গতকাল দেশব্যাপী সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বই উৎসব। এবার সময়মতো পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিলো। কাগজের সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ছাপাখানাগুলো সময়মতো কাজ শেষ করতে পারবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। এরকম সংকটময় অবস্থায়ও ১ জানুয়ারি বই উৎসব করতে পারাটা সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ কৃতিত্ব বটে। ১ জানুয়ারিতে সকল শিক্ষার্থীর হাতে সবগুলো বই তোলে দেয়া সম্ভব হয়নি। আপোস করা হয়েছে কাগজের মান নিয়ে। তবু তো দেয়া গেছে কিছু। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খুব তাড়াতাড়িই সকল শিক্ষার্থী বই পেয়ে যাবে। বর্তমান সরকার যে কয়টি জায়গায় মৌলিক উন্নয়নের সূচনা ঘটিয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ কর্মসূচিটি ছিলো তার অন্যতম। পৃথিবীর বহু দেশে এরকম শিক্ষা সহায়তার দেখা মিলে না। ৩১ ডিসেম্বর বই উৎসবের উদ্বোধন করতে যেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেনÑ ২০৪১ সনে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে যে স্মার্ট নাগরিক প্রয়োজন হবে তারাই হলো এই সময়ের শিক্ষার্থীরা। তাই তাদের স্মার্ট নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে। একসময় ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটি ছিলো আমাদের অজানা, আজ তা বাস্তব সত্য। আমরা প্রাত্যহিক জীবনের সর্বত্রই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা ভোগ করছি। এই জায়গায় আরও বহুমুখী উন্নয়নের দরকার আছে। সেই উন্নয়নও চলমান। এর পরের ধাপ হলো স্মার্ট বাংলাদেশ। সমকালীন পৃথিবীর যোগ্য নাগরিক ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ গঠন কল্পনা বিলাসের নামান্তর। কিন্তু জাতীয়ভাবে আমরা যে কল্পনা বিলাসিতার পরিবর্তে দূর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগিয়ে চলেছি প্রধানমন্ত্রীর কথা তার প্রমাণ। এই শিক্ষার্থীরাই যখন শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকবে তখন তাদের একেক জন হয়ে উঠবে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। আমরা সেই ভবিষ্যতের স্মার্ট নাগরিকদের স্বাগত জানাই।
শিক্ষার বিনিয়োগ বহু গুণ বর্ধিত হয়ে জাতীয় অগ্রগতিতে ফিরে আসে। এই সত্য যে জাতি অনুধাবন করতে পেরেছে তারাই উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছাতে পেরেছে। আমরাও একই পদ্ধতিতে এগোতে চাই। এজন্য শিক্ষার আধুনিকায়ন এখন যুগের দাবি। আমাদের দেশে যে রকম বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে তা বজায় রেখে ওই লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে কিনা সে প্রশ্ন খুবই সংগত। একটি দেশে শিক্ষা গ্রহণের এত এত পথ ও পদ্ধতি মূলত এক ধরনের জগাখিচুরি বাস্তবতার চিত্র সামনে নিয়ে আসে। তাই সরকার ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। দেশের সকল শিশুর একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠতে হবে। তবেই চিন্তায় ও চেতনায়, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় সকলের মান হবে সমপর্যায়ের। এই জায়গায় এক এক জন এক এক ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করলে শেষ পর্যন্ত পারষ্পরিক বিরোধের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠে। আমরা কেন নিজেদের শিশুদের শুরু থেকেই এই ধরনের বিরোধের দিকে ঠেলে দিব? একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন ঘটানো ২০৪১ সনের স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের প্রশ্নে একেবারেই অপরিহার্য একটি বিষয়।
শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য যুক্তি ও বিজ্ঞান চর্চার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্য গুটিকয়েক বড় শহর বাদে সারা দেশে এখন বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা খুব খারাপ। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি বছরের একদিনও খোলা হয় না। বহু টাকা দিয়ে প্রদত্ত কম্পিউটার ল্যাবগুলো অব্যবহৃত থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা দানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবও প্রকট। যেভাবে বছরের প্রথম দিনেই বই উৎসব করার মধ্য দিযে আমরা শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের জাগরণ তৈরি করতে পেরেছি তেমনি স্মার্ট নাগরিক গড়ার অন্যান্য শিক্ষা-উদ্যোগগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।