- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরই আমাদের জীবন হাওরই আমাদের মরণ

হোসেন তওফিক চৌধুরী
হাওরই আমাদের জীবন। হাওরই আমাদের মরণ। হাওরের সাথেই ভাটি বাংলার মানুষের জীবন ও সকল স্বপ্ন এক সূত্রে গাঁথা। হাওরের সোনা ফলা জমির ফসলের সাথেই মানুষের সকল আশা-ভরসা-প্রত্যাশা আবহমান কাল থেকেই জড়িয়ে রয়েছে। ফসল ভালো ও আশানুরূপ হলেই মানুষের জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ কিছুটা হলেও দেখা দেয় কিন্তু ফসল হানি, অকাল বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়। অভাব, দুর্ভোগ, ভোগান্তি হয় নিত্য সহচর। মানুষ জীবনে খেই হারিয়ে হিমসিম খায়। অকাল বন্যার কবল থেকে হাওর ও ফসল রক্ষার জন্য ফসল রক্ষা রাঁধ নির্মাণ করে শুধুমাত্র ফসল রক্ষার জন্য প্রতিবছর সরকার ভাটি বাংলার সকল জেলার তথা সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা প্রভৃতি জেলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ফসল রক্ষায় এগিয়ে াসে। অসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি এবং স্ব স্ব এলাকার হাওরবাসীরা অংশগ্রহণ করছেন। কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের দিয়েও বাঁধ নিমাণের কাজ করানো হয়। কিন্তু সর্বত্রই একই অবস্থা। সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ হয় না। কাজে ধীরগতি ও দুর্নীতির যেন পোয়াবারো। ফলে নদীতে একটু পানি বাড়লেই পানি হাওরে প্রবেশ করে আর আমাদের ভাটি বাংলার মানুষের চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যায় হাওর। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর ফলায়া ফসল প্রাপ্তির বুকভরা আশা এমনিভাবে নি:শেষ হয়ে যায়। তখন তাদের হতাশা-নৈরাশ্য চরমে পৌঁছে। তাদের দীর্ঘশ্বাসে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে প্রকাশ সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বাঁধ নির্মাণ কাজে ধীরগতি প্রত্যক্ষ      
করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ খুবই নি¤œমানের হওয়ায় পিআইসি ও ঠিকাদারদের প্রতি তিনি ক্ষুব্ধ হন। সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য ও অনুরূপ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য যে, গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ফসল রক্ষা বাঁধ নিমাণের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। জানা গেছে, কোন কোন এলাকায় এখনও বাঁধের কাজই শুরু হয়নি। আবার কোন কোন এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন পিআইসির লোকেরা। এরই মধ্যে কয়েকটি হাওরের ফসল ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি হাওরের ফসল নিয়ে গভীর শংকা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। ফাল্গুন মাস অকাল বন্যার সময় নয়। চৈত্রের মাঝামাঝি সময়ে অকাল বন্যার আশংকা। কিন্তু ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ না করার জন্য এবার ফাল্গুনেই কয়েকটি হাওরের ফসল বিনষ্ট হলো। সর্বনাশ হয়ে গেছে। ফসল হারিয়ে মানুষ এখন কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রতিবছরই একই অবস্থা সৃষ্টি হয়। বাঁধ নির্মাণে ঢালবাহানা ও দুর্নীতি লেগেই আছে। একশ্রেণির পাউবো কর্মচারীর যোগসাজসে পিআইসির লোক ও ঠিকাদারেরা এহেন কাজে লিপ্ত থাতে। এদেও বিরুদ্ধে অভিযোগ হয় কিন্তু কখনও কোন প্রতিকার হয়না। এই ট্যাডিশন সমানে চলছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থা আর কত চলবে। যাদের গাফিলতিতে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি হয় তারা কি আইনের উর্দ্বে? তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা কি কারো নেই? দেশে আইন কানুন, অফিস আদালত আছে কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেন ? মানুষ এখন এসব প্রশ্নের জবাব চায়। মানুষের ধৈর্যেও সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ চায় অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে এদের চিহ্নিত করে আইন আমলে নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। মানুষের ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছেন তাদেরকে অবিলম্বে আইন আমলে নিয়ে আসা প্রয়োজন। কে সরকারি কর্মচারী বা কে কোন দলের লোক এটা বিবেচনা না করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘বাঁধের কাজ একটি লুটেরা সিন্ডিকেট ভাগাভাসি করে নিয়েছে এবং অধিকাংশ হাওরে এখনও কোন বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘১৪টি হাওরে বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। সুনামগঞ্জ-সিলেট এবং হাওর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে এসব দুর্নীতি ও কর্তব্য অবহেলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সভা সমাবেশ হচ্ছে কিন্তু কোন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া নেই। হাবভাব দেখে মনে হয় সবকিছুই যেন অরুণ্যরোদন। কর্তৃপক্ষ এসব কিছুই আমলে নিচ্ছেন না। তারা নিশ্চল-নি:শ্চুপ। এটা হতে পারে না। কর্তৃপক্ষের এসব ব্যাপারে জরুরী ভিত্ত্বিতে সক্রিয় ও তৎপর হতেই হবে। এটাই মানুষ চায়Ñএটাই মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক: আইনজীবী ও কলামিষ্ট।

  • [১]