মাহবুবুল হাছান শাহীন
১৯৯৩ সালে এসএসসি পাশ করার পর সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। স্কুল এবং কলেজের পার্থক্য বুঝতে সময় লাগলো না। (১৯৮৫-১৯৯২) স্কুল জীবনে ক্লাস, খেলাধুলায় মেতে থাকতাম। কিন্তু কলেজে ভর্তি হয়ে মনে হলো এক লাফে বড় হয়ে গেছি। স্কুলের রফিক স্যার, বেনু স্যার, খালেক স্যারদের কড়া শাসনের বেড়াজাল ছিন্ন করে যখন কলেজে ভর্তি হলাম মনে হলো মুক্ত মানব হয়ে গেছি। কোন কিছুতেই আর বাধাধরা নিয়ম নেই। স্যারদের কড়া শাসন থেকে বেঁচে গেছি।
আস্তে আস্তে ক্লাস শুরু হলো দশম এবং একাদশ শ্রেণির মধ্যে অনেক তফাত। বাসাতেও এখন আর পড়ালেখার জন্য তাগিদ দেয়া হয় না। আর কলেজে তো আমরা মহারাজা। বিজ্ঞান বিভাগে ক্লাসের সঙ্গে প্রতিটি বিভাগের আলাদা আলাদা ব্যবহারিক। তার সঙ্গে প্রতি বিষয়ের উপর আলাদা আলাদা টিচার। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরে ব্যস্ত থাকতে হতো।
আমরাও এতো ব্যস্ততার মাঝে নিজেদের রুটিন তৈরি করে নিলাম। কলেজে ক্লাস ফাঁকির অনেক কিছুই রপ্ত করে ফেললাম অতি সহজেই। কোন কোন ক্লাসে রোল কলের পরই বেরিয়ে যেতাম। স্যাররা কিছুই বলতেন না। তবে সব স্যারই একটি কথা বারবার বলতেন, ‘কলেজ জীবনে তোমাদের কেউ কিছ বলবে না। এখনকার ফাঁকি দেয়া মানে তোমরা আমাদেরকে ফাঁকি দিচ্ছ না। তোমরা তোমাদেরকেই ফাঁকি দিচ্ছ।’ বাস্তব জীবনে যখন পড়লাম স্যারদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মনে হতে লাগলো। আমাদের কলেজ জীবনে টিচাররা ছিলেন দত্ত স্যার, সিতেশ স্যার, কমলেন্দু স্যার, নিলীমা ম্যাডাম (বর্তমানে কলেজের প্রিন্সিপাল) সহ সকল স্যারদের কথা মনে থাকবে আজীবন। পুরনো স্যারদের সঙ্গে আমাদের সময়ে এক সঙ্গে কলেজে অনেক নতুন স্যার যোগ দিয়েছিলেন। তারমধ্যে যাঁদের কথা মনে আছে তারেক স্যার, মানস স্যার, বদরুল স্যার, সাঈদ স্যার, গনি স্যার (বর্তমানে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক), বলারাম স্যার সহ অনেকেই। বিশেষ করে আব্দু মিয়া স্যারের কথা বলতেই হয়। কলেজের দুই বছরে স্যারের কাছে আমরা ইংরেজী ও জীব বিজ্ঞান পড়েছি। কিন্তু কোন দিন আমরা টাকা দেইনি। স্যার শহরের সবারই পরিবারের সকলকে চিনতেন। তাতে স্যারকে আমরা বেশী ভয় পেতাম। কোন কারণে না স্যার আবার অভিভাবকদের নালিশ করেন।
দুই বছর সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজে আমাদের অধ্যয়নের সময়। খুব অল্প সময় হলেও নতুন করে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য তিন বিভাগের অনেকের সঙ্গে এখনও বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে।
নিজের বড় হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ আমার মনে হলো কলেজ থেকেই শুরু। অনেকেই আমরা কার্ড খেলেছি, অনেকেই প্রেম নিয়ে ব্যস্ত, অনেকেই আবার কলেজ জীবন শেষ হওয়ার আগেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
আমাদের কলেজ জীবনে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজে ছাত্র সংসদের শেষ নির্বাচন হয়েছিল। খুবই উৎসব মুখর পরিবেশ ছিল তখন। ছেলে মেয়ে সবাই মিলে ভোট চাওয়া, নির্বাচন, প্যানেল এসবের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল। ‘মিন্টু, আতিক, শামসুলÑআন্দোলনের তিন ফুল’ এখনও কলেজ ক্যাম্পাসের স্লোগান কানে ভেসে উঠে।
আমার এই লেখায় কিছু বন্ধুদের স্মরণ করতে চাই। যাঁরা ’৯৫ ব্যাচ ও সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজকে আলোকিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা. রফিকুল ইসলাম (আরএমও সদর হাসপাতাল সুনামগঞ্জ), ডা. হুসনে জাহান সুলতানা (গ্রীন লাইফ হাসপাতাল, ঢাকা), ডা. রওনক জাহান (প্রাক্তন প্রভাষক সিলেট রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আমেরিকা প্রবাসী), চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ (উপ সচিব মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ), ফাখরুছ সালাম (সহযোগী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়) ও বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে আমাদের ব্যাচের যারা যোগদান করেছেন তারা হলেন শাহরিয়ার বিন সালেহ, জমসেদ আলী, ইনার উদ্দিন প্রমুখ। এর মাঝে যাদের নাম করতে পারিনি তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
স্মরণ করছি জীবনের প্রতি মুহূর্তে চাহিদা মেটাতে যারা প্রবাস জীবন যাপন করছেন তাদের মধ্যে হলো-সুমন, রাসেল, সেলিম, ফয়সল, সাদেক, আলমগীর, সুজিত, কালাম, জাকির প্রমুখ।
‘আমাদের আবেগ বিধৌত স্বপ্নময় অতীতের সুন্দর দিনগুলোর নিরন্তর ধারক’ বিষয়কে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের সময় একেবারেই ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০ কলেজ প্রাঙ্গণে এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত অনুষ্ঠানে নিবন্ধনকৃত সকলেই উপস্থিত থাকবেন। আশা করি সকল ব্যাচের সকল শিক্ষার্থী প্রাণের তাগিদেই ৭৫ বছর পূর্তিতে এক হবেন। কলেজ জীবনের স্মৃতিগুলো আবারও জেগে উঠবে। কলেজের ক্যান্টিন, চিলেকোটা, বারান্দা, গাছের তলা যার যার মতো স্মৃতি কাতরতা জেগে উঠবে। শত বছরে আমরা অনেকেই হয়তো থাকবো না, তবে সরকারী কলেজ ক্যাম্পাসে অনেকের ভালোবাসা ও ভালোলাগার স্মৃতি বিশাল মহিরুহ হয়ে আমাদের ছায়া দেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
সবাই ভালো থাকুন। ………….স্মৃতির ক্যাম্পাসে স্বাগত।
লেখক : আইনজীবী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ব্যাচ ৯৫ ও সদস্য সচিব, রেজিস্ট্রেশন কমিটি ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব।