- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরাঞ্চলের কৃষক আন্দোলন বিস্মৃতপ্রায় নেতাদের নিয়ে যৎকিঞ্চিত

শামস শামীম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই বাংলার কৃষককে প্রথম শ্রেণির লোক আখ্যায়িত করেছিলেন। নোবেল প্রাইজের টাকায় বাংলায় কৃষিব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাও কবি। ঔপনিবেশিক পরিবেশে অবস্থান করে সংগ্রামী কৃষকদের সম্ভাবনার পুরোটাই অনুধাবন করে কবি কৃষকের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। শিল্পী এসএম সুলতান নির্যাতিত কৃষকদের সাহসী ও সংগ্রামী হিসেবে পটে ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর আঁকা বাংলার কৃষকদের পেশিবহুল ছবিগুলো এখনো কৃষকদের প্রেরণা দেয়। সুলতানের আঁকা কৃষকের ছবিতে দেখতে পাওয়া যায় বাংলার কৃষক মালকুচা দিয়ে কৃষিকাজে ব্যস্ত। কিষাণ বধুটিও আঁচল কোমরে গুঁজে কাজে নিবিষ্ট। দু’জনের এমন টানটান পেশিবহুল ছবিতে তিনি কৃষকদের সংগ্রাম আর সাহসকেই চিত্রিত করতেন। বাংলার ইতিহাস কৃষকের ইতিহাসÑসংগ্রামেরই ইতিহাস বলে মূর্ত হতো তাঁর ছবিতে।
ঔপনিবেশিক প্রভুদের দৃষ্টিতে বাংলার লড়াকু কৃষকরাই ছিলেন তাদের প্রধান শত্রু। ওই সময়ে এ উপমহাদেশের মানুষের কৃষিই ছিল অন্যতম প্রধানতম পেশা। তখন রাজনীতি আবর্তিত হতো জমিদার-মহাজনদের সঙ্গে কৃষকদের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব নিয়ে। তাই ঔপনিবেশিক কালের রাজনৈতিক আন্দোলনে কৃষকদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ছিল কালিক বাস্তবতা। বিশেষ করে ওয়াহাবী, ফরায়েজি, খেলাফতসহ নানা আন্দোলনে নিজেদের মুক্তির কথা ভেবেই মুসলিম কৃষকরা আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন। নরোম মনের ধর্মভীরু কৃষকরা বরাবরই নিয়তিবাদে বিশ্বাসী। যার ফলে স্বার্থান্ধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা সহজেই কৃষকদেরকে তাদের আন্দোলনে যুক্ত করতে পেরেছিলেন, যে আন্দোলনে কৃষকদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তির ষ্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। নিত্য সংগ্রামী কৃষক সব সময় বেঁচে থাকাতেই কেবল সন্তুষ্ট থাকে না, কৃষিতে নিরন্তর ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত রাখে নিজেকে। এই দেশের কৃষি-সংস্কৃতিকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে কৃষকরা, এখন পর্যন্ত। কৃষক লড়াই করে হেরেছে, আবার লড়াই করে জিতেছেও। শেষ পর্যন্ত কৃষক সম্পূর্ণ পরাজিত হয়নি। এই অঞ্চলের নানকার আন্দোলন তো ক্ষমতাসীনের গদি কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া টঙ্ক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন বাংলার কৃষি আন্দোলনের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
বাংলার কৃষক প্রতারক রাজনৈতিক গূঢ়ার্থ না বুঝে নিজেদের স্বার্থসুবিধা লাভের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী অধিকাংশ কৃষকের জীবন যেমন সহজ-সরল, তেমনি কায়েমি স্বার্থান্ধদের রাজনৈতিক কূটচাল বুঝে উঠতে স্বভাবত অপারগ ছিলেন। তাই বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা কৃষকদের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলেন। পলাশীযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে উপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষাকল্পে এ দেশে একটি শক্তিশালী ভূস্বামীগোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়েছিল। যারা ছিল কৃষির বৈপ্লবিক বিকাশের অন্তরায়। অল্পদিনের মধ্যেই কৃষকরা এই গোষ্ঠীর অত্যাচারে নিঃস্ব হতে থাকেন। ওই সময়ে বেশ কিছু কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠলেও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারেনি।
দুই.
