বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরাঞ্চল থেকে বোরো ধান কিনতো পারবে তো সরকার? কৃষক সংগঠকরা বলেছেন, সরকারের ধান কেনার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকায় কৃষকরা ধান দেবে না সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে, খাদ্য কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান কিনতে পারবেন তারা।
সুনামগঞ্জে এবার তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। জেলা কৃষি বিভাগের দাবি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে এবার। ধান কাটাও মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭০ ভাগের বেশি শেষ হয়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।
বুধবার সুনামগঞ্জে বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধন করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মন্ত্রী এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। শহরের মল্লিকপুর খাদ্য গোদামে ধান ক্রয়ের উদ্বোধন করেন তিনি। এসময় জানানো হয়েছে, সুনামগঞ্জে এ বছর ২৫ হাজার ৮৭০ মে.টন ধান ক্রয় করবে সরকার।
হাওরে উৎপাদনের তুলনায় সরকারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা একেবারেই কম দাবি করে কৃষক সংগঠকরা বলেছেন, সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে চায় না, এজন্যই মূল্য নির্ধারণের বেলায় বা ধান কেনা কখন শুরু হবে এসব সিদ্ধান্ত নেবার সময় কৃষক কিংবা কৃষকের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন না সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতনেরা।
ধর্মপাশার বাসিন্দা কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, সরকার ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে, এরপরও কিনতে ব্যর্থ হবে খাদ্য বিভাগ, তারা ধানের দাম কেজি প্রতি ১ টাকা বাড়িয়েছে কিন্তু চালের দাম বাড়িয়েছে কেজি প্রতি ৪ টাকা, চাল কিনলে চাতাল বা অটো রাইস মিলের মালিকরা লাভবান হবে, ব্যাংকের পুঁজি রক্ষা হবে। সরকার কৃষক বান্ধব হলে চাতাল মালিকদের চিন্তা না করে মূল্য নির্ধারণের আগে কৃষক বা কৃষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার আয়োজন হতো।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, সারাদেশে একসঙ্গে ধান চাল কেনার চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে। হাওরাঞ্চলে ধান আগে কাটা শুরু হয়, ধান কাটার সময় হারভেস্টার মেশিনে হোক আর শ্রমিক দিয়েই হোক একর প্রতি ৪৫০০ থেকে ৫৫০০ টাকা খরচ করতে হয় কৃষকের, বেশির ভাগ কৃষকের হাতে ওই সময়ে ধান কর্তৃনের খরচের টাকা থাকে না, বাধ্য হয়ে মিল মালিক বা চাতাল মালিকের ফড়িয়ার কাছে ৬০০-৭০০ টাকা মণে খলা (ধান কাটা মাড়াইয়ের স্থান) থেকেই ধান বিক্রি করেছেন কৃষকরা, ফড়িয়ারা বুঝে কৃষককে এই সময়ে ধান বিক্রয় করতেই হবে, এজন্য ওই সময় অঘোষিত সিণ্ডিকেট করেছে ফড়িয়ারা। এই অবস্থা থেকে কৃষককে রক্ষা করতে হলে বৈশাখের শুরুতেই বণ্ড সই (চুক্তিপত্র করে) নিয়ে কৃষকের কাছ থেকে সরকারই ধান কিনতে পারে, এমনটা হতে পারে সরকারের কেনা ধান কৃষকের কাছেই থাকবে, কৃষক ভালো করে শুকিয়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে দেবার উপযোগী করে নিজেরাই পৌঁছে দেবে। তাহলেই কেবল ধান কেনার লক্ষ্য সফল হবে, কৃষকরা উপকৃত হবে।
হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরের আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বললেন, কোন কৃষকই সরকারকে ধান দেবে না। আমাদের আড়তে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার মণ ধান কেনা হচ্ছে। আমরা ২৮ জাতের ধান কিনছি ৯২০ টাকা এবং ২৯ জাতের ধান ৮৭০ থেকে ৮৮০ টাকা মণে কিনছি, কেবল মোটা হীরা ধানের দাম বাজারে কম, হীরা ধান ৭৭০ থেকে ৭৮০ টাকা মণে বিক্রয় হচ্ছে, এই ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে কেউ কেউ, মণে ১০০ টাকা কমে হলেও কৃষকরা সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে আড়তে ধান নিয়ে আসেন। ওখানে শুকনা কম, ময়েশ্চার সমস্যা এসব কথা বলা হয়, ধান দিলে টাকা পাবে তিন দিন পরে, এসব নানা হয়রানির জন্য সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে যাবেন না কৃষক। বৈশাখের প্রথম দিকে হাওরাঞ্চলের ক্রয়কেন্দ্রে ধান কেনা শুরু হলে কৃষকের উপকার হতো, সরকারও ধান কিনতে পারতো।
সুনামগঞ্জে প্রথমদিন (বুধবার) প্রায় ১৫ টন ধান কেনা হয়েছে ৫ কৃষকের কাছ থেকে। এই ৫ কৃষকই দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের খাদ্য কর্মকর্তা দ্বিরাজ নন্দি চৌধুরী বললেন, তারা আশা করছেন এবার লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ধান কিনতে পারবেন। একই ধরনের মন্তব্য করলেন সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য কর্মকর্তা নকিব সাদ সাইফুল ইসলামও।