স্বপন কুমার দেব
১৯৭১ ইং সনের মার্চ মাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একই সঙ্গে আইন বিভাগ ও সাইকোলজি বিভাগে ভর্তি হয়েছি। তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে অনার্স কোর্স চালু হয়নি। দিনের বেলায় কলা ভবনে সাইকোলজির ক্লাস, আর সন্ধ্যায় সায়েন্স এনেক্স বিল্ডিং-এ আইনের ক্লাস। আমি থাকি তৎকালীন ইকবাল ( বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হলের ২য় তলায় ২৭২নং রুমে। রুমটির একটি সিট্ বরাদ্দ করা বড় ভাই বন্ধু মসই ভাইয়ের (চৌধুরী মনজুর আহমদ, কালী বাড়ী রোড সুনামগঞ্জ) নামে। মসই ভাই থাকতেন গেন্ডারিয়ায়। আমি উনার সিটে। সারা দেশের রাজনৈতিক অবস্থা তখন উত্তপ্ত। ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আদৌ বসবে কিনা এ নিয়ে মানুষের মাঝে চরম সংশয়। যতদূর মনে পড়ে এক দিন কি দু’দিন আগে ঢাকা স্টেডিয়ামে টেস্ট ক্রিকেট খেলা দেখে এসেছি। পাকিস্তান টিম্ বনাম কমনওয়েলথ টিম্। বাঙালি খেলোয়াড় রকিবুল চান্স পেয়েছিলেন পাকিস্তান টিমে। তিনি যখন ব্যাট করতে নামলেন তখন দেখা গেল তাকে নিয়ে দর্শকদের মধ্যে বিরাট উন্মাদনা। পয়লা মার্চ ১৯৭১ তারিখেও খেলা চলছিল। আমি আর দেখতে যাইনি। দুপুরের দিকে হলেই আছি। রুমের সামনে বারান্দায় চেয়ার টেনে বসেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম দূরন্ত বেগে ছাত্রদের এক প্রতিবাদ মিছিল ২য় তলার বারান্দায় উঠে এলো। কি ব্যাপার ? ইয়াহিয়া খাঁন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। ঢাকায় অধিবেশন বসবে না। মুহূর্তে পাল্টে গেল ঢাকা শহরের চিত্র। প্রতিবাদে ফেটে পড়ল ঢাকা নগরী। খবর আসলো স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা তছনছ করে দিয়ে দর্শকরা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন। কি হবে না হবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বিকালের দিকে মসই ভাই এলেন গেন্ডারিয়া থেকে। আমরা আশেপাশের এলাকা সহ বেশ কিছু এলাকা পায়ে হেঁটে ঘুরে এলাম। রাস্তায় শুধু মিছিল আর মিছিল। আলাদা ভাবে লোক চলাচল নেই। সবাই মিছিলের অংশ। থেমে থেমে স্লোগান উঠছে ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, স্বাধীন হলো’। ‘জিন্নাহ মিয়ার পাকিস্তান আজিমপুরের গোরস্থান’। পয়লা মার্চ ১৯৭১ তারিখেই এদেশ থেকে পাকিস্তানের নাম মুছে যায়। তখনকার যে অনুভূতি তা সামনে না থাকলে কোন ভাবেই বোঝা সম্ভব নয়। মার্চের তারিখগুলো এক দুই করে গড়িয়ে যেতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের ছাদে উড়লো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। রাস্তাঘাটে, বিশ্ববিদ্যালয় হলে চরম উত্তেজনা আর উৎকন্ঠা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাঙালি জনতার জটলা। ছাত্রনেতাদের অতি কর্মব্যস্ত চলাচল। ইকবাল হলের গেটের সামনে সব সময় ভিড় লেগে আছে। ছাত্রদের জমায়েত চলছে সারাক্ষণ। ‘ইকবাল হল’ লেখা ফলক আমার সামনেই ভেঙ্গে দিলেন ছাত্ররা। নাম লিখে দিলেন ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’। দেখলাম এই হলকে ঘিরে যেন একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সেদিন ৩ মার্চ। হল গেটের সামনে একই অবস্থা। ছাত্র ও মানুষের ভিড়। প্রতিবাদি মিছিলের উপর পাকিস্তানী মিলিটারীদের গুলি বর্ষণে নিহতদের তিন/চারটি লাশ নিয়ে এসেছেন লোকজন পুরান ঢাকা এলাকা থেকে। লাশগুলি দেখলাম। লাশের গায়ে গুলির আঘাতের গর্ত। জানা গেল, একটি এলাকার শ্রমিক ছিলেন তাঁরা। কি অবস্থা যে তখন। এরই মাঝে সন্ধ্যা নামল। চাপা উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। চারিদিক থেকে আসছে নানা খবর। হলের সামনে দেখা হয় রেজা ভাইয়ের সঙ্গে। তৎকালীন ছাত্রলীগের বিশিষ্ট নেতা (পুরো নাম সৈয়দ রেজাউর রহমান, বাড়ি