বিশেষ প্রতিনিধি ও সুব্রত দাশ খোকন
ফলন হয়েছে ভালো, ঝড়ো হাওয়া নেই, শিলা বৃষ্টিও হয়নি বললেই চলে। বজ্রপাতের হুঙ্কারও অন্যান্য বছরের চেয়ে কম। হাওরাঞ্চল ব্যাপি নিশ্চিন্তে ঘরে ওঠছে ধান। এজন্য হাওরের কৃষকেরা প্রাণভরা হাসছেন আর দরাজ কণ্ঠে গাইছেন ‘বসন্ত বাতাসে সই গো…’। যেন অন্য রকমের আমেজ হাওরের আকাশে-বাতাসে।
হাওরের তলানির উপজেলা শাল্লার বর্গাচাষী হরলাল দাস (৪৫) বললেন, ৬ কেয়ার (২একর) জমি ৯ হাজার টেকায় (টাকায়) রং জমা (জমির মালিককে নগদ টাকা প্রদান) রাখছিলাম। ধান পাইছি ১৩০ মণ। গত বছর এই জমি কইরা ধান পাইছিলাম ৮৫ মণের মত। গত বছর ধান কাটতে কেয়ারে ২,০০০/- টেকা দিছলাম, ইবার (এবার) কেয়ারে ১৫০০ টেকা দিছি। ইবার দিন ভালা (আবহাওয়া ভালো) ক্ষেতের (ধানের জমির) তলা শুকনা থাকায় ধান কাটার খরচ কম। তবে ইবার নগদ ছাড়া ভাগালোরা (ধান কাটার শ্রমিক) ধান কাটের না, ইতারলাগি ৫০০ টেকা মণে ধান বেইচ্ছা (বিক্রি করে) মজুরি দিছি। অখন ধানের দাম পাইলেই আমরা ধনি। কেউ কোন সাহায্য লইয়া আওন লাগতো নায়।
কেবল হরলাল দাস নয় এই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের একাধিক কৃষক জানালেন, এইবার কেয়ার ২০ থেকে ২২ মণ অর্থাৎ একরে ৬০-৬৫ মণ ধান হয়েছে। যা একর প্রতি অন্যান্য বছরের চেয়ে ২০-২১ মণ বেশি।
উপজেলার নোয়াগাঁওয়ের কৃষক সমীর চক্রবর্তী জানালেন, অধিকাংশ কৃষকের ধান কাটা শেষ, কেউ কেউ ধান শুকিয়ে গোলায় তুলে নিয়েছে। হাওরে যে ধান আছে তা ৪-৫ দিনের মধ্যেই কেটে আনা যাবে।
শাল্লার আনন্দপুর গ্রামের কৃষক প্রশান্ত দাস ও দিরাই উপজেলার রাজানগর গ্রামের কৃষক আব্দুস ছাত্তার বললেন, যে গ্রামে এবার করোনার কারণে শ্রমিক কম এসেছে সেই গ্রামের ১০-১৫ মিলে দল করে এবার ধান কেটেছে। শিক্ষার্থী ও মহিলারা অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি কাজ করেছে। এজন্য শ্রমিকের সংকট বুঝেই ওঠেননি তারা। আবহাওয়া ভালো থাকায় ধান কাটাও এগিয়েছে। এছাড়া ধান কাটার হারভেস্টার ও রিপার মেশিনও এবার অন্য বছরের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।
শাল্লার আনন্দপুরের কৃষক মাখন লাল দাস বলেন, প্রতি বছরই বৈশাখী ঝড়ো হাওয়ায় অনেক ধান ঝড়ে পড়ে, এবার কোন ধানই নষ্ট হয়নি। এই কৃষক অবশ্য বললেন, ‘ শেষ ভালো যার, সব ভালো তার, এখন ধান বিক্রির পালা, সরকার এবার কৃষকরা যাতে ধানের দাম পায়, এজন্য আগাম অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল থেকেই ধান কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখনো ধান সেভাবে কেনা শুরু হয়নি। সরকারের ধান কেনার পরিমাণ খুব কম হলেও সরকার ধান কেনা শুরু না করলে হাওরে ধানের দাম বাড়ে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন বলেন, জেলায় গভীর হাওর ও অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা মিলে গড়ে ৬৪ শতাংশ ধান কাটা শেষ। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বৃহস্পতিবার বিকালে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ২ মিটারের চেয়ে সামান্য বেশি। হাওরের বিপদ সীমা ৫.৫ মিটার। সুতরাং এখন আর কাঁচা ধান কাটার জন্য তাগাদা দেবার প্রয়োজন নেই। জেলার বৃহৎ হাওর শনি, মাটিয়ানে এবং পাগনায় ব্রি ২৯ ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে, তাগাদা না দিলেও আগামী কয়েক দিনে ধান কেটে ঘরে তুলবেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, আবহাওয়ার খারাপ অবস্থা কেটে গেছে, আগামী ৫ থেকে ৭ মে মিয়ানমার উপকূলে ঘুর্ণিঝড়ের কারণে ভারী বর্ষণ হতে পারে। অবশ্য তখন হাওরের নীচু এলাকার ধান কাটাও শেষ পর্যায়ে চলে আসবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, সারা জেলার কৃষক, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারী, গণমাধ্যম কর্মী সকলের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় ধান কাটা শেষের দিকে চলে এসেছে। কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করে লটারী করার পর দ্রুততার সঙ্গে আগামী ১০ মে থেকে ধান কেনা শুরু হবে। ধান ক্রয়ে কোন অনিয়ম সহ্য করা হবে না। কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে হবে।