- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরজুড়ে নদী-খাল খননের দাবি ওঠেছে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছোট বড় দেড়শ হাওরের ফসল রক্ষায় কেবল বাঁধ নয় নদী-খাল খনন জরুরি মনে করছেন হাওরবাসী। হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে একসময়ের ‘গামলার মতো’ হাওর এখন হয়েছে থালা। আর নদী ভরাট হয়ে হয়েছে হাওরের সমান সমান। কোথাও কোথাও নদী-খালে গভীরতা হাওরের তলদেশের চেয়ে উচুঁ হওয়ায় ফসল চাষাবাদের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ছে হাওর। বছর বছর বাঁধ দিয়ে হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশকে আরও বিপন্ন করা হচ্ছে মনে করছেন হাওরপাড়ের মানুষেরা।
গত দুই এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল আগাম ও বন্যায় ডুবেছে সুনামগঞ্জে ১৯ হাওর। সরকারি হিসেবে সাড়ে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর ফসল ডুবার কথা বলা হয়েছে।। বেসরকারি হিসেবে ক্ষতি বহুগুণ বেশি। ২০১৭ সালের ভয়াবহ ক্ষতির পর এবছরই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওরের কৃষক।
এবারের ক্ষতির পরও আবারও নদী-খাল খননের দাবি ওঠেছে হাওরজুড়ে। সুনামগঞ্জে সুরমা, যাদুকাটা, কুশিয়ারা, পাটলাইসহ ছোট বড় মিলিয়ে ৩২ টি নদী রয়েছে। এছাড়া হাওর ও গ্রামের চারপাশে খাল, ডুবা ও পুকুর ছিলো। জেলার এসব খাল, ডুবা, পুকুর ও নদীকে পানির রিজার্ভ ব্যাংক বলা হয়। অসময়ে পাহাড়ি ঢল আসলে এসব নদী হয়ে পানি দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে হাওরগুলো নিরাপদ হয়ে যেতো। গ্রামের আশেপাশের খাল, পুকুর ও ডুবা একসময় পানি ধারণ করতে পেরেছে। দিন দিন পলি পড়ে নদী হারিয়েছে নাব্য, জেগেছে চর। খাল, পুকুর ও ডুবা ভরাট করে হয়েছে সড়ক, বাঁধ, করা হয়েছে আবাসস্থল। অনেক নদীর উপর দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে মানুষ হেঁটে পার হতে পারেন। এজন্য পাহাড়ি ঢল আসলেই নদী ভরাট হয়ে হাওরের ফসলহানির ঘটনা ঘটছে।
কৃষকদের দাবি দ্রুত নদী, খাল ও হাওরের ডুবা খনন করে এক ফসলি বোরো এলাকা সুনামগঞ্জকে নিরাপদ রাখতে হবে।
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরপাড়ের বাসিন্দা আবুল হাসিম ডালিম বললেন, আমরা হাওর পাড়ের মানুষ। হাওরের একমাত্র সম্পদ বোরো ধান। এই বোরো ধান অকাল বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। ধান গোলায় তুলতে না পারলে, সারা বছর না খাওয়ার কষ্টে ভুগতে হয়। নদীগুলো ভরাট হওয়ার কারণে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। যে নদীতে সারা বছর বড় বড় নৌকা চলাচল করতো, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে বাচ্চারা ফুটবল খেলে।
একই এলাকার কৃষক মো. মুন মিয়া বললেন, পানি আসলেই হাওর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। পরিকল্পিত নদী খনন করা না হলে, এবার ফসল টিকানো গেলেও সামনে আর হয় তো যাবে না। দ্রুত নদী খনন করতে হবে।
মধ্যনগরের ধান-চাল আড়ৎ কল্যাণ সমিতির সদস্য মুহিত কান্তি দে কাজল বললেন, গত চার বছর কৃষকের সোনার ফসল গোলায় তোলা গেছে। এর পেছনে বাঁধের কোনো অবদান নেই। প্রকৃতি দিয়ে গেছে বিধায় কৃষকরা ধান তুলতে পেরেছে। এবার পাহাড়ি ঢলে ফসল হারিয়ে আবারও হাজারও কৃষককে কাঁদতে হয়েছে। এর প্রধান কারণ নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, পরিকল্পিতভাবে নদী খনন করতে। এটা না করে বরং বছরে বছরে বাঁধ নির্মাণের টাকা বাড়ানো হচ্ছে।
হাওর নিয়ে কাজ করেন এমন অভিজ্ঞরা বলছেন, গামলার মতো হাওরগুলো এখন হয়েছে থালার মতো। প্রতিবছর অপরিকল্পিত বাঁধ দিয়ে হাওরকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ফসল রক্ষা বাঁধের মাটিতে প্রতিবছর হাওর, বিল ও ডুবা ভরাট হচ্ছে। এখন হাওরে কোথাও ডুবা, বিল নেই। আগে গ্রামের আশেপাশে খাল, পুকুর ছিলো। অসময়ে পানি আসলে সেগুলোর হাওরকে রক্ষা করেছে। এখন সবকিছু ভরাট হয়ে গেছে। হাওরকে বাঁচাতে হলে পরিকল্পিতভাবে নদী, হাওরের বিল ও ডুবা খনন করতে হবে। হাওরে প্রস্তাবিত উড়াল সড়কের পিলার পানির গতিপথকে বাধার মুখে ফেলবে কি না সেগুলো দেখতে হবে। বর্ষায় একটি হিজল গাছ ১০ থেকে ২০ লিটার পানি শোষণ করতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে ৪ থেকে ৫ লিটার দিতেও পারে। এজন্য হাওরে প্রচুর পরিমাণে হিজল করচ গাছ লাগাতে হবে।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সুনামগঞ্জে আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা ফসল রক্ষার জন্য একমাত্র কাজ হলো নদী খনন। জেলার ছোট বড় মিলিয়ে ৩২ টি নদীর মধ্যে কিছু প্রবাহিত হলেও সবগুলো মরা নদী। শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো শুকিয়ে যায়। এজন্য প্রথমত গুমাই নদী, সুমেশ^রী নদী ও বটেরখাল নদীর মুখ খনন করতে হবে। এই তিনটি নদীর মুখ খুলে দিলে সুনামগঞ্জের আগাম বন্যার পানি চলে যেতে পারবে। দ্বিতীয়ত নদীর নাব্যতা বাড়ানো জন্য যে বেড়িবাঁধগুলো দেয়া হয় সেগুলো পরিকল্পিত নয়।`