ইতিহাসের গলিতে ঢুঁ মারলে আমাদের এই হাওর-ভাটির অনেক কৃষক নেতার কৃষক আন্দোলনের বলিষ্ট ভূমিকার সন্ধান মিলে। পাহাড়-অরণ্যে পোকামাকড়ের সঙ্গে ঘরগেরস্থি করেই তো শহিদ হয়েছিলেন এই অঞ্চলের কৃষি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক কমরেড রবি দাম। বড়িঘর ছেড়ে, পাহাড়ি খানাখন্দে বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের কামড় খেয়ে মাটি কামড়ে কৃষক সংগঠন করেছেন। শেষতক কৃষকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন করেই শহিদ হয়েছিলেন। আপোস করেননি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে।
ঔপনিবেশিক কালপর্বের আন্দোলন সংগ্রামের বৈপ্লবিক ঐতিহ্যের অধিকারী কৃষক নেতাদের আমরা বিস্মৃত হয়ে এখন কৃষিবিনাশী গোষ্ঠীর সঙ্গেই আঁতাত করছি। অথচ আমাদের অতীত ছিল কৃষক আন্দোলনে উত্তাল ও প্রোজ্জ্বল এক ঐতিহাসিক কালখ-। কৃষক আন্দোলন গড়তে আমরা এখন সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং আন্দোলনের মাঠ থেকে পলায়নপর। নামসর্বস্ব কৃষক সংগঠনগুলো রাখে না সংগ্রামী ঐতিহ্যের খবর। বরং কৃষকদের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা কৃষক নেতৃত্বের প্রতিনিধির ছদ্মাবরণে পকেটভারিই করছে না, খ্যাতিও কুড়াচ্ছে। তাই প্রতি বছরই এই অঞ্চলের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বোরোচাষ কালক্রমে হয়ে পড়ছে কৃষকের গলার ফাঁসদড়ি। একদিকে কৃষকের নরোম গলায় সেই ফাঁসদড়ির গিঁট যতোটা আঁটো হচ্ছে, অন্যদিকে বৈচিত্রময় কৃষি-অর্থনীতি ততোটাই করপোরেট অর্থনীতির পুকুরে ডুবে যাচ্ছে।
তিন::
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্ব দুয়ারে কড়া নাড়ছে। ঠিক এর আগে আগেই বাংলার কৃষক নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ১৯৩৯ সাল (১৩৪৬ বাংলা)। হালের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জমিদার গোষ্ঠীর অত্যাচারে তটস্থ ওই এলাকার কৃষক। জমি এবং ফসলের নিশ্চয়তা ছিল না তাদের। নিত্য-নতুন খাজনা, কর বৃদ্ধিতে অসহায় কৃষকদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। হাওর-ভাটির ইতিহাসে এই পরিবারই প্রথমে কৃষি জমিকে মাছচাষের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের প্রথম অবৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে এক ফসলের উপর নির্ভরশীল এলাকার কৃষকের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কৃষি ব্যবস্থায় নতুন সংকট দেখা দেয়। মওসুমের শুরুতে সেচ সংকটের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন কৃষক। জমিদারদের কৃষিবিনাশী আগ্রাসন ও বাণিজ্যের প্রতিবাদে সিনা চিতিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন নির্যাতিত কৃষক। ফলে নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। কৃষক নির্যাতনের এই খবরটি তখন রাজস্ব মন্ত্রীর কানে পৌঁছে যায়। মন্ত্রী কৃষকদের অভিযোগটি অবগত হওয়ার পর কমিশনার পাঠিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
ওই সময় কৃষক নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বেপরোয়া জমিদার ও তাদের লাঠিয়াল বাহিনী শাদা কাগজে টিপসই নিয়ে জাল দলিলে জমি দখল, বাড়িতে কোর্ট বসিয়ে অন্যায্য বিচার, কোর্ট ফি’র নামে টাকা আদায়, জরিমানার টাকা আদায়, চৌকির নিচে প্রজাকে বেঁধে নির্যাতন, খাজনা আদায়ের নামে প্রজার গরু কেড়ে নেওয়া, চাষের জমি বিলে পরিণত করা, জোর করে মুসলমান কৃষকদের তাদের স্ত্রীকে তালাক দানে বাধ্য করাসহ নানা কিসিমের নির্যাতন শুরু করেছিল। জমিদার গোষ্ঠীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কৃষকরা সরকারের কাছে বিচারপ্রার্থী হলে হাওরের বোরো ফসল কাটার সময়ে জমিদাররা কৃষকদের উপর মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আদালত জমিদারদের পক্ষে রায় দেয়। কৃষি জমিতে ফসল কর্তনের উপর ১৪৪ ধারা জারি করেন আদালত। কৃষক নির্যাতনের এই খবর তখন পৌঁছে যায় কৃষকবন্ধু করুণাসিন্ধু রায়ের কানে। এই কৃষক নেতা প্রশাসনের ১৪৪ ধারা অমান্য করে নিজেই কাস্তে নিয়ে হাওরে ধান কাটতে নামেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এই অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের আরেক সাহসী পুরুষ কমরেড রবি দাম। তাদের দেখা-দেখি কৃষকদের মিছিল নামে হাওরে। জমিদাররা এ ঘটনা দেখে পুলিশের শরণাপন্ন হয়।
১৯৩৯ সালের ২৪ এপ্রিল করুণাসিন্ধু রায়কে হাওরের বোরো ক্ষেত থেকে ধান কাটা অবস্থায় গ্রেফতার করে পুলিশ। কৃষকের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে তাঁর সঙ্গে গ্রেফতার হন কমরেড রবি দাম, দেবেন দত্তসহ ৮ কৃষক নেতা। ওই বছর জমিদারদের কারণে হাওরের পাকা ধান পচে বিনষ্ট হলেও কৃষকদের কাটতে দেয়নি প্রশাসন। চরম নিদান দেখা দেয় কৃষকের ঘরে ঘরে।
১৯৩৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তৎকালীন মন্ত্রী মুনাওয়ার আলী, কৃষিমন্ত্রী এবং এমএলএ মকবুল হোসেন চৌধুরী তাহিরপুরে সফরে এলে এই অঞ্চলের কৃষকরা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে করুণা সিন্ধু রায়ের ‘শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইন’ পাশের দাবি জানায়। পাশাপাশি তাঁরা এই আইনকে সমর্থন জানিয়ে লীগপন্থী ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য মন্ত্রীরও পদত্যাগ দাবি করে। আইন পাশের দাবিতে ১৯৩৮ সালে সিলেটের সর্বত্র ‘কৃষাণ দিবস’ স্বতস্ফুর্তভাবে পালিত হয়েছিল। এমএলএ-এমএনএদের নেত্বাধীন জমিদার গোষ্ঠী করুণা সিন্ধু রায়ের কৃষকহিতৈষী শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইন এর বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাঁকে মারার জন্য পর্যন্ত গু-া ভাড়াটে করেছিল বলেও জানা যায়।
বাংলার কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বের কৃষি আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক ঘটনার জন্ম দেন এই অঞ্চলেরই নির্যাতিত কৃষক ও তাদের পক্ষের রাজনৈতিক কিছু নেতা। ১৯৩৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইন পাশের দাবিতে কৃষকরা লালঝা-া নিয়ে বিশাল জমায়েত করেছিলেন। আইনসভায় ‘শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইন’ বিল আটকানোর প্রতিবাদে এবং পাশের দাবিতে সর্বভারতীয় কিষাণসভার ডাকে এক অভূতপূর্ব ‘সিলেটে কিষাণ দিবস’ পালিত হয়। ওই সভায় শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইনকে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন জানানো হয়। সভায় একই দাবিতে সিদ্ধান্ত হয় আসাম আইনসভা ৫ সেপ্টেম্বর ঘেরাও করা হবে। সমাবেশের এই খবর ছড়িয়ে পড়ে অবহেলিত কৃষক সমাজে। ব্যাপক সাড়া পড়ে। তাদের চিত্তে আগুন, কণ্ঠে সমুদ্রের গর্জন। ক্ষুব্ধ ও নির্যাতিত কৃষকরা আসাম আইনসভা ঘেরাওয়ের প্রস্তুতি নেন। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দ্রোহ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কৃষকরা আইনসভা ঘেরাওয়ের খবরে উজ্জীবিত হন। ‘চলো চলো আসাম চলো’ ‘কৃষক রাজ্য কায়েম করো’ ‘প্রজাদের ভূমি অধিকার দিতে হবে’ স্লোগানে দুর্গম পাহাড়, বুনো জন্তুর ভয় মাড়িয়ে তারা রওয়ানা দিয়েছিলেন। দুর্গম আঁকাবাঁকা পথ পায়ে হেঁটে হাজার হাজার কৃষক শিলং শহরে গিয়ে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলার কৃষি আন্দোলনের ইতিহাসে অবিষ্মরণীয় ঘটনার জন্ম দেন। শত মাইল দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে শিলং গিয়ে ক্লান্ত কৃষকের মনোবল অটুট ছিল, দাবি আদায়ের আন্দোলনে তারা ছিল পাহাড়ের মতো অনড়। ঘেরাও কর্মসূচি ব্যাহত করার দূরভিসন্ধি নিয়ে আইনসভার জমিদার সদস্যদের নির্দেশে ঘেরাওয়ের আগের দিন সিলেট-শিলং পথে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন মালিকরা। এই আইনের বিরোধিতাকারী জমিদার এমএলএ-মন্ত্রীরা কৃষকরা যাতে শিলং না পৌঁছতে পারে সবধরনের অপতৎপরতা চালিয়েছিল। সুনামগঞ্জের সিচনীর (হালের দক্ষিণ সুনামগঞ্জের একটি গ্রাম) কমরেড রবি দাম, মধ্যনগরের সদ্যপ্রয়াত কৃষক নেতা লালমোহন রায়, কৃষক নেতা নিবারণ দত্ত, লালা শরদিন্দু দে, রোহিনী দাস, দেবেন শ্যামসহ কৃষক নেতারা এই অঞ্চলের কৃষকদের লাল ঝা-ার মিছিলে অগ্রনায়ক ছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর শ্রীহট্টের কৃষক নেতাদের একটি অংশ সাধারণ কৃষকদের নিয়ে ছাতক- ভোলাগঞ্জ এবং ডাউকি হয়ে শিলং রওয়ানা দিয়েছিলেন। ৫ সেপ্টেম্বর শিলংয়ে গিয়ে আইনসভা ঘেরাও করে বড় বাজারে সমাবেশ করে ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। শিলং শহর কৃষকের শহরে পরিণত হয়। লাল ঝা-ায় ঢাকা পড়ে মেঘালয়ের আকাশ। ঘেরাওকৃত আইনসভার নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য (এমএলএ) সভা থেকে উঠে এসে আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। শিলং আইনসভা ঘেরাওয়ের এই কৃষক সমাবেশ মুসলিম লীগ সরকারের পতনে বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। সভায় করুণা সিন্ধু রায়ের প্রস্তাবিত ‘শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ত সংশোধনী আইন’ এর প্রশংসা করে অবিলম্বে পাশের দাবি জানিয়েছিলেন কৃষকরা। ওই সময় এ প্রস্তাবকে কৃষকের মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন কৃষক নেতারা।
কৃষক আন্দোলনের একনিষ্ট কর্মী হিসেবে সদ্যপ্রয়াত মধ্যনগরের ইটাউড়ি গ্রামের লালমোহন রায়ও কিংবদন্তিতুল্য ঐতিহাসিক চরিত্র। কৈশোর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কৃষকের পক্ষেই ছিলো তার সাহসী অবস্থান ও ভূমিকা। তাদের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে হুলিয়া মাথায় ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে দিনাতিপাত করেছেন। হুলিয়া মাথায় নিয়ে পরিচয় গোপন করে ভিন্ননামে কাজ করেছেন। কমরেড প্রসূন কান্তি রায়ও (বরুণ রায়) কৃষকহিতৈষী পিতার মতো জীবনের বেশিরভাগ সময় কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ষাটের দশকে হুলিয়া মাথায় নিয়ে কৃষকজনারণ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আত্মগোপনের সময় হাওরাঞ্চলের কৃষকরাই তাঁকে আশ্রয় দিয়ে আগলে রেখেছিলো। সারা জীবন অবহেলিত কৃষক সমাজের পক্ষেই কথা বলে গেছেন বরুণ রায়, রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, এক মুহূর্তের জন্য। লালা শরদিন্দু দে, চন্দ্র বিনোদ দাস, যতীন্দ্র দাস, বিপিনচন্দ্র দাস, রোহিনী দাস, বেণুবিনোদ চৌধুরী, দীনেশ চৌধুরীরসহ নাম না জানা ও এই অঞ্চলের অসংখ্য হিন্দু-মুসলিম কৃষক নেতা এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন।
চার::
হাওরাঞ্চলের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের সংগ্রামী এইসব নেতারা এখন বিস্মৃতপ্রায়। শুধু নতুন প্রজন্মই নয় কোন প্রজন্মই ভালোভাবে তাদের ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস জানে না। অথচ তাদের দেখানো পথে হেঁটে হেঁটে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার সুযোগ ছিল। উত্তরসূরিরা সেই ঐতিহ্য ভুলে এখন বিভ্রান্তির অতলে ডুবে আছে।