কুমিল্লা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ত্রিপুরায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বর্তমানে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর। একাধিকবার বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।) উনিও কি যে হবে সঠিক কিছু বলতে পারলেন না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউমার্কেট/আজিমপুর এলাকা থেকে ভেসে আসছে জনতার মূর্হুমূর্হু জয়বাংলা স্লোগান। থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে মিলিটারীদের গুলি বর্ষণের আওয়াজ। মনে হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশ ফায়ার (ব্রাশ ফায়ার বা এই জাতীয় শব্দের সঙ্গে আমরা পরে পরিচিত হই মুক্তিয্দ্ধু চলাকালীন সময়ে)। বেশ কয়েকজন ছাত্রকে আহত অবস্থায় হলে আনা হয়। প্রায় সারা রাত ধরে শুনলাম জনতার আওয়াজ আর থেমে থেমে গুলির আওয়াজ। সেদিন সম্ভবত মার্চের ৪ তারিখ। আমি আর মসই ভাই হাঁটতে হাঁটতে রওয়ানা দিলাম গুলিস্তানের দিকে। জি.পি.ও’র সামনে গেলে একজন বললেন, সেখানে চিঠিপত্র Window Delivery দেয়া হচ্ছে। গেলাম ভিতরে। কর্মকর্তা কর্মচারী কেউ নেই। বিশাল মেঝেতে চিঠিপত্রের পাহাড়। বেশ কিছু লোকজন নিজেদের চিঠি খুঁজছেন। কেউ কেউ খোলা চিঠি পড়ছেন। আমরা বেশ কিছু চিঠিপত্র ঘাটাঘাটি করলাম। নানাজনের নানা বিষয়ে প্রিয়জনের কাছে লেখা চিঠি। আলাদা একটা অনুভূতি। চিঠিগুলো হয়তো আর কোনদিনও প্রেরকের হাতে পৌঁছাবে না। আবার হাঁটতে হাঁটতে এসএম হলের সামনে এসে গেলাম। রাস্তা সংলগ্ন হলের সামনে যে দেয়াল, তার নিচের অংশ পাকা আর উপরের অংশে লোহার লম্বা লম্বা রড। বর্শার মতো দেখতে। অনেকটা আমাদের পুরাতন এসডিও কোর্ট বা বর্তমান ঐতিহ্য জাদুঘরের সামনের দেয়ালের মতো। প্রায় হাজারখানেক লোক একসঙ্গে এসএম হলের সেই দেয়ালে ইট শাবল ইত্যাদি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত হানছেন। সামান্য সময়ের মধ্যেই বর্শার মতো দেখতে লোহার রডগুলো আলগা হয়ে জনতার হাতে হাতে চলে এলো। বর্শা হাতে শুরু হলো জনতার জঙ্গি মিছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামো যেন এভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মানুষ শুধু বলাবলি করছেন, বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসছে না কেন? পরদিন ৫ই মার্চ। চারিদিকে নানা গুঞ্জন। সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে রাত্রিবেলা মিলিটারী হামলা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ছাত্র দেখলাম হল ছেড়ে চলে গেছেন। নিকটবর্তী জগন্নাথ হলে চলে যাওয়া নিরাপদ মনে করে সেখানে পরিচিত এক ছাত্রের রুমে চলে যাব বলে মনস্থ করি। দুপুরের দিকে হাতে একটা স্যুটকেস নিয়ে জহুরুল হক হলের পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে এসএম হলে পেছন দিকের সরু পথ দিয়ে (একপাশে ব্রিটিশ কাউন্সিল ভবন) উঠে এলাম ফুলার রোডে। সেটা পার হয়ে ঢুকব জগন্নাথ হলের পেছনের দিকে। বাঁ দিক থেকে আসা প্রায় শতাধিক তরুণের এক জঙ্গি মিছিলের সামনে পড়লাম। টগবগে স্বাস্থ্যবান সব ছেলেরা। তাঁদের মুখে স্লোগান উঠছে ‘হাতের বোমা তৈরী কর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। আমাকে দেখে একটি ছেলে বলে উঠলো ‘বাঙালি ! বাড়ি যাচ্ছ?’। সে হয়তো আমাকে এইভাবে স্যুটকেস হাতে দেখে ভেবেছে আমি পালিয়ে যাচ্ছি। নিজের কাছেই কেমন যেন লজ্জা পেলাম। তাগিদ অনুভব করলাম নিজ শহরে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক হবার। রাতে জগন্নাথ হলের সাউথ্ হাউসের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। এখানেও ছাত্রদের মধ্যে চরম উত্তেজনা। রাতে আকাশবাণী কলকাতা ও বিবিসি বাংলা বিভাগ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন অবস্থা ও বঙ্গবন্ধুু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিবাদের কথা প্রচারিত হলো। উত্তেজনা ক্রমশ: বাড়ছে। রাত ১২টার দিকে জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে একটি মিলিটারী ট্রাক তীব্র গতিতে চলে যায়। ট্রাক থেকে ভেসে এলো এক মেয়েলী গলার আর্ত চিৎকার। পরিস্থিতি দ্রুত বদল হচ্ছে। এরপর এলো ইতিহাস সৃষ্টি করা ৭ই মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে আমি আগেও একটি জনসভায় উপস্থিত ছিলাম। ১৯৭১ এর জানুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই জনসভা। আওয়ামীলীগ দলীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল সেই সভায়। তখন সেখানে ছিল বিশাল নৌকা আকৃতির মঞ্চ। মঞ্চে বসা ছিলেন জনপ্রতিনিধিরা। সেই জনসভা এতো বিশাল ছিল যে, সবাই বলাবলি করছিলেন এতো বড় জনসভা ঢাকায় আর হয়নি। পরদিন পত্রিকায় দেখেছিলাম প্রায় ১০ লক্ষ লোকের সমাগম হয়েছিল সেই সভায়। কিন্তু সেই জনসভায় ছিল উৎসবের ভাব। আর ৭ই মার্চের জনসভার চেহারাই যেন আলাদা। ময়দান জুড়ে ঝড়ের হাওয়া আর টানটান উত্তেজনা। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা। কি হবে? স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে কি। বেলা ২টার দিকে আমরা চলে আসি রেসকোর্স ময়দানে। মিছিলের পর মিছিল আসছে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ময়দান। শিল্প এলাকা থেকে জঙ্গি মিছিল আসতে থাকলো একের পর এক। শ্রমিকদের মাথায় লাল কাপড়ের পট্টি বাঁধা। হাতে লোহার ডান্ডা। জনসভায় এলো নতুন উত্তেজনা। মঞ্চের সামনের দিকে মহিলা ও দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের বসার জায়গা। প্রচুর মহিলা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত আছেন। থেমে থেমে ম্লোগান উঠছে। আমরা সুবিধা মতো একটি জায়গায় বসে পড়লাম। জানুয়ারীর সভার মতো বড় মঞ্চ নয়। অনেক ছোট। মঞ্চের নেতারা বেশীরভাগই ছাত্র নেতা। ওরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন সবকিছু (ছাত্রদের উপর মানুষের কি অগাধ আস্থা ও প্রচ- বিশ্বাস ছিল সেটা ১৯৬৯ এর ছাত্র গণআন্দোলনে ও ঐ সময়কালীন ও পরবর্তী অবস্থায় দেখেছিলাম। এখন আর সেটা নেই।) ময়দানে ছয় দফা চিহ্নের টুপি পড়া আওয়ামী লীগের অসংখ্য ভলান্টিয়ার মানুষের মধ্যে শৃংখলা আনায় রত। কিন্তু যার জন্য অপেক্ষা তিনি আসছেন না। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু তখনও আসেননি। মাইকে বারবার ঘোষণা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু এখনই আসবেন। নানা কথা ছড়িয়ে পড়ছে ময়দানে। শোনা যাচ্ছে ৩২ নাম্বার রোডে উনার বাড়িতে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মিটিং হচ্ছে, জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা হবে কি হবে না তাই নিয়ে। রেসকোর্স ময়দানে জনতার মধ্যে ঝড়ের বেগ ক্রমশ: বাড়ছে। জানা গেল ঢাকা রেডিও স্টেশনের লোকজন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচার করবেন। এরই মাঝে আকাশে উড়ে আসলো একটি সামরিক হেলিকপ্টার। ধীরে ধীরে চক্কর দিতে থাকলো মাথার উপরে। রব উঠলো হেলিকপ্টার থেকে জনতার উপর গুলি বর্ষণ শুরু হবে। কিন্তু ময়দানের জনতা অবিচল। লাঠি আর ডান্ডা সহ মানুষের হাত গগন বিদারী চিৎকারে আকাশের দিকে উঠে গেল। আরও রব উঠলো জেনারেল টিক্কা খাঁ সেদিনই পাকিস্তান থেকে এসে হেলিকপ্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। মানুষের রুদ্র রূপ দেখে হেলিকপ্টারটি আর চক্কর না দিয়ে ফিরে চলে যায়। এমন সময় মঞ্চের খানিকটা দূরে জনতার বিশাল ঢেউ উঠতে দেখলাম। বঙ্গবন্ধু এসে গেছেন। নির্ধারিত সময়ের আনুমানিক প্রায় এক ঘন্টা পরে বঙ্গবন্ধু সভায় এসে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মতো দৃপ্ত পদক্ষেপে সরাসরি মঞ্চে উঠে গেলেন। পাজামা-্পাঞ্জাবী আর মুজিব কোট পরিহিত বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যেন মধ্য গগনের সূর্যের মতো উজ্জ্বল আর হিমালয়ের মতো শান্ত অবিচল দেখাচ্ছিল। এরপরই শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ। ৭ই মার্চের ভাষণ। ভায়েরা আমার…। সৃষ্টি হচ্ছে ইতিহাস। ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। উনার মুখ থেকে একের পর এক আসছে দিকনির্দেশনা আর কর্মসূচি। আসছে সময়পোযোগি ব্যাখ্যা আর আহ্বান। বিশাল জনসভায় বিশাল জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন ভাষণ। দৃপ্ত স্লোগান ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে বাতাসে। ভাষণের মাঝে বঙ্গবন্ধু বললেন, খবর এসেছে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ রেডিওতে প্রচাররত ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি কর্মকর্তা কর্মচারীদের আহবান জানালের রেডিও অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে। বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ গর্জে উঠলো ‘৭ কোটি বাঙালিরে দাবায়া রাখতে পারবা না’। ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেব’। অবশেষে আসলো অনেক কাঙ্খিত সেই ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’। ডাক দিলেন মুক্তির। বঙ্গবন্ধু কন্ঠ থেকে ঘোষণা হলো ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ময়দান থেকে লাখো লাখো হাত উঠে গেল আকাশে। দলমত নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। বঙ্গবন্ধু আর বাঙালি হয়ে গেলেন সমার্থক। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি মুজিব থেকে লক্ষ মুজিবের জন্ম। পরের ইতিহাস সবার জানা। জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। ৭ই মার্চের রাতেই সুরমা মেইলে উঠে বসলাম আমি আর মসই ভাই। সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জ আসবো। তখন ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে ট্রেন ছাড়া সুনামগঞ্জে আসার কোন পথ ছিল না। রেলস্টেশনে মানুষের প্রচ- ভিড়। মানুষের মাঝে উত্তেজনা। আমরা ঠেলাঠেলি করে একটি সেকেন্ড ক্লাস কামরায় উঠলাম। সবার মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আলাপ আর স্বাধীনতার আলাপ। আমাদের কামরায় এক মহিলা ছিলেন। উনার স্বামী অবাঙালি। মহিলার সঙ্গে চলছে কয়েকজন তরুণ যাত্রীর কথা কাটাকাটি। স্বামী চুপচাপ। ভীষণ একটা বিব্রতকর অবস্থা। কামরার অন্যান্য যাত্রীরা মিলে ছেলেদের শান্ত করলেন। ট্রেন ছাড়লো। ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ট্রেন পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সবাই মাথা নিচু করলেন। বলাবলি হতে থাকলো যে কোন সময় ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে গুলি আসতে পারে। সকাল বেলা কুলাউড়া স্টেশনে ট্রেন থামে। স্টেশনে মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা। রেকর্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বাজছে। ভাষণটি রেকর্ড করা হয়েছিল। তখনও ভাবিনি কি ভংয়করভাবে ২৫ শে মার্চের কালো রাত নেমে আসবে। সিলেট এসে বাসে চলে এলাম প্রিয়তম শহর সুনামগঞ্জে। সেদিন ৮ই মার্চ ১৯৭১। চারিদিকে স্বাধীনতার গন্ধ। বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ নি:সৃত সেই ৭ই মার্চের ভাষণ এবারে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যথার্থ সিদ্ধান্ত। সেদিন ময়দানে উপস্থিত থাকায় নিজেকে ধন্য মনে করি।
(এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সনে তৎকালীন সাপ্তাহিক সুনামকন্ঠ পত্রিকায়। বর্তমানে পরিমার্জিত আকারে লেখকের ‘স্বাধীনতার গল্প ও অন্য গল্প’ গ্রন্থ থেকে পুন:মুদ্রিত)
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক