বিশেষ প্রতিনিধি
শহরের সোমপাড়ার রুমেনা আক্তার ৫ কেজি চাল ৭৫ টাকায় নিয়ে বাড়ী ফিরছিলেন। ক্রয় কেন্দ্রের কাছে গিয়ে রুমেনাকে অনুরোধ করে তাঁর চালের ব্যাগটি মেশিনে তুলে ওজন করে দেখা গেল ৪০০ গ্রাম চাল কম। পাল্লা দিয়ে চাল যিনি দিচ্ছিলেন, তাঁর কাছে (শাহীন তেঘরিয়া) এই বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি এ প্রতিবেদকের হাতে ধরে অনুরোধ করে বললেন,‘আর এটি করবো না ভাই, মাপ করে দেন’। সোমবার সকাল ১১ টায় শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকার ন্যায্য মূল্যের চালের দোকানের দৃশ্য এটি। এই দোকানে কমপক্ষে ২০০ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ ঘটনা জানার পর কয়েকজন দরিদ্র কৃষক এগিয়ে এসে বললেন,‘সকাল থেকেই ওজনে এমন অনিয়ম হচ্ছে’।
এই ন্যায্য মূল্যের কেন্দ্রে দাঁড়ানো কয়েকজন কৃষক বলছিলেন ‘লাইনো উবাইতে (দাঁড়াতে) শরম লাগের (লজ্জ্বা হচ্ছে), পেটের খিদায় (ক্ষুধা) তো কোনতা মানে না ভাই’।
জলিলপুর গ্রামের কৃষক রুস্তুম আলী বললেন,‘৫ কেয়ার জমিন করছিলাম, সবই পানির নীচে গেছে, না হয় এখন কিছু ধান কাটতে পারতাম, চাল নেবার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হতো না’।
শহরতলির বাহাদুরপুরের তাজ উদ্দিন বলেন,‘১৯ বিঘা জমিন করছিলাম, হাওরে ঠিকমত বান্দ (বাঁধ) অইলে, এখন কিছু কাটা-মাড়া লাগলো নে, খাওয়ার চাউল অইগেলনে। ১১ জনের সংসার কেমনে চলি, লজ্জ্বা ছাইড়া আইয়া লাইনো দাঁড়াইছি।’
এই কেন্দ্রের চালের ডিলার জাহাঙ্গীর আলম ওজনে কম দেওয়া প্রসঙ্গে বললেন,‘পাল্লা দিয়ে তাড়াহুড়া করে চাল দেওয়ায় ওজনে কম হয়েছে। আর পাল্লা দিয়ে চাল দেওয়া হবে না। মেশিন দিয়ে ওজন করে চাল-আটা বিক্রয় হবে। সকলকে ধৈর্য ধরে দাঁড়াতে হবে।’
সকাল সাড়ে ১১ টায় সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ময়নার পয়েন্টের ন্যায্য মূল্যের দোকানে গিয়েও জানা গেল, সকালে যারা চাল নিয়েছেন ৫ কেজি চালে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম চাল কম পেয়েছেন। পরে অভিযোগ করায় অবশ্য ঠিক করে মেপে দেওয়া হচ্ছে।
এই কেন্দ্রে দাঁড়ানো নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সাকিল আহমদকে দেখা গেলো চাল কিনে নেবার সময় কয়েক জনের চাল পাশের একটি দোকানের মেশিনে ওজন করাচ্ছেন এবং চালের ওজনও ঠিক পাওয়া যাচ্ছে।
হাওর বাঁচাও-সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা, জেলা সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এনাম আহমদ বলেন,‘দুর্যোগ নিয়ে অনেক স্থানেই ব্যবসা শুরু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ন্যায্য মূল্যের চাল-আটা দেওয়া শুরু করলেও ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে বলে সোমবার সকালে মুঠোফোনে আমাদেরকেও জানিয়েছেন কৃষকরা।’
হাওর বাঁচাও-সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন,‘ন্যায্য মূল্যের চাল দেবার সময় ওজনে কম দেওয়া, চাল দরিদ্র কৃষকদের না দিয়ে দোকানীদের কাছে কালো বাজারে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ অতীতেও ছিল, এবারও ন্যায্যমূল্যের চাল বিক্রি’র শুরুতেই কথা ওঠছে। এমন অনিয়ম কঠোরভাবে ঠেকাতে হবে।’
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘জেলার ৪ পৌরসভায় ৯ টি করে ৩৬ টি এবং ১১ উপজেলায় ৩ টি করে ৩৩ টি ন্যায্যমূল্যের পয়েন্টে চাল-আটা বিক্রয় শুরু হয়েছে। এবার ন্যায্যমূল্যের চাল-আটা বিক্রয়ে অনিয়ম হলে জিরো টলারেন্সে থাকবো আমরা। আজ সোমবার সকালে শহরতলির গৌরারং ইউনিয়নের টুকেরবাজারের একটি ন্যায্যমূল্যের দোকানের কাঠের ডান্ডির পাল্লা ভেঙে দিয়েছি আমি। বলেছি ওজনের মেশিন অথবা নিক্তি আনতে হবে। প্রত্যেক উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শহরে চাল বিক্রয়ের পয়েন্ট ভাগ করে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’