আজকের মুক্তবাজার অর্থনীতির আবহে গড়ে ওঠা হাইটেক প্রযুক্তিসম্পন্ন বিশ্বের পরিসরে বড়সড়ো আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই চূড়ান্ত রূপ নিতে দেখা যায়। বাংলাদেশের গণজাগরণ মঞ্চ, আরব বসন্ত এসবেরই জ্বলন্ত প্রমাণ। যদিও আরব বসন্ত প্রশ্নহীন নয়। আজকের সময়ে সহজেই কৃষিবিনাশী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জমায়েত এবং প্রতিবাদের নানা সুযোগ ছিল। প্রযুক্তি কৃষকদেরও সম্পৃক্ত করেছে। গণমাধ্যমে কৃষককে সেভাবেই উপস্থাপন করছে। তবে সেই উপস্থাপনটার ধরণ পুরোটাই বাণিজ্যিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রাযুক্তিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবাদ করা ও প্রতিরোধ কর্মসূচি গ্রহণে আমাদের আয়েশি নেতারা ব্যর্থ হয়েছেন। যদিও তাদের বেশিরভাগই অকামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় ব্যয় করছেন।
প্রায় আট দশক আগে অবহেলিত কৃষকের পক্ষে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আইনসভা ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানানোর প্রোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের ছিল। কমরেড অজয় ভট্টাচার্য্য ‘নানকার বিদ্রোহ’ গ্রন্থে ওই কৃষক অভিযানকে সিলেটের কৃষক আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারক বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি এই আন্দোলনকে কৃষিসংস্কার ও কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উত্তরণে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানসম্মত আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসবিদরা বিবেচনা করেন। তৎকালীন ‘জাগরণ’ পত্রিকায় ওই কৃষক আন্দোলনের জ্বলজ্বলে বর্ণনা রয়েছে, যা নিয়ে ভবিষ্যত গবেষকরা কাজ করতে পারেন।
ইতিহাসের এসব ঘটনায় আমাদের শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। আমরা কেবল বেমালুম ইতিহাসবিস্মৃতই হইনি, কৃষকদের জন্য আমাদের করণীয়টুকুও ভুলে গেছি। মাঝে-মধ্যে আমাদের কৃষক নেতাদেরকে কৃষিশত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পক্ষে দাঁড়ানো তো দূরের কথা তাদের সান্তনা দেওয়ার কথাও আমরা ভাবতে পারি না। আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও নির্লিপ্ত। জনশ্রুতি রয়েছে অবৈধ বাড়তি উপার্জনের স্বার্থে হাওরের বাঁধরক্ষার বরাদ্দ নিজের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বা পছন্দের পিআইসিকে পাইয়ে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে কসুর করেন না। সংসদে কৃষকের দুর্দশার কথা বলা তো দূরের কথা এ বিষয়টি চেপে যেতে পারলে তারা বাঁচেন। বাস্তবে সামন্ত কৃষিব্যবস্থা বিরাজ না থাকলেও এখনকার জনপ্রতিনিধিরা আদতে কৃষিতে স্বীয় শ্রেণিস্বার্থ উদ্ধারে সহায়ক সামন্ত ব্যবস্থার অনুরূপ একটি ব্যবস্থা জিইয়ে রেখেছেন। কৃষকের উন্নয়ন ও ফসলরক্ষার বরাদ্দ উপনিবেশিককালের সামন্তপ্রভুদের মতই তারা ভোগ করেন। এমতাবস্থায় দিনকে দিন আর্থসামাজিক সকলপ্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। তাদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বর্তমানে হাওরের কৃষিব্যবস্থা।
কৃষি বিনাশী সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিসরে বীজ, সার, সেচ সংকটের মধ্যেও সংগ্রামী কৃষকরা হাল ছাড়েননি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের প্রাদুর্ভাবে দুর্গত কৃষকের কষ্টের ফসল শেষ পর্যন্ত গোলায় ওঠবে কি না সেই নিশ্চয়তা এখন আর নেই। আহার জোগানোর জৈবিক তাড়নায় কৃষক ফসল ফলায় আর কৃষকের এই কাজই হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চিরায়ত কৃষি ব্যবস্থাকেও টিকিয়ে রাখে।
তথ্যসূত্র: নানকার বিদ্রোহ, কমরেড অজয় ভট্টাচার্য্য।
সংগ্রামী স্মৃতির মোহনায়: দীপঙ্কর মোহান্ত
বরুণ রায়: প্রণতি চক্রবর্তী
বরুণ রায়ের শেষ স্বাক্ষাৎকার: পার্থ সারথী দাশ ও শামস শামীম
লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

  • [১]