মো. তৈয়ব আল আজাদ
পৃথিবীতে এমন অনেক হৃদয়বান মানুষ জন্ম নেন যাদের কথা বারবার স্মরণ করতে হয়। ছোট-বড় ধনী-গরীব সবার কাছে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকেন তাঁরা। সকল ধর্মের মানুষ পায় তাঁদের কাছে সমান সমাদর। প্রচুর ধন সম্পদের অধিকারী হয়ে সুউচ্চ বংশের ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা কাউকে তুচ্ছ ভাবেননি বা ঘৃণা করেননি। ধনী-দরিদ্র সবাইকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসেন। হৃদয় দিয়ে সমাজের লোকের মঙ্গল কামনা করেন। তাদের মধ্যে এমন একজন হৃদয়বান ব্যক্তি হচ্ছেন মরহুম দেওয়ান মোশাররফ হাসান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী। সবার কাছে তিনি ছিলেন ‘দেওয়ান সাহেব’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত।
বংশ পরিচয়: ১৯২১ সনের ২৬শে ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শহরের লক্ষণশ্রী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নাম মরহুম দেওয়ান হাসিনুর রাজা চৌধুরী। তার মাতার নাম ইমদাদুননেছা। মরমি কবি জমিদার হাছন রাজা ছিলেন তাঁর পিতামহ।
শিক্ষা জীবন: মরহুম দেওয়ান মোশাররফ হাসান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী ছিলেন
সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি ১৯৪১ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উর্ত্তীণ হন। তারপর সিলং সেন্ট্রাল এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সনে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজনৈতিক জীবন: ছাত্র জীবন থেকে তিনি রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি সিলেটে গণভোট আন্দোলনে ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেন। ১৯৪৬ সনে তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাছাড়া সুনামগঞ্জ শাখার যুবলীগ ও গণতন্ত্রী দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে তিনি ন্যাশন্যাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এন ডি এফ) সম্মিলিত বিরোধীদল (কপ) ও ডাক (ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি)-এর সুনামগঞ্জ শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সনের গণঅভ্যুত্থানের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কারা মুক্তির পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং আওয়ামী লীগের সুনামগঞ্জ শাখার সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭০ সনে সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সনে তিনি গণপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা আন্দোলন: মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সুনামগঞ্জ মহকুমার সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সনের এপ্রিল মাসের মধ্যভাগে তিনি পরিবার পরিজনসহ ভারতের বালাটে অবস্থান নেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বালাট সাব সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবন: তিনি লক্ষণশ্রী কোর্ট অব ওয়ার্ড সেক্টের ম্যানেজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি অবৈতনিক ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ মিউনিসিপালটি বোর্ডের সদস্য। তিনি ১৯৬৫ সন থেকে ১৯৭৭ সন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি সুনামগঞ্জ কো-অপারেটিভ ইলেকট্রিক সাপ্লাই সোসাইটির অবৈতনিক সম্পাদক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়। তিনি সুনামগঞ্জ আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন ও সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একজন সক্রিয় উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টার মুক্তিযোদ্ধা ও স্মৃতি কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি কল্যাণ ট্রাস্টের সেক্রেটারি হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির সুনামগঞ্জ শাখার সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
কাছ থেকে যেমন দেখেছি: প্রতিদিন প্রত্যুষে উঠে তিনি ফজরের নামাজ পড়তেন। সবাইকে নামাজ পড়ার জন্য তাগিদ দিতেন। নামাজ পড়ে তাঁকে পায়চারী করতে দেখতাম। বাসার কাজের লোক থেকে আরম্ভ করে সবার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল। এমনকি বাসার কাজের লোক অসুস্থ হলে সংগে সংগে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করতেন। বাসায় অতিথি আসলে খুব খুশী হতেন। তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসার দরুন অনেক দরিদ্র ছেলে-মেয়েরা তাঁর বাসার থেকে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়েছেন। তিনি সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে মাসিক সম্মানী ভাতা গরীব কর্মচারীদের এক একজনকে প্রতিমাসে সম্পূর্ণ ভাতার টাকা দিয়ে দিতেন। গরীব লোকেরা সাহায্যের জন্য আসলে খালি হাতে ফেরত যায়নি। তিনি কোন দিনই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। কাউকে কোনদিন তোষামোদ করতে দেখিনি। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, রাশভারী লোক ছিলেন বিধায় অনেকেই ভয় পেত তেমনি ভুল বুঝত। তিনি অত্যন্ত উদার, সৎ, অতিথিপরায়ণ, ন্যায়পরায়ণ, বিচক্ষণ ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন লোক ছিলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। লেখাপড়া করার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছেন। তারই অনুপ্রেরণায় ও সাহায্য সহযোগিতায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। আমি তাঁর কাছে চিরঋণী।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী সুনামগঞ্জবাসীর জন্য একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ ত্যাগ করবেন না বলে পূর্ব জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সুনামগঞ্জবাসীর পরম শ্রদ্ধার এই মানুষটি ১৯৮২ সনের ৩ ডিসেম্বর সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। আজ দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরীর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।