বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
১৯৭০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাপর্ণে ধন্য হয়েছিল জামালগঞ্জের সাচনা বাজার। সেদিন বাজারের উত্তর পার্শ্বের বটতলায় তৈরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি উপস্থিত জনতাকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সর্বাত্মক মুক্তির মোহনায় সমবেত হওয়ার আহবান জানিয়ে নৌকায় ভোট চেয়েছিলেন। পরে সাচনা বাজারের সভা শেষে বঙ্গবন্ধু মরহুম আব্দুর রহমানের বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে লঞ্চযোগে গোলকপুর রওয়ানা দেন।
যতটুকু জানা যায়, ’৭০-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি এসেছিলেন জামালগঞ্জের সাচনা বাজারে। ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঊনসত্তরে ছয় দফা আন্দোলন অতঃপর ’৭০-এ পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনী প্রচারে সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তারই অংশ হিসেবে তিনি সাচনা বাজারস্থ বটতলায় জনসমাবেশে মিলিত হন। তখন থেকেই অখ্যাত বটতলার সাথে ঐতিহাসিক কথাটি যুক্ত হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সাথে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ ও আব্দুল হেকিম চৌধুরীসহ আরও অনেকে ছিলেন বলে জানা গেছে।
অপরদিকে সভাস্থলে উপস্থিত এমন ক’জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ’৭০-এ বঙ্গবন্ধু যখন এসেছিলেন তখন সময়টা ছিল বর্ষাকাল। তদানিন্তন সময়ে তেমন বেশি দোকান ছিল না সাচনা বাজারে। বেহেলী রোড থেকে সিএন্ডবি রোডে যাওয়ার যে বাঁধ বাজার সেটি সুরমা লাগোয়া নদীর অংশ ছিল। সেই এক পার অর্থাৎ লঞ্চযোগে এসে তিনি নামলেন কোম্পানীঘাটে। তখন লোকে লোকারণ্য সাচনা বাজারের আশপাশ। ডাঙায় মানুষের জায়গা সঙ্কুলান না হওয়ায় দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নৌকায় জমায়েত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখা ও কথা শোনার জন্য জলে ও স্থলে অবস্থান করছিল উৎসুক জনতা। প্রায় দশ হাজারেরও বেশি মানুষ সুরমা নদীতে নৌকায় দাঁড়িয়েছিল। সভামঞ্চে সেদিন বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করেছিলেন সাচনা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ঋষিকেশ রায়।
বটতলার মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে থাকা ঋষিকেশ রায়ের লেখা ডায়রি থেকে জানা যায়, তাঁর (ঋষিকেশ রায়) জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয় ছিল বঙ্গবন্ধুর পুতপবিত্র বক্ষের সাথে তার বক্ষের মিলন। বঙ্গবন্ধুর উষ্ণ বক্ষের তেজ তিনি অনুভব করেছেন। আলিঙ্গিত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘ভাই আমার বাংলা মায়ের জন্য যথাসাধ্য করবেন।’ উত্তের ঋষিকেশ রায় বলেছিলেন, ‘জনাব আমি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। আমার ক্ষমতাই বা কতটুকু।’
সংখ্যালঘু শব্দটা শোনে বজ্রের মতো ফেটে পড়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কি বললেন, সংখ্যালঘু কথা কি বললেন, আমি আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আর কোনদিন সংখ্যালঘু কথাটা মুখে আনবেন না। আপনি আমার চেয়ে খাট নন। নিজের শক্তিকে জাগ্রত করুন।’ এভাবে বঙ্গবন্ধু সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
ওইদিন সভামঞ্চে মরহুম আব্দুর রহমান তালুকদার, জমির উদ্দিন মাস্টার, মো. সাদেক আলী, প্রয়াত ঋষিকেশ রায়, সুখময় দে, নির্মলেন্দু ঘোষ চৌধুরী ছাড়াও আর অনেকে বঙ্গবন্ধু সংস্পর্শে ছিলেন বলে জানা গেছে। তখন মঞ্চে জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের প্রয়াত বাউলশিল্পী আব্দুল মন্নান তালুকদার বঙ্গবন্ধুর সম্মুখে বেহেলা বাজিয়ে গান গেয়েছিলেন- ‘জাগো জাগো বীর বাঙালি মুজিব বাতায়া…।’ এছাড়া নিপীড়ক পশ্চিমা পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে সভাস্থলে উপস্থিত জনতা স্লোগান তুলে বলেছিলেন, ‘ও ভাই জারমুনি, ছয় দফার বাতাসে তুই টিকবেনি’; ‘উক্কা আছে কল্কি নাই, আইয়ুব খানের ভোট নাই’ ইত্যাদি ব্যাঙ্গাত্মক কথার পাশাপাশি বাঙালি উদ্বুদ্ধ কথা ও গান উচ্চারিত হয়েছিল বলে জানা গেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী গঠিত জামালগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ভাটি লালপুর গ্রামের ডা. আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরীর ছেলে ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল বাতেন চৌধুরীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সাচনা বাজার থেকে বঙ্গবন্ধু লঞ্চযোগে গোলকপুর আসেন। তখন রাত প্রায় ৮টা। গোলকপুর আসার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে তিনি নৌকা পেয়েছেন। পরে গোলকপুর সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানকালে বঙ্গবন্ধু সে কথাটি তুলে ধরেন। সেখানে নোঙর করা লঞ্চে খাওয়া দাওয়া শেষে সেই লঞ্চেই রাতযাপন করেন বঙ্গবন্ধু। পরদিন সকালে সেলিমগঞ্জ-গজারিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন বঙ্গবন্ধু বলে জানিয়েছেন তিনি।
সাচনা বাজারস্থ বটতলা সভার প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমদর বলেন, ‘আমি তখন বয়সে তরুণ। বঙ্গবন্ধু আসার খবরে আমিও হাজির হই বাজারে। চারপাশে মানুষের ভীড়। সেই ভীড়ে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, তাঁর ভাষণ শুনেছি। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, তারা সর্বক্ষেত্রে আমাদেরকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তাদেরকে পরিহার করে আপনারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেন।’