- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি

ধর্মপাশায় গত এক বছরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার ৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের কেউ অসাবধানবসত বিদ্যুতের তারে জড়িয়েছেন আবার কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছেন পল্লীবিদ্যুতের তার বা সংযোগে ত্রুটি থাকার কারণে। নেত্রকোনা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি তাঁদের কাজে কোনো ত্রুটি বা কাজে অনিয়ম অথবা গাফিলতি হয়েছে বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। তাঁরা লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করে সেই তদন্ত কমিটিকে দিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত  তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে এর দায় এড়াতে চাইলেন।  
গত ২৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে আটটায় মধ্যনগর থানার চামরদানি ইউনিয়নের রামদিঘা গ্রামে পল্লীবিদ্যুতের খুঁটি থেকে তার ছিড়ে মাটিতে পড়ে বিদ্যুতায়িত সেই তারে জড়িয়ে জগদীশ সরকার (৭৫), ছেলে রণজিৎ সরকার (৪৫), পুত্রবধু রিতা সরকার (৩৫) ও রাকেশ দাসের মেয়ে সোনালী দাস (১০) নিহত হন।
গত ২৩ জানুয়ারি মধ্যনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিস সংলগ্ন একটি পরিত্যাক্ত ভবনের ছাদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে রাজু লাল (২২) ও স্বপ্না লাল নামের দুই চাচা ভাতিজির মৃত্যু হয়। ওইদিন বিকেলে ভোলা লালের মেয়ে স্বপ্না লাল পরিত্যাক্ত ভবনের ছাদে গাছের শুকনো ডাল কুড়াতে গিয়ে ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে পড়ে। স্বপ্নাকে উদ্ধার করতে তার চাচা রাজু ছুটে এলে রাজুও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। নিহত রাজু হিরালালের ছেলে।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের লালফর মিয়ার ছেলে মানিক মিয়া (২৮) অটো রিকশায় চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হন।
এর আগে একই বছরের ২ মে উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নের আহম্মদপুর গ্রামের মৃত আ. সামাদের পুত্র পুলিশ কনস্টেবল আ. রহমান (২২) বাড়িতে বেড়াতে এসে নিজের বসত ঘরের উপরে থাকা পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।
মধ্যনগরে পরিত্যাক্ত ভবনের ছাদে গাছের ডাল কুড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই চাচা-ভাতিজির মৃত্যু ও রাজনগর গ্রামে অটোরিকশা চার্জ গিয়ে একজন এবং আহম্মদপুর গ্রামে টিনের ঘরের চালে উঠে পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিহত ব্যক্তিদের অজ্ঞতা ও  অসাবধানতাকে দায়ী করা যায়। কিন্তু রামদিঘায় পল্লীবিদ্যুতের তার ছিড়ে চারজনের মৃত্যুকে আমি একটি দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে পারি না। ঘটনার দিন দুপুরে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা সবাই নিতান্ত গরীব। তাঁরা রক্তে মাংসে গড়া মানুষ হলেও আশপাশের সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের কাছে ত্রাা সাধারণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ‘দরিদ্র’ শব্দটিকে সামনে এনে তাঁদের সাথে মজা করা হয়েছে মাত্র। ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ সৎকার করতে হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় এক সাবেক চেয়ারম্যান ও থানা পুলিশ বিশেষ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।
নেত্রকোনা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি এ ঘটনা তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু সেই তদন্ত কমিটিও নিজেদের সাফাই গাইলেন। রামদিঘায় বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ দেওয়ার কাজে কোনো ত্রুটি ছিল না। দুই তারে ঘষা লেগে নাকি বিদ্যুতের তার ছিড়ে যায়। যদি দুই তারে ঘষাঘষি হয় তাহলেও কি বলব কোনো ত্রুটি ছিল না? কাজ সুষ্ঠুভাবে হলে কি দুই তার এক সাথে ঘষাঘষি খেলা খেলে? পল্লীবিদ্যুতের এমন উদ্ভট জবাব আমার ছোট মাথায় ঢুকে না।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন তিনি ঢাকা থেকে এসে রাঘদিঘায় নিহত ব্যক্তিদের সুবিচার পাইয়ে দিতে ও পল্লীবিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার সাথে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে জনস্বার্থে মামলা করবেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে তিনি মামলাটি কখন করবেন? তিনি যতক্ষণে মামলা করবেন (সত্যিই করবেন কি না কে জানে?) ততক্ষণে হয়ত বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে।
আমরা যারা সমাজে সুশীল বলে দাবি করি তারা অনেকেই নিজেদের সুবিধামত একটি বিশেষ পক্ষকে বাঁচাতে চেষ্টা করি। আমরা পক্ষ বিশিষ্ট জাতিতে পরিণত হচ্ছি। পক্ষ না নিলে ভাল লাগে না। তবে সেই পক্ষটা অবশ্যই সবলের পক্ষে হতে হবে। দূর্বলের পক্ষ নিয়ে কোনো লাভ নেই।
