হোসেন তওফিক চৌধুরী
বৃহত্তর সিলেটের এক গৌরব বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী। তিনি এখন অনন্তের যাত্রী। না ফেরার দেশে চলে গেছেন গত রবিবার ২২ শে ডিসেম্বর। তিনি প্রায় ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি একজন ন্যায়নিষ্ঠ এবং ন্যায়বিচারক ছিলেন। এ ব্যাপারে তার খ্যাতি প্রবাদ প্রতীম।
মাহমুদুল আমিন চৌধুরী আমাদের কাছে মামুন ভাই হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর শৈশব কাল কেটেছে সুনামগঞ্জের আলো বাতাসে। তিনি বেড়ে উঠেছেন সুনামগঞ্জে। তিনি রাজগোবিন্দ পাঠশালা এবং সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর পিতা আব্দুল গফুর চৌধুরী সুনামগঞ্জের ডি আই অব স্কুল ছিলেন। সুনামগঞ্জ পুলিশ ক্লাব ও পুলিশ গারদের পাশে সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকার এক বাসায় থাকতেন। এর পাশেই আমরা ভাড়াটে বাসায় থাকতাম। তখন থেকেই এই পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী ও গফুর সাহেবের মধ্যে সম্পর্ক গভীর ও নিবিড় ছিল। গফুর সাহেবের মূল বাড়ি গোলাপগঞ্জের রনখেলী গ্রামে। গফুর সাহের সিলেট পাইলট হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মামুন ভাই আইনে ডিগ্রি নিয়ে সিলেট বারে আইনজীবী হিসাবে যোগদান করেন। আইনজীবীদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিযুক্তির একটি বিধান ছিল তখন। মামুন ভাই এই নিয়ম অনুসারে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিযুক্ত হন। তিনি টাঙ্গাইল জজ কোর্টে যোগদান করেন। আমি তখন ঢাকার অধুনালুপ্ত দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। এক বার টাঙ্গাইল গেলে তার সঙ্গে আমি দেখা করি। এর পর ধাপে ধাপে তিনি জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের বিচারপতি, আপিল কোর্টের বিচারপতির গুরু দায়িত্ব পালন করেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন ২০০১ সালে। ২০০২ সালের ১৭ই জুন তিনি চাকুরী থেকে অবসরে যান। তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসাবে সুনামগঞ্জ আদালতের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তখন সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতি তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করে। ২০১২ সালে সুনামগঞ্জ জুবিলী হাই স্কুলের ১২৫তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ করা হয়। তিনি যথাসময়ে অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এই অনুষ্ঠানে সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক চৌধুরীও বিশেষ অতিথি হিসাবে যোগদান করেন। ফারুক চৌধুরীর পিতা গিয়াস উদ্দিন আহমদ সুনামগঞ্জের সেকেন্ড অফিসার ও মহকুমা হাকিম ছিলেন। তাঁরা উভয়ে অনুষ্ঠানে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বক্তব্য রাখেন। তাঁদের স্মৃতিতে সুনামগঞ্জ অত্যন্ত সজীব। মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর গৃহ শিক্ষক ছিলেন সুবেদার মোবারক আলী। সুনামগঞ্জের আইনজীবী রফিকুল আলমের পিতা তিনি। তিনি বাসায় গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি তাঁর খেলার সাথী এবং সতীর্থদের খোঁজ খবর নেন। সুনামগঞ্জের প্রবীণ আইনজীবী হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী তাঁর নিকট আত্মীয়। আমার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী যখন সিলেট পত্রিকার সম্পাদক তখন সিলেটে আমাদের বাসা ছিল মীরাবাজার মডেল হাই স্কুলের গেটের পাশে। রায়নগরের পাশেই। আমরা যে কত বার বাসায় গেছি তার সীমা সংখ্যা নেই। গফুর চাচা সকালে না হলে বিকালে আমাদের বাসায় একবার ঢু মারতেন। এসব এখন স্মৃতি। স্মৃতি হয়েই থাকবে। মামুন ভাইয়ের মৃত্যুর পর এসব স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে মানস নয়নে ভাসছে। তিনি দুই মেয়ে এবং এক ছেলে রেখে গেছেন। তাঁর স্ত্রী আগেই ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর ভাই হুমায়ুন সাহেব আমেরিকা প্রবাসী। অমায়িক ব্যবহারের জন্য মাহমুদুল আমিন চৌধুরী সর্বমহলে সমাদৃত গ্রহণযোগ্য এবং প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁর মধ্যে কোন দাম্ভিকতা ও জাঁকজমক ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের মতোই জীবন যাপন করেছেন। এই বরেণ্য ও নন্দিত ব্যক্তি শ্রদ্ধা ভালোবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। একজন জুবিলীয়ান বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করায় নিঃসন্দেহে জুবিলীয়ানরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত হন। তিনি এ পদ অলংকৃত করায় সিলেটের সুনাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর আগেই এ পদে হবিগঞ্জ লষ্করপুরের সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং পরে মৌলভীবাজার কমলগঞ্জের এমএম সিনহা প্রধান বিচারপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এঁরা আমাদের গৌরব দীপ্ত ঐতিহ্য। আমার এই নিবন্ধ শেষ করার আগে আমি আব্দুল গফুর চৌধুরী ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর রুহের মাগফেরাত কামনা করে তাঁদেরকে বেহেস্ত নসিব করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট।