- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরের অধিকাংশ ভাঙনেই এখনো কাজ শুরু হয় নি

বিশেষ প্রতিনিধি
‘পানি হামাইলে (ঢুকলে) কাইল্লাজুরি পর্যন্ত যায়, বাঁধ বানতে (বাঁধ দিতে) মাস দেড় মাস সময় লাগে, মাঘ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করন লাগে, ইবার অখনো কাজের কোন জোগারযন্ত্রই (প্রস্তুতি) নাই, ফাল্গুন মাসে পানি আইওয় (এসে যায়), কেমনে কি করবো তারা জানি না।’ সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের একেবারে তলানির এলাকা শাল্লার ছায়ার হাওরপাড়ের শান্তিপুর গ্রামের মানিক মিয়া সোমবার দুপুরে এভাবেই তার গ্রামের পাশের গুরুত্বপূর্ণ জোকারবন্দের বাঁধের কাজ শুরু না হবার কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন।
মানিক মিয়ার পাশে দাঁড়ানো এই হাওরপাড়ের ডুমরা গ্রামের বড় কৃষক রণজিৎ কুমার দাস বলছিলেন, ভাটি অঞ্চলের বৃহৎ ছায়ার হাওর সুনামগঞ্জের শাল্লা এবং নেত্রকোণার খালিয়াজুর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই হাওরের তিনটি ক্লোজার (ভাঙন) দিয়ে পানি ঢুকে ফসল হানির আশংকা থাকে প্রতিবছরেই। এগুলো হচ্ছে খালিয়াজুরির মুরাদপুর, শ্যামপুর ও বলরামপুর গ্রামের পাশের কুকরার ভাঙন, শাল্লার ডুমরা, শান্তিপুর, মুক্তারপুর ও মন্নানপুর গ্রামের পাশের জোকারবন্দের ভাঙন এবং এই উপজেলার সুখলাইন, সুলতানপুর ও ঘুঙ্গিয়ারগাঁও গ্রামের পাশের মাউতির ভাঙন। এর কোনটিতেই সোমবার পর্যন্ত কাজ শুরু হয় নি।
ডুমরা গ্রামের তরুণ সমাজকর্মী হিমেল সরকার হিমেল বললেন, এই তিনটি ভাঙনের জন্য ছায়ার হাওরপাড়ের লাখো কৃষক উৎকণ্ঠিত থাকেন। একটি ভাঙন খালিয়াজুরি উপজেলার সীমানায় থাকলেও বাঁধের কাজ করে আসছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত কয়েকদিন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থাকায় কেউ এসব বিষয় খেয়াল করেন নি। এখন এ নিয়ে সকলেই উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে।
শাল্লার ছায়ার হাওরের এই তিনটি ভাঙনসহ ছায়ার হাওর ও ভান্ডাবিল মিলে ৩৬ টি হাওররক্ষা বাঁধের কোনটিতেই কাজ শুরু হয়নি বলে জানালেন শাল্লা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি প্রবীণ গৃহস্থ আব্দুস ছাত্তার।
উপজেলার ঘুঙ্গিয়ারগাঁও ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বিশ^জিৎ চৌধুরী নান্টু বললেন, ছায়ার হাওরের পাশ দিয়ে বহমান দাঁড়াইন নদী থেকে ঢুকেছে জোকারবন্দের হাওরের খাল। এটি খুবই ভয়ংকর হয় নতুন পানি আসলে, বাঁধ কোন কারণে ভাঙলে বানের পানি নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি, কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়ে ফসলের ক্ষতি করে। এই ভাঙনসহ ছায়ার হাওরের তিনটি ভাঙনকে অবহেলার চোখে দেখার সুযোগ নেই। এসব ভাঙনের কাজ শেষ করতে দুই মাস সময় লাগে। আমার জানা মতে এগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের কাজ এখনো শেষ হয় নি। দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন এবং কার্যাদেশ দিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। না হয় বিপদ হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানালন, জেলায় গেল বছর ২০৭ টি ক্লোজার বা ভাঙন চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবার হাওরে পানি কম হলেও ভাঙন বেড়েছে বলে দেখানো হয়েছে। ১০ টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত (সোমবার পর্যন্ত) ২০৬ টি ক্লোজার বা ভাঙন চিহ্নিত করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৩১টি বড় ভাঙন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন ৭০টি ভাঙনে কাজ শুরু করেছেন তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বললেন, মাটি কাটার মেশিন এক্সেভেটর সংগ্রহ, পানি এখনো নামা অব্যাহত থাকাসহ নানা কারণে সবগুলো ভাঙনে বা ক্লোজারে কাজ শুরু করা যায় নি। কোন কোন উপজেলায় সব কয়টি ভাঙনেই কাজ শুরু হয়ে গেছে। এরমধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলার ১২ ক্লোজারের সব কয়টিতে এবং ধর্মপাশার ১৮ ক্লোজারের নয়টিতেই কাজ শুরু হওয়ার দাবি করলেন তিনি। তিনি বললেন, অন্য উপজেলায়ও কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সকল ক্লোজারে কাজ শুরু করার প্রস্তুতির কথাও জানালেন এই কর্মকর্তা।
জামালগঞ্জ উপজেলা রিপোর্টাস ক্লাবের সভাপতি অঞ্জন পুরকায়স্থও উপজেলার ১২ ভাঙনেই বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে বললেন, ভাঙনে এখনো পর্যন্ত (সোমবার পর্যন্ত ) ২৫-৩০ ভাগ কাজ হয়েছে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জের ৫২ টি ছোট বড় হাওরে এবার ৭২০ টি বাঁধের কাজ করা হবে। এজন্য ৭২০ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি হবে। বেশিরভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের কাজ শেষ। নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হবে এবং শেষ হবার কথা ২৮ ফেব্রুয়ারি।

  • [১]