মুরুব্বীদের মুখে শুনেছি আগেকার দিনে সালিশ বৈঠকে যারা বিচারক হিসেবে থাকতেন তারাও যে কোনো একটা পক্ষে কাজ করতেন। এমনকি তাঁরা বিচারের রায় কার পক্ষে যাবে তাও আগে থেকেই ঠিক করে যেতেন। বিচারের রায়টা অবশ্যই সবলের পক্ষেই যেতো (সব বিচারই এমন হত তা বলা ঠিক না।)   কয়েক বছর আগের কথা। আমার এক বন্ধুর (সঙ্গত কারণেই নাম প্রকাশ করছি না) বাড়িতে তাঁদের জমি সংক্রান্ত বিষয়ে এক সালিশ বৈঠক হয়েছিল। সেই সালিশ শুরু হওয়ার আগে মাতব্বরেরা বন্ধুর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সালিশের শেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন রাত নয়টার মত বাজে। আমরা (বন্ধুসহ আরো কয়েকজন) ওই সড়কেই অবস্থান করছিলাম। মাতব্বরেরা যখন এ সিন্ধান্ত নিলেন তখন অন্ধকারে তাঁরা আমাদের দেখতে পায়নি। সালিশ শুরু হওয়ার পর মাতব্বরেরা তাঁদের সিন্ধান্ত অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের সিন্ধান্ত ঠিক রাখতে পারেনি। আগে থেকে আমরা এমনটি না জানতে পারলে হয়ত ওইদিনও এমনটি হত।
যাহোক, যুগ যুগ ধরে আমরা সবলের পক্ষ নিতে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দূর্বলের পক্ষে পক্ষ নেওয়া ভুলে গেছি। এই অভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে আমরা এ অভ্যাসের দাসে পরিণত হয়েছি। এতে একদিকে যেমন ছোটবেলায় আমরা মানুষ হওয়ার নামে পাঠ্য বইয়ে যে সকল নীতিবাক্য শিখেছি অন্যদিকে বড় হয়ে সেই নীতি বাক্য ভুলে গিয়ে অমানুষে পরিণত হয়েছি।
‘মানুষ মানুষের জন্য’- ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গান আমরা নিজেকে ভাল মানুষ সাজাতে মন দিয়ে গাইতে ও শুনতে পারি কিন্তু সেই গানের মর্ম কথা আমরা ক’জন উপলব্ধি করতে পারি? সত্যিকার অর্থে মানুষকে মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার পরেও আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। আমাদের সেই চেষ্টায় যথেষ্ট পরিমাণ ব্যর্থতা রয়েছে। এ ব্যর্থতা কারো একার নয়। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র কাউকে এর দায় থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না।
রামদিঘায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পাশে সমাজের সেই সকল ব্যক্তিদের দেখতে পাইনি। যারা সমাজের মাথা বা সুশীল বলে নিজেকে দাবি করেন তাঁরা আজ কোথায়?
সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের আশায় স্থানীয় অনেক সুশীল ব্যক্তি ঢাকায় টাকা উড়াচ্ছেন। অথচ পল্লীবিদ্যুতের গাফিলতির কারণে নিজ ইউনিয়নের চারটি তাজা প্রাণ ঝরে গেলেও নিহতদের পরিবারের পাশে কেউ কি দাঁড়িয়েছেন? আপনারা মনোনয়ন পেয়ে কি ধরনের জনসেবা করবেন তা আমরা বুঝে নিয়েছি। আমরা এটাও বুঝে নিয়েছি যে, হাওরাঞ্চলে পল্লীবিদ্যুতের যে সকল নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে তা নিতান্তই হাওবাসীর সাথে মশকরা করার শামিল।
সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ট। জানি না কবে নাগাদ এমন দুর্ভোগ শেষ হবে? পল্লীবিদ্যুৎ যেখানে আকাশে মেঘ জমলেই লোডশেডিং দিয়ে দেয় আর বলে লাইনে সমস্যা সেখানে প্রখর রৌদ্রে হয়ত বলে উঠবে গরমে তার গলে গেছে তাই বিদ্যুৎ নেই। পল্লীবিদ্যুতের ভেলকিবাজি দিনদিন হাস্যকর হয়ে উঠছে। এটা হার্টের রোগীদের জন্য সুখবরের বিষয়। তাঁরা বিনামূল্যে হাসার সুযোগ পাচ্ছেন। এমন হাস্যকর পরিস্থিতির অবসান কি হবে না?
আধুনিক জীবন বিদ্যুৎ ছাড়া অচল। দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে বিদ্যুৎ নির্ভর কাজ। বিদ্যুৎ আধুনিক সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বতর্মান সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে বদ্ধ পরিকর। সেখানে হাওরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে মিল রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা উচিত। হাওরাঞ্চলে বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে পুরো বর্ষাকাল বিদ্যুৎ লাইন অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। হাওরের বুক চিরে মাইলের পর মাইল বিদ্যুৎ লাইন যে কোনো সময় মারাত্মক প্রাণহানি ঘটাতে পারে। লাইনের নিচ দিয়ে নৌকা, ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করবে হরহামেশাই। না জানি কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে। ওইদিন রামদিঘায় ঘটনাস্থলে নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, হাওরের বুকে পল্লীবিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে তার টানানো হয়েছে। পানি বাড়লে নৌ রুটে কিছু কিছু জায়গায়  যান চলাচল মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এর মানে এই নয় যে, আমি হাওরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার বিরোধিতা করছি। বরং এটা বলার চেষ্টা করছি হাওরাঞ্চলে নৌ যান চলাচল যাতে বিঘিœত না হয় এবং যে কোনো সময় তার ছিড়ে পড়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে যাতে কারো প্রাণহানি না ঘটে তার নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা উচিত।
সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহার করলে যে কারো বিপদ ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাই গ্রাহককে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে।  পাশাপাশি পল্লীবিদ্যুতকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যাতে তার ছিড়ে আর কোনো গ্রামে রামদিঘার মত কোনো মর্মান্তিক দূর্ঘটনা না ঘটে।
লেখক ঃ সাংবাদিক।

  • [১]