আবিদ খান হৃদয়
প্রথমেই শুরু করছি সুনামগঞ্জ শহরের আরেক জন শক্তিমান অভিনেতা শাহ আবুতাহের এবং সত্যরঞ্জন তালুকদার এর শেষ বিদায়ের মিল দিয়ে। গত বছরের এই ১১ মে তেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান শাহ আবু তাহের। আর এই একই ১১ মে তে এই বছর আমরা হারালাম আমাদের সুনামঞ্জ শহরের শক্তিমান অভিনেতা সত্য রঞ্জন তালুকদারকে। একই সাথে কাজ করতেন দুজন। অভিনতা সত্যরঞ্জন তালুকদার সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের সাবেক দলনেতা এবং বর্তমান সদস্য দেবাশীষ তালুকদার শুভ্রদার বাবা । সত্য রঞ্জন তালুকদারকে সেই সুবাদে আমরা কাক্কু বলে সম্বোধন করতাম। কাক্কু ১৯৫২ সনে জামালগঞ্জ এর ফেনারবাঁক ইউনিয়নের মাতারগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই ফেনারবাঁক থেকে উনার নাটক আর অভিনয়ের হাতেখড়ি হয়। জামালগঞ্জে জনতার আদালত, নিহত গোলাপ, শাহজাহান, জীবন নদীর তীরে এই সব নাটকে অভিনয়ে করার মাধ্যমে সবার কাছে নিজেকে এক অন্য পরিচয়ে দাঁড় করতে পেরেছিলেন কাক্কু। চাকরীর সুবাদে যখন সুনামগঞ্জ আসলেন তখন নাটক আর অভিনয়ের দিকে আরো সক্রিয় হলেন তিনি। সুনামগঞ্জের স্বনামধন্য নাট্যদল সৌখিন নাট্য দলে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। ওরা কদম আলী, মেরাজ ফকিরের মা, ময়নাচর সহ নানা নাটকে অভিনয় করেন। ধর্মীয় নাটকেও ছিল কাক্কুর স্বক্রিয় পদচারণা। রামপ্রসাদ, রামকৃষ্ণ, রাজা হরিশ চন্দ্র এই সব নাটকে কাক্কু কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অভিনয় করেন। এবং সকলের কাছে প্রসংশিত হন। ২০০০ সালে রামকৃষ্ণ মিশনে কাক্কুর জীবনে অন্যতম একটি ঘটনা ঘটে। সেবছর কাক্কু রামকৃষ্ণ মন্দিরে একটি নাটকে অভিনয় চলাকালীন সময়ে মঞ্চের উপরে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ওই যে তিনি অসুস্থ হলেন এরপর থেকে কাক্কুর মন ভেঙে যায়। আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন।
আমাদের সুনামগঞ্জ শহরের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা ডা. তরুণী কান্তের অত্যন্ত স্নেহভাজন এবং প্রিয় মানুষ ছিলেন কাক্কু। দেবাশীষ তারলুকদার শুভ্রদার সুবাদেই কাক্কুর সাথে আমার এবং আমাদের সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের এতটা সুসর্ম্পক ছিল। আমাদের যাতায়াত আর আড্ডার অন্যতম জায়গা ছিল শুভ্রদার নতুন পাড়ার সেই বাসাটি। আমাদের সকল কাজেই কাক্কু আমাদের নানা ভাবে অনুপ্রেরণা দিতেন। এবং আমাদের কে সক্রিয় ভাবে কাজে সহযোগিতা করতেন। ২০১২ সালে যখন শুভ্র দা ঢাকা চলে গিয়েছিলেন তখন সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের দলনেতার দায়িত্ব আমার উপর আরোপ হওয়ায় কাক্কু খুব খুশি হয়েছিলেন।
একবার আমরা হিমু দিবস পালন করলাম। কাক্কুও ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। যখন আমি উপস্থাপনা করেছিলাম কাক্কু আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন যেন কাক্কু আমার মধ্যেই হিমুকে না নিজের ছেলে শুভ্রকে খুঁজছিলেন (শুভ্রও হুমায়ূন আমাদের একটি চরিত্র) । আমাদের সাথে হয়তো কাক্কুর বয়সের মিল ছিল না। ছিল মনের মিল। কাক্কু সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের উপদেষ্টাও ছিলেন । নানাভাবে নানা সময় আমাদের সহযোগিতা এবং উপদেশ প্রদান করতেন । আমাদের নাট্য উৎসবগুলোতে কাক্কু তিন দিনই উপস্থিত থাকতেন।
কাক্কু যখন শেষবারের মতো সিলেটে আমি দেখতে গিয়েছিলাম তাঁকে। তখন কাক্কু অনেকটাই স্মৃতিশক্তি লুপ্ত অবস্থায়। অনেককেই চিনতেন না কিন্তু শুভ্রদা যখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, বাবা হৃদয় এসেছে তোমাকে দেখতে, কাক্কু সাথে সাথেই আমাকে বললেনÑ হৃদয় তুমি ভাল আছো? প্রসেনিয়ামের কি খবর?সেটিও জানতে চাইলেন। নিজের চরম অসুস্থতার মাঝেও কাক্কু আমাদের প্রসেনিয়ামের কথা মনে রেখেছেন, এটি ভাবতেই ভাল রেগেছিল ওই দিন। আসলে ভালবাসার মানুষগুলো এমনই হন।
কাক্কু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। শুভ্রদা হারিয়েছে তার বাবাকে। আমরা হারিয়েছি আমাদের পরম একজন অভিভাবককে। কাক্কুর ভালবাসা আমাদের কাজকে আরো শানিত করেছে সবসময়। কাক্কু সব সময় বলতেন, আমার শুভ্র এই দলে কাজ না করলেও আমি এই কথাই বলতাম যে, সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়াম একদিন বড় থিয়েটার হবে, যার সুনাম ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশে। কাক্কুর সান্নিধ্য আমাদেরকে আরো পবিত্র করেছে, করেছে নিষ্ঠাবান। উনার স্বপ্নগুলো আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। কাক্কুর স্বপ্নগুলো বাস্তবের সিঁড়ি বেয়ে উঠবে আমাদের কাজ দিয়ে। শুধু ভালবাসার কলমে বলতে চাই, ভালো থাকবেন কাক্কু।
লেখক: দলনেতা, সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়াম