সু.খবর ডেস্ক
রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্তি হচ্ছে ১ জুলাই আজ শনিবার। এই দিনে রাত পৌনে ৯টার দিকে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে ২০ বিদেশি নাগরিকসহ ৩০ থেকে ৩৫ জনকে জিম্মি করে রাখে এবং রাতভর হত্যাযজ্ঞ চালায়। পরদিন শনিবার সকালে রেস্তোরায় জিম্মিদের উদ্ধারে কমান্ডো অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। তবে এর আগে শুক্রবার রাতেই জঙ্গিদের সঙ্গে গোলাগুলিতে ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দিন খান নিহত হন। অভিযান শেষে যৌথ বাহিনী বিদেশি নাগরিকসহ মোট ১৩ জনকে জীবিত এবং মোট ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। অভিযানে ছয় জঙ্গিও নিহত হয়। নিহত ২০ জনের মধ্যে দু’জন বাংলাদেশি, ১ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান, ৯ জন ইতালিয়ান, ৭ জন জাপানি ও ১ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন-ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ হোসেন এবং ডেএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনালের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক ইশরাত আখন্দ। এছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান অবিন্তা কবির ও ভারতীয় তরুণী তারুশি জেইনও নিহতদের মধ্যে ছিলেন। অবিন্তা কবির এলিগ্যান্ট কোম্পানির চেয়ারম্যান রুবা আহম্মেদের একমাত্র মেয়ে। তিনি নিহত হওয়ার মাত্র ৪ দিন আগে ২৭ জুন বাবার সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। নিহত ইতালিয়ান ৯ নাগরিক হলেন-আদেলে পুগলিসি, মারকো তোন্দা, ক্লদিয়া মারিয়া ডি’আন্তোনা, নাদিয়া বেনেদেত্তি, ভিনসেঞ্জো ডি’আলেস্ত্রো, মারিয়া রিভোলি, ক্রিস্তিয়ান রসি, ক্লদিয়া কাপেলি ও সিমোনা মন্তি। নিহত ৭ জাপানি নাগরিক হলেন-নাকা হিরোশি, সাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই, হাসিমাতো হিদেকো ও কোয়ো ওগাসাওয়ার। কমান্ডো অভিযানে নিহত ছয়জনের মধ্যে নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওই হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে দু’দিনের শোক ঘোষণা করেছিলেন। এ ধরনের অতর্কিত হামলা চালিয়ে মানুষজনকে জিম্মি করার ঘটনা বাংলাদেশে সেটিই ছিল প্রথম। এ হামলা ও হত্যাকান্ডের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত অনেকটাই এগিয়েছে। নিহত ২০ জনের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে গত ১৯ জুন আমরা হাতে পেয়েছি। জঙ্গিদের লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনও পাইনি। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।’
বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করা এ হামলার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রহস্য উদ্ঘাটন করার দাবি করে তিনি বলেন, ‘আসামিদের জবানবন্দি, সংরক্ষিত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে হামলার পুরো ছক পাওয়া গেছে।’
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গি দমনে তারা নিয়মিত কাজ করছেন। পলাতক জঙ্গিদের অবস্থান শনাক্ত করতে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব জঙ্গির আস্তানা শনাক্ত করে নিয়মিত অভিযানও চলছে।’
তিনি বলেন, ‘হলি আর্টিজানে হামলার পর টানা অভিযানে তামিম চৌধুরী, মুসা, জাহিদুল, তানভীর কাদেরী ও মারজানের মতো অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি নিহত হয়েছে। রাজীব গান্ধীসহ অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি গ্রেফতারও হয়েছে। পলাতক অন্য জঙ্গিদের গ্রেফতারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও ন্যক্কারজনক হত্যাযজ্ঞের এ জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনটিকে শোক ও ক্ষোভের সঙ্গে স্মরণ করতে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বাসস জানায়, আজ বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতালি ও জাপানি দূতাবাসের সাথে যৌথ আয়োজনে নানা কর্মসূচি পালন করবে। ইতালির ৯ নাগরিকের স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইতালি সরকারের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছে। ইতালি দূতাবাস এবং বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে হবে ওই স্মরণ অনুষ্ঠান। জাপানের সাত নাগরিকের স্মরণে শোকসভার আয়োজন করছে জাপান দূতাবাস ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নিহতদের স্মরণে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আজ বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শান্তি সমাবেশ করবে। গণজাগরণ মঞ্চ আগামী ৪ জুলাই বিকাল ৪টায় শাহবাগে নাগরিক শোক সমাবেশ করবে। সমাবেশ শেষে নিহতদের স্মরণে আলোক প্রজ্জ্বালন করে গণজাগরণ মঞ্চ শ্রদ্ধা জানাবে।