গুমাই নদী, সুমেশ্বরী নদী ও বটেরখাল নদীর মুখ খনন করতে হবে। এই তিনটি নদীর মুখ খুলে দিলে সুনামগঞ্জের আগাম বন্যার পানি চলে যেতে পারবে।

তিনি জানালেন, এক হিসেবে দেখা গেছে নদীগুলো ৩০ ফুট গভীরতায় খনন করলে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট মাটি উঠবে, সেই মাটি দিয়ে গড়ে ৬ ফুট উচ্চতায় ৫ হাজার ৩১৩ মাইল বাঁধ নির্মাণ করা যায়। জেলায় গ্রাম রয়েছে দুই হাজার ৮৮৮ টি। এই ২০ মিলিয়ন ঘনফুট মাটিকে অবজ্ঞা না করে সম্পদ মনে করে গ্রামগুলোর চারপাশ ভরাট ও হাওরের অসমতল জায়গাগুলো উচু করে দেয়া গেলে ধানী জমি বাড়বে।
হাওর গবেষক সজল কান্তি সরকার বললেন, হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় নদী খননের বিকল্প নেই। এজন্য নদীকে খাল হিসেবে খনন না করে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সম্প্রতি দেখছি একটা নদীকে ৩ ভাগ করে একভাগ খনন করা হচ্ছে। এটা করা যাবে না। ছোটবেলায় দেখেছি টগার হাওরে বাঁধ ভেঙে গেলেও ৭ দিন লেগেছে ফসল ডুবতে। কারণ হাওরের ডুবা, বিল পানি সংরক্ষণ করতে পেরেছে। তখন হাওরের মাঝখানে ডুবা ছিল, এখন ভরাট হয়ে গেছে। উজানের বৃষ্টিপাতের পানি কোন দিক দিয়ে আসে সেটা চিহ্নিত করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে নদী, হাওরর বিল ও খাল খনন করতে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বললেন, সুনামগঞ্জের মানুষের জন্য এক হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার ১৪ টি নদী ও এর সঙ্গে যত সংযোগ খাল রয়েছে তা খননের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নদীপথ দিয়ে নৌ চলাচলের জন্য ও ফসল কেটে কৃষক যেনো তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে সেজন্য ৯০টি কজওয়ে রাখা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কজওয়ের পয়েন্টগুলো জিও ব্যাগ দিয়ে বন্ধ রাখা হবে। যখন কৃষকের ফসল কাটা শেষ হয়ে যাবে, তখন কজওয়েগুলো খুলে দেয়া হবে। এই দুটি কাজ হলে আগামীতে এরকম আগাম বন্যা হলে মোকাবেলা করতে পারবো।

  • [১]