- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরপাড়ের স্বপ্নবিজয়ী শিক্ষা সংগ্রামী তাঁরা

বিশেষ প্রতিনিধি
বাবা ক্ষৌরকর্ম করেন। মা গৃহিনী। বড় ভাই একটি উন্নয়ন সংগঠনের মাঠকর্মী। বাবা ও ভাইয়ের কষ্টার্জিত টাকা ও নিজের টিউশনির টাকায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসন বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরি’র জন্য উৎকণ্ঠায় ছিলেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার হাওরপাড়ের গ্রাম গলহার তপন সরকার রাজ। ৩৮ তম বিসিএস’র ফলাফলে রাজ এবং তার পরিবারের সেই দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছে। পুলিশ ক্যাডারে (সহকারি পুলিশ সুপার পদ) চাকরি হয়েছে তাঁর।
রাজের বাবা গোপাল সরকার ও শান্তি সরকার আনন্দে উদ্বেলিত। গোপাল সরকার বলেন, ‘আমি একেবারেই হতদরিদ্র মানুষ। ছেলেটি তার নিজের চেষ্টায়ই এটুক পর্যন্ত এসেছে। লোকে বলে- ‘আমার ঘরে না কি চাঁদ ওঠেছে।’
তপন সরকার রাজ বললো, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’এর অধীনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষাকে যদি একশ’ ভাগেরও বেশি স্বচ্চ বলা যায়, আমি সেটিই বলতাম। এভাবে স্বচ্চ না হলে আমার মতো সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কারো চাকুরি হতো না। আমি খুবই খুশি। আমি নিজের নয়, দেশের ও মানুষের হতে চাই।’
কেবল তপন সরকার রাজ নয়। হাওরের আরোও অনেক তারকা শিক্ষা সগ্রামীরা ৩৮ তম বিসিএস’এ উত্তীর্ণ হয়েছে। হাওরপাড়ের মধ্যনগর বাজারের কৃষক মতিউর রহমান এবং গৃহিনী বেগম রোকেয়ার ছেলে মো. সায়িদুল ইসলাম সায়িদেরও প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি হয়েছে। সায়িদ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। ৬ ভাই বোনের মধ্যে পঞ্চম সায়িদ আর্থিক অস্বচ্ছলতার মধ্যেই বড় হয়েছেন।
পুলিশ ক্যাডারে (সহকারি পুলিশ সুপার) চাকরি হয়েছে সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়া’র মানবেন্দ্র সরকার’এর। মানবেন্দ্র সরকারের বাবা মুকুল কান্তি সরকার সুনামগঞ্জ কালেক্টরেট’এর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, মা গৃহিনী। মানবেন্দ্র শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিবিএ অনার্স সম্পন্ন করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
মুকুল কান্তি সরকার বললেন, আমার দুই ছেলের এক ছেলে এমবিবিএস পাস করে এখন ইন্টার্নি চিকিৎসক। বড় মেয়ে ৩৬ তম বিসিএস’এ উত্তীর্ণ কৃষি ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি হয়েছে। ছোট মেয়ে মনিকা সরকার সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। এরা সকলেই নিজের পড়াশুনার খরচের টাকা নিজেরাই টিউশনি করে উপার্জন করেছে। তাদের উপার্জনের টাকায় সংসার খরচও হয়েছে।
একইভাবে মধ্যনগরের ঘাষি গ্রামের ডলি রানী সরকারও সংগ্রামী তারকা শিক্ষার্থীদের আরেকজন। ডলি’র কৃষক বাবা রাজকুমার সরকার মন্টু ও গৃহিণী মা সুনীতি রানী সরকার’এর জন্য ৬ মেয়ে ও এক ছেলের খাবার যোগান দেওয়াই ছিল কষ্টের।
ডলিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা অবস্থায়ই টিউশনি করতে হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে রসায়ন বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা দেবার বছরেও ৫-৬ টি টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারের খরচও চালাতে অর্থ পাঠাতে হয়েছে এই শিক্ষা সংগ্রমাীকে। চার মাস আগে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রতন কুমার পালের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ডলি’র।
শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হওয়া আরেক শিক্ষা সংগ্রামী রাজিব তালুকদারও চাকরি ও টিউশনি করেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পদার্থ বিদ্যা বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন। রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রে চাকুরিরত এই শিক্ষা সংগ্রামী জানালেন, তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক রাসেন্দ্র তালুকদার ও মা সন্ধা রানী তালুকদার ধর্মপাশা উপজেলার ঢুলপসি’র গ্রামের বাড়িতেই থাকেন।
এছাড়া হাওরপাড়ের জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি প্রধান শিক্ষক বিবেকানন্দ তালুকদার ও আভা রানী তালুকদারের ছেলে প্রকৌশলী অনিন্দ অভি’র সড়ক ও জনপথ বিভাগে এবং একই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষক রেজাউল আম্বিয়া ও স্কুল শিক্ষিকা হামিদা খাতুনের মেয়ে সুলতানা নাসরিন সুমির চাকরি হয়েছে শিক্ষা ক্যাডারে।
বিসিএস উত্তীর্ণ এসব শিক্ষার্থীরা হাওরপাড়ের স্বপ্নবিজয়ী শিক্ষা সংগ্রামী। এরা মনে করেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি’র) স্বচ্চতা ও দক্ষতার কারণেই এই করোনাকালেও পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিক্ষার্থী হিসাবেও তারা এসব পদে চাকরি পেয়েছেন।

  • [১]