছিল। বহুবার কাজ শুরু হয়ে আবার বন্ধ হয়েছে। পানি সরবরাহসহ কিছু ছোটখাটো কাজ এখনো এই কেন্দ্রের বাকী। কেন্দ্রের লোকবল প্রস্তুত রয়েছে। এগুলো করে দিলেই ওখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব।

  • [১]