টিপু সুলতান ও এনামুল হক, দিরাই ও ধর্মপাশার হাওর ঘুরে এসে
হাওরজুড়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে হাওর তলিয়ে যাচ্ছে, কোথাও বা শিলাবৃষ্টিতে পাকা ধান নষ্ট করে দিয়েছে। সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিরাই ও শাল্লা উপজেলায়। এই উপজেলার বড় দুটি হাওর বরাম ও চাপতি ডুবে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর বোরো ধান ডুবে গেছে। এছাড়া ধর্মপাশার ৩ টি বাঁধ ভেঙেছে। সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ দেখার হাওরের উতারিয়া বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য রোববার বিকালে জেলা প্রশাসক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা করেছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রোববার ভোর থেকেই দিরাই উপজেলার কেজাউড়া’র বাঁধ ভেঙ্গে কালনী নদীর পানি প্রবল বেগে বরাম হাওরে ঢুকছে। এই হাওরের সাথে উদগল, গিলোটিয়া, কালিকোটা, ভান্ডা, ভেড়ামোহনা, ছায়াসহ অন্তত ১২ হাওরের সংযোগ থাকায় দিরাই ও শালা উপজেলার কমপক্ষে ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রোববার ভোরে এই বাঁধ ভাঙার খবর চাউড় হলে জনরোষে পড়ার ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন পাউবো’র প্রকৌশলীরা। হাওরপাড়ের কৃষকরাও বাঁধ রক্ষার আশা ছেড়ে দিয়ে হাটু থেকে বুক সমান পানিতে ধান কাটছেন।
বরাম হাওরের পাড়ের কৃষক সাবেক ইউপি সদস্য লাল মিয়া বলেন,‘বাশ, চাটাই, বস্তাসহ বাঁধ রক্ষার সরঞ্জামাদি পাওয়া গেলে কেজাউড়ার বাঁধ এতো তাড়াতাড়ি ভাঙতো না’।
দিরাই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায় বলেন,‘বরাম হাওরের যেদিক দিয়ে পানি ঢুকেছে, ঐ দিকে পাউবো’র কোন কাজ হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা’।
দিরাই উপজেলার বৈশাখী বাঁধের ওপর বসে তাড়ল গ্রামের অশীতিপর কৃষক নাছির উদ্দিন চৌধুরী সকালে আহাজারি করছিলেন। নাছির উদ্দিন চৌধুরী বললেন, ‘গত বছর ফসলের ক্ষতি করলো শিলা বৃষ্ঠিতে। এবার ফসল হারাতে হলো বানের পানিতে। আর একটু উঁচু করে বাঁধ দেয়া হলে ফসল রক্ষা হতো’।।
সুনামগঞ্জের ১৩৮ টি ছোট বড় হাওরের বেশিরভাগেই এক ফসলি জমি। বোরো ধান হয় প্রায় সকল হাওরেই। এবার জেলার ১১ উপজেলার দুই লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। চালের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার মে.টন। যার মূল্য প্রায় দুই হাজার আট’শ কোটি টাকা। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতি বছরই বোরো ধানের কাটা-মাড়াই শুরু হয়। এবার চৈত্রের মাঝামাঝি থেকেই সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে জেলার সবকটি হাওর রক্ষা বাঁধ হুমকির মধ্যে পড়ে। রোববার সকালে জেলার বড় দুটি হাওর বরাম ও চাপতি’র ফসল ডুবা শুরু হয়েছে। হাওরপাড়ের কৃষক-কৃষাণিরা বলেছেন, কেবল বরাম ও চাপতির হাওর নয়, একে একে তলিয়ে যাচ্ছে অন্যান্য হাওরগুলোও। বানের এই পানি নেত্রকোনার মদন খালিয়াাজুড়ি উপজেলার হাওরেও গিয়ে প্রবেশ করছে। বাঁধ নির্মাণে অনিয়মেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষকরা।
বরাম হাওর পাড়ের কৃষক বাবুল মিয়া, আব্দুল তোয়াহেদ ও ওসমান গণি জানালেন, বাঁধ ভাঙ্গার খবর পেয়ে পাউবো’র প্রকৌশলীরা হাওর ছেড়ে পালিয়েছেন। বাঁধের কাজে নিযুক্ত পিআইসির সভাপতি আব্দুস ছালামের দেখাও মিলছে না।
তাড়ল গ্রামের কৃষক ছুফি মিয়া বলেন, এবার বাঁধে চাহিদানুযায়ী মাটি ফেলা হয় নি। ঠিকমতো কাজ হলে নদীর পানি হাওরে ঢুকার কথা নয়’।
চাপতির হাওরপাড়ের কালধর গ্রামের বর্গা কৃষক জামাল উদ্দিন, আবুল মিয়া ও রুবেল মিয়া বলেন, ‘সরকারি অর্থায়নে বাঁধে কোনো মাটি কাটা হয় নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের খামখেয়ালীপনার জন্যই আমাদের এই দুরাবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে’।
একই গ্রামের কৃষক মনু মিয়া বলেন, ‘৮০ ভাগ ফসল হাওরেই ডুবেছে। বাঁধের ছোট ছোট কিছু ভাঙা বন্ধকরণ ছাড়া অন্য কোথাও মাটি ফেলা হয় নি। তিনি অভিযোগ করেন, তাড়ল ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হকের নামে প্রকল্প হলেও বাস্তবে কাজ করছেন তাড়ল গ্রামের হেলাল মিয়া চৌধুরী। এই প্রজেক্টে সাড়ে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও মাত্র ২-৩ লাখ টাকার কাজ করানো হয়েছে’।
জগদল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ছুবা মিয়া অভিযোগ করেন, ‘কচুয়া গ্রাম থেকে বৈশাখী বাঁধ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মিটার নদীর তীরে মাটি ফেলা হয় নি। এতে নদীর তীর উপচে পানি ঢুকে হাওরের নিচু এলাকার ফসল তলিয়ে গেছে’।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেছেন, কেজাউড়া’র বাঁধ পুন:সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থানীয়রা। জনরোষে পড়ার ভয়ে পাউবোর প্রকৌশলী ও তাঁদের নিযুক্ত পিআইসির সভাপতিরা গা ঢাকা দিয়েছেন। বাঁধ রক্ষায় এখন জনগণই ভরসা’।
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুয়েব আহমদ বলেছেন,‘রোববার উপজেলার ৩ টি হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে ৫৮৫ হেক্টর জমি তলিয়েছে’। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি।
এর আগে গত রোববার থেকে এক সপ্তাহে জগন্নাথপুরের নারিকেলতলা বাঁধ, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের একটি ছোট হাওর রক্ষা বাঁধ, জগন্নাথপুরের টঙর বাঁধ ভেঙে ফসলি জমি তলিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জাহিদুল হক বলেন,‘সরকারি হিসাবে শনিবার পর্যন্ত দেড় হাজার হেক্টর জমি ডুবেছে এবং পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে আরো প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমি’।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘আজ (রোবাবার) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সকল প্রস্তুতি নিয়ে কর্মকর্তাদের বাঁধে থাকতে হবে। জেলার সার্বিক পরিস্থিতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে’।