- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরের ফসলহানি ও হাওর বাঁচাও আন্দোলন

খলিল রহমান
হাওর এলাকার কৃতীপুরুষ বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, হাওরে অতীতে এভাবে ফসলহানি হয়নি। অন্তত তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে এমনটা দেখেননি। ফসল হারিয়ে কৃষকেরা এখন নিঃস্ব। গত ১৭এপ্রিল তিনি কথাগুলো বলেছিলেন সুনামগঞ্জে, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে।
সুনামগঞ্জসহ হাওর এলাকার ফসলহারা মানুষ কতটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন, কতটা অসহায়, হাওরের এই সংকট কতটা গভীর সেটা বুঝতে রাষ্ট্রপতির এই কথার ওপর আর কোনো কথা চলে না। রাষ্ট্রপতির পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সুনামগঞ্জে এসেছেন। দুর্গত মানুষের হাতে তিনি নিজে সহায়তা তুলে দিয়েছেন, সব সময় হাওরের মানুষের পাশে থাকার কথা বলেছেন।k-2
হাওর হলো খাদ্যভান্ডার। মিঠাপানির মাছের আধার। সম্পদ ও সম্ভাবনার অফুরান উৎস। কিন্তু এবার ধানের সঙ্গে মাছও গেছে। কালবৈশাখীতে গেছে অনেকের মাথাগোঁজার ঠাঁই। হাওরের দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
অনেকেই মনে করেন হাওরের এই সংকটে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সুনামগঞ্জে আসার পেছনে সংবাদমাধ্যম যেমন ভুমিকা রেখেছে তেমনি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দালন’ সংগঠনের। তারা এই সংকটকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
এবার সুনামগঞ্জে মার্চ মাসেও বৃষ্টি হয়েছে। তবে ২৭এপ্রিল থেকে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ঠিকমতো হয়নি। কোথায় কোথাও ঠিকাদার ও পিআইসির লোকজন কোনো কাজই করেনি। ফলে অসময়ে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে অসম্পূর্ণ বা বাঁধ না হওয়ায় একের পর এক হাওরের কাঁচা ধান তলিয়ে যেতে থাকে। ১৫৪টি হাওরের মধ্যে ২৪ এপ্রিল সবর্শেষ ফসলহানি ঘটে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে। ক্ষতিগ্রস্ত হন জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষক। এপ্রিলের শুরুতেই জেলাজুড়ে আতঙ্ক শুরু হয়। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। চাল ও আটার দাম বেড়ে যায়। ভয়াবহ খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দেয় সর্বত্র। দুর্যোগ যখন শুরু হয় তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাঁধের কাজে জড়িতরা নিজেদের বাঁচাতে এই বিপর্যয়ের জন্য শুধু প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করতে থাকেন। সরকারের উচ্চপর্যায়েও এই বার্তা দেওয়া হয়। ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’ কে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসাবে চালানোর চেষ্টা করেন কেউ কেউ। কিন্তু তাদের অপচেষ্টার পালে হাওয়া লাগেনি। এক সময় নিজেদের গুটিয়ে নেন তারা।
ফসলহারা কৃষকদের হাহাকারের মধ্যেই নানা মহল থেকে বাঁধ নির্মাণের দুর্নীতি আড়ালের চেষ্টা চলে। তখন সুনামগঞ্জ শহরের কিছু বিবেকবান মানুষ এক জায়গায় বসেন। সেই বসাটা ছিল ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যাতি পাঠাগারে। এতে গণমাধ্যমকর্মীরা বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন। সেখান থেকেই প্রথম আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। জন্ম নেয় ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’। এই সংগঠনের ডাকে জেলা শহর তো বটেই, পুরো জেলায় বিক্ষোভ,k-3 সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। সংগঠনের কর্মীরা শহরের পাড়া-মহল্লায়, বিভিন্ন উপজেলায় ছুটে যান। জেলার সর্বত্র দাবি ওঠে সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার এবং বাঁধ দুর্নীতির বিচারের। দুর্গত এলাকার ঘোষণার দাবির সঙ্গে ফসলহারা কৃষকদের সকল প্রকার ঋণ মওকুফ, খোলাবাজারে কমদামে চাল বিক্রি, হাওরের ইজারা বাতিল করে ভাসান পানিতে মাছ ধরার সুযোগ প্রদানের দাবিগুলো সামনে চলে আসে। স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম হয় হাওরের ফসলহানি নিয়ে। দেশের সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে ওঠে আসে সুনামগঞ্জের বিপর্যয়ের কথা। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয় হাওর ও সুনামগঞ্জ। লিখা হয় নিবন্ধ, একের পর এক সম্পাদকীয়। দৈনিক প্রথম আলো সুনামগঞ্জে গোলটেবিল আলোচনা করেছে। টেলিভিশনে প্রতিদিনের টক শোতে চলে হাওর নিয়ে আলোচনা। সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে ওঠে সরকার।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ৯ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হাওরে ফসলহানি নিয়ে বিশেষ সভা হয়। সুনামগঞ্জের কৃতীসন্তান অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী সাংসদ এম এ মান্নান ছুটে আসেন সুনামগঞ্জে, যোগ দেন সভায়। জেলার সব সাংসদেরাও উপস্থিত হন। প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মীরা বসেন এক কাতারে। সভায়  ক্ষোভে ফেটে পড়েন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। বাঁধ দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন সাংসদেরা। পাউবোর কর্মকর্তারা সেদিন হাওরের ফসল রক্ষায় তাদের গাফিলতির কথা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। প্রধানমন্ত্রী হাওরের সার্বিক পরিস্থিতি সর্ম্পকে অবগত আছেন বলে জানান অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, সরকার হাওরের মানুষের পাশে আছে। বাঁধ দুর্নীতিতে জড়িতদের বিচার হবে। এরপর সরকারের মন্ত্রী, সচিবসহ নানা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসতে থাকেন সুনামগঞ্জে।
আন্দোলন চলতে থাকে। জেলার আইনজীবীরাও আন্দোলনের ডাক দেন। মানববন্ধন করে স্মারকলিপি দেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেই সঙ্গে বাঁধ দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘোষণা দেন তাঁরা। এরপর হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা ‘কৃষক জনতার সমাবেশ ও  সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় ঘেরাও’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৩ এপ্রিল টানটান উত্তেজনার মধ্যে শহরে এই কর্মসূচি পালিত হয়। যদিও কৃষক-জনতার সমাবেশ শেষে হাজারো মানুষ পাউবো কর্যালয় ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। একই দিন দুর্নীতির অভিযোগে সুনামগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয় পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী আফছার উদ্দিনকে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাওরে ফসলহানি ও বাঁধ নির্মাণের দুর্নীতি অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি করে। সর্বশেষ দুদক পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৫ কর্মকর্তা এবং বাঁধের কাজের ৪৬জন ঠিকাদারে বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। পাউবোর এক প্রকৌশলী ও এক ঠিকাদার এখন জেলে আছেন।
কৃষকদের পক্ষে মাঠে নামেন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরাও। ১৪এপ্রিল বর্ষবরণের আনন্দ আয়োজনের বদলে ফসলহারা কৃষকদের প্রতি সংহতি জানিয়ে জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদী অনুষ্ঠান করে। জেলা প্রশাসনও বর্ষবরণের আনন্দ শোভাযাত্রা বাতিল করে। এর মধ্যেই ঘোষণা আসে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সুনামগঞ্জে আসছেন। ১৭এপ্রিল তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত তাঁর প্রিয় সুনামগঞ্জে আসেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখেন। সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসনরাজা মিলনায়তনে জেলার মানুষের সঙ্গে মতিবিনিময় করেন। প্রায় সাড়ে তিনঘণ্টা তিনি মানুষের কথা শুনেন। বক্তৃতায় তিনি হাওরের এই সংকট যথাযথভাবে তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টিতে নিয়ে আসায় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশংসা করেন।
শুধু ফসলহানি নয়, একই সময় হাওরে নতুন দুর্যোগ নেমে আসে। হাওরে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান পচে পানি দূষিত হয়ে যায়। শুরু হয় মাছের মড়ক। দেশজুড়ে এ নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। একই সঙ্গে কালবৈশাখিতে বসতবাড়ি হারান বহু মানুষ। এরপর প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা ৩০এপ্রিল সুনামগঞ্জে আসেন। k-4তিনি শাল্লায় দুর্গত মানুষদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে ফসলহারা কৃষকদের পাশে আছেন বলে জানিয়ে যান। সরকারি-বেসরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ শুরু হয়। এখনো সেটি অব্যাহত আছে। তবে সেই সহায়তা অপ্রতুল। আরও সহায়তা প্রয়োজন। হাওরের মানুষ ভাতের কষ্টে আছে। হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন দুর্গত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও আর কৃষকদের পক্ষে সোচ্চার। তাঁরা বলছেন, মানুষ চরম সংকটে আছে, সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। তাই ত্রাণ সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
হাওরে এমন বিপর্যয় এর আগে আসেনি। মরমি সাধক রাধারমণ দত্ত, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিমের গানের এই দেশে উৎসবই বেশি হয়। হাওরে বোরো ফসল তোলায় কৃষকের সঙ্গে ঘরের নারীরা কী পরিশ্রমই না করেন। এতে কষ্ট নয়, আনন্দ থাকে বেশি। নতুন ধানের গন্ধ তাদের দেহ-মনে শক্তি জোগায়। এই নারীরা ভরা বর্ষায় বাপের বাড়ি নাইওর যান। হাওরে ছোট ছোট ঢেউ তুলে নাইওরী নৌকা ছুটে চলে এক গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে। মাঝির মুখে তখন থাকে সুজন বন্ধুর গান। গ্রামে গ্রামে বিয়েশাদির ধুম লাগে। জোছনা রাতে গান ও কিচ্ছার আসর জমে বাড়ির উঠানে। গ্রামে গ্রামে হয় ভাইয়াপি কুস্তি খেলা। এবার ফসল নেই, তাই হাওরে আনন্দ নেই। জলের মতোই শান্ত-সুনসান পুরো হাওর এলাকা। মানুষের মনে আনন্দের বদলে আছে হাহাকার। ফসল হারানোর নিদারুণ কষ্ট। অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে, লড়াই করে টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।
সুনামগঞ্জ শহরের আমার এক প্রিয়জন, তরুণ নাট্যকর্মী হাওরের ফসলহানি কিংবা মানুষের এই সংকট নিয়ে একটি গল্প লিখে দিতে কদিন থেকে চাপাচাপি করছে। এই গল্প নিয়ে তারা মঞ্চ নাটক করবে। আমি কী নিয়ে লিখব, কার কাহিনী লিখব ভাবি। বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওরপাড়ের পঞ্চাশোর্ধ কৃষক আবদুল আজিজের কষ্টের কথা? যে কৃষক প্রতি বছর চার থেকে পাঁচশ মণ ধান পেতেন। এবার ধান তুলেই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। পাত্র দেখার জন্য এক-ওকে বলেও রেখেছিলেন। তার আগে বসত ঘরটি সংস্কার করবেন। এখন তিনি অসহায়। নাকি তার বন্ধু জামাল উদ্দিনের কথা লিখব। যার দুই মেয়ে কলেজে পড়েন। এখন তাদের লেখপড়া আর পরিবারের খাওয়া-দাওয়া কিভাবে চলবে এই ভেবে তিনি অস্থির। তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের তরুণ মাসুক, রুস্তুম আর খোকনের কাহিনী আমাকে ভাবায়। বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে সকালে খালি পেটে হাওরে ছুটে যায় তারা। এই তিন তরুণের সেদিন এইচএসসি পরীক্ষা ছিল। কিন্তু  সেদিন পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাদের। কারণ, হাওরের ধানই তো ছিল তাদের সব। বিকালে খালি হাতে বাড়ি ফিরে মাসুকের যখন পরীক্ষার কথা মনে পড়ে তখন বুকভেঙে কান্না আসে তার। পিতৃহীন মাসুক তখন দুঃখিনী মাকে জড়িয়ে বলেছিল, ‘মা গো আমি তো পরীক্ষা দিতাম পারলাম না।’ তখন মা-ছেলের চোখের জল একাকার হয়ে যায়।Z 5
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের বদরপুর গ্রামের কলেজছাত্রী হেপির দুঃখের কাহিনী লিখলে কেমন হয়। কথা ছিল ধান তুলেই হেপিকে কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির ভর্তির টাকা আর নতুন বই কিনে দেবেন বাবা। কিন্তু বাবা এখন নিঃস্ব। বাড়ি ছেড়েছেন কাজের খোঁজে। হেপির কলেজ যাওয়া এখন বন্ধ। একই গ্রামের শিপ্রা রানী শীলের ঘরের সামনে গিয়ে স্বামীর খোঁজ করতেই তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার স্বামী কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়েছেন। এখন সপ্তম শ্রেণি পড়–য়া ছেলে সৌরভ ও চতুর্থ শ্রেণি পড়–য়া মেয়ে রিমাকে নিয়ে ঘরে একা আছেন তিনি। ঘরে চাল নেই। আমি যেদিন কথা বলি,  সেদিন সকালে ও তার আগের রাতে ছেলেমেয়েকে নিয়ে আটার রুটি খেয়েছেন। অবুঝ দুই শিশু ভাত খাবে বলে সকাল থেকে মায়ের পিছন পিছন ঘুরছে। মা অসহায়, কষ্ট বুকে চেপে পরম ¯েœহে দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরেন। সঞ্চিতা পালের স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী। নিরুপায় হয়ে স্বামীকে অন্যদের সঙ্গে কাজে পাঠিয়েছেন কোম্পানিগঞ্জের মৃত্যুপুরী পাথর কোয়ারিতে। ছেলে কাজল পাল এবার পঞ্চম শ্রেণি পাস করেছে। সে যখন স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা তখন তাকে নেত্রকোনা শহরের একটি স্বর্ণের দোকানে শুধু থাকা-খাওয়ার চুক্তিতে পাঠানো হয়েছে। ঘরে ছয় বছরের মেয়ে তিশা ও চার বছরের বর্ষাকে নিয়ে আছেন তিনি। কাজল পাল শুধু তিনবেলা ভাত খাওয়ার চুক্তিতে স্কুল, মা-বাবা আর ভাই-বোন ছেড়ে চলে গেছে নেত্রকোনায়। এই কাজল তো এর আগে কখনো গ্রামের বাইরে যায়নি। হাওরের জলে দাপাদাপি করে কাটিয়েছে অলস দুপুর। হাওরের বিপর্যয় তাকে গ্রাম ছাড়া করেছে। মায়ের কোল, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আদরের ভাই-বোন থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তার কষ্টের কাহিনী কি কারো হৃদয় স্পর্শ করবে না।
এখন এই সময় হাওরে কান পাতলেই এ রকম অনেক দুঃখ-কষ্ট আর বেদনার করুণ গল্প শুনতে পাবেন আপনি। ঘরে ঘরে কান্না, হাহাকার আর কষ্টের গল্প আছে। আমরা ক’জনার খবর পাই। গল্প তো আরও আছে, যাদের কারণে হাওর ডুবল, যারা লাখো লাখো কৃষক পরিবারকে ঠেলে দিল চরম দুর্যোগ আর অনিশ্চিত জীবনের দিকে, সেই সব দুর্বৃত্ত, খলনায়কদের নিয়েও তো লিখা যায়। যারা মানুষের কষ্টে হাসে, মানুষের রক্ত চুষে নিজের বিলাসিতার সিঁড়ি বানায়।
হাওরের এই সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবার কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে বড় রাজনৈতিক দলগুলো একটা ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেটা দেখা যায়নি। এর পেছনে বহুবিধ কারণ আছে বা থাকতে পারে। তবে দুয়েকটি ছোট দল এ নিয়ে কথা বলেছে এবং ক্ষুদ্র পরিসরে এখনো বলছে। তাই অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনকে সাধারণ মানুষ আস্থায় নিয়েছেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। কেন হাওর বাঁচাও আন্দোলন? প্রায়ই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় এর সংগঠকদের। এ প্রসঙ্গে সংগঠনের আহবায়ক সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরীকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলতে শুনি, হাওর এখন মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। হাওরকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তাই একে বাঁচাতে হবে। হাওর রক্ষা না হলে এ জনপদের মানুষের দুঃখ ঘুচবে না। তাই তারা কথা বলছেন এবং যতদিন হাওরে সংকট থাকবে ততদিন বলবেন। আমরাও মনে করি এই আন্দোলন সুনামগঞ্জের সকল মানুষের আন্দোলন। আমরা উন্নয়নের কথা শুনি। আমরা হাওরের উন্নয়নের পক্ষে। তবে এর সঙ্গে ‘কমিউনিটি’, ‘স্টেকহোল্ডার’ এ জাতীয় কিছু বাণিজ্যিক শব্দ ঢুকে পড়েছে। মনে রাখতে হবে, এর পেছনে কিছু লোকের ধান্দা থাকে। প্রকৃত উদ্দেশ্য ধামাচাপা দিয়ে ধান্দাবাজেরা সাধারণ মানুষকে ধান্দায় ফেলে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেয়। তাই হাওরকে হাওরের মতো রেখেই সব কাজ করতে হবে। সকল কাজে স্বচ্ছতা ও হাওরপাড়ের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য এখন যেমন আছে তেমনি সব সময় ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’ যেন হাওরের মানুষের পাশে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক ও আইনজীবী

 

  • [১]