আকরাম উদ্দিন
হঠাৎ করেই এক চিলতে জমিতে অনেক লোক দেখা যাচ্ছে। সারা দিনই ভিড় থাকে নারী পুরুষ ও তরুণ তরুণীদের। দূর থেকে দেখা যায় তারা ছবি তুলছেন, সেলফি তুলছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আগে কখনও এখানে কাউকে দেখা যেত না। এই জমির পাশ দিয়েই চলে গেছে সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়ক। অনেক যাত্রী উৎসাহ নিয়ে ওদিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করছেন ওখানে কী হচ্ছে। যারা জানেন না তারা অন্যদের জিজ্ঞেস করছেনÑ ভাই এখানে এত মানুষের ভিড় কেন?
মূলত এক চিলতে সূর্যমুখী বাগানকে ঘিরেই এ বছর হঠাৎ করে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে ভাদেরটেকের সালামপুর এলাকাটি। কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় নিছক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই ৩ কেয়ার জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেন স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান। ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে গাছে ফুল ফুটেছে। একসাথে প্রতিটি চারায় ফুল ফুটায় পুরো জমি জুরে তৈরি হয়েছে অভাবনীয় এক সৌন্দর্য। সূর্যের দিকে মুখ করে ফুটে থাকা ঘন ফুলের সমারোহই সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষদের সালামপুরে টেনে আনছে।
সূর্যমুখী বাগানের ছবিতে এখন ফেসবুক সয়লাব। অনেকেই নিজের বা বন্ধু-বান্ধব সমেত ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। এইসব পোস্ট দেখে বাগানটি দেখতে আগ্রহী লোক বাড়ছে। একজনের কাছ থেকে আরেকজন খবর পেয়ে অনেকেই এখন আসছের সূর্যমুখীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবসে বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থী সমাগম ঘটেছিল বাগানে। এই মৌসুমী পর্যটন এলাকাটিকে ঘিরে জমে উঠেছে ছোটখাট কিছু দোকানপাটও। শুকনা খাবার, তরমুজ ও চা নিয়ে বসে গেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। ব্যবসা করতে পেরে তারাও খুশি।
এরকমই একজন গাজী মিয়া । তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে এখানে ফালি ফালি করে তরমুজ বিক্রি করছেন। তিনি এক গাল হেসে বললেন, সূর্যমুখী আমাদের বাড়তি রোজগারের উপায় করে দিয়েছে।
সড়কের পাশে বাস, লাইটেস, সিএনজি, মোটর সাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেল শনিবার সকালে। বাগানবিলাসীদের বহন করে এনেছে এইসব যানবাহন। এক সিএনজি ড্রাইভার জানালেন, সালামপুরের সূর্যমুখী বাগানের কারণে আমাদের ট্রিপ বেড়ে গেছে। ভাড়া বেশি নেন কিনা, জানতে চাইলে হেসে একটু চোখ টিপলেন তিনি। যার অর্থ এই একটু আধটু বেশি নেই আর কি।
বাগানের মালিক কৃষক আব্দুর রহমান জানালেন সেই দুঃসংবাদটি। তিনি বললেন, ১৫ মার্চের মধ্যে ফুলগুলো বীজ সংগ্রহের উপযোগী হয়ে উঠবে। তখন সূর্যমুখী গাছ কেটে বীজ সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ ১৫ মার্চের পর সালামপুরের হলুদ বাগানটি আর থাকছে না। আগের মতোই নিরেট একখন্ড জমি হয়ে যাবে হঠাৎ করে গজিয়ে উঠা এই হলুদের শোভা। অনেকেই তাই বাগান শুকিয়ে যাওয়ার আগেই দেখে নিতে চাইছেন।
আব্দুর রহমান কিন্তু এই লোক সমাগমে মোটেই খুশি নন। বরং তিনি বিরক্ত। বেড়াতে আসা লোকজন নাকি বাগানের ভিতর ঢুকে গাছগুলো মাড়িয়ে যায়। অনেকে ফুল ছিড়ে নেয়। এতে তার ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি নিজের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় মানুষের এই সমাগম মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু মানুষ চিরকাল সৌন্দর্য পিপাসু। কোনো ধরনের লাভ-ক্ষতির চিন্তা না করেই মানুষ সুন্দর এলাকা দেখতে ছুটে যায়। তাই তো আব্দুস সালামের ক্ষতির চিন্তা না করেই দলে দলে মানুষ ভিড় করছে এখানে। আরও কয়েকদিন এমন ভিড় থাকবেই।
শনিবার ট্যাকেরঘাটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সল আহমদ, আবু মুগিরা, আলবি, তিশা রহমান, ইভা রহমান ও মুতাহা। সাময়িক যাত্রা বিরতি ঘটালেন তারা এখানে। তাঁরা জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট। যাত্রা পথে হলুদবর্ণের ফুল আমাদের কাছে টেনে নিয়েছে। স্মৃতি ধরে রাখতে সূর্যমুখির সংস্পর্শে গিয়ে কিছু ছবি উঠেছি। বাগানটি খুবই সুন্দর। ভাল লেগেছে আমাদের।
ঢাকা থেকে এসেছেন মাহমুদুল হাসান ও মনিরুল আলম সাজু। তাঁরা জানান, এক সাথে হাজারো ফুলের সমারোহে মুগ্ধ আমরা। ফুলের সৌন্দর্য্যে কিছু সময় আনন্দে থাকা যায়।
সিলেট থেকে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেদী কাওসার ও মোহাম্মদ হানিফ। তাঁরা জানান, আমরা পরিবারবর্গ নিয়ে এসেছি বেড়াতে। তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ঘুরাফেরা করব। যাত্রা পথে শহরের অদুরে সূর্যমুখি বাগানে ছবি উঠা অন্যতম আনন্দ বিনোদন। তাই কিছুক্ষণ আনন্দে ছিলাম।
শহরের বাসিন্দা পর্যটক আব্দুর রায়হান জানান, আমি আরও দুইবার সূর্যমুখি বাগানে এসেছি। আজও এসেছি। ভাল লাগে ছবি উঠতে।