হোসেন তওফিক চৌধুরী
হাওর-নদী-নালা বেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জের হাওরগুলো শস্য শ্যামলাপূর্ণ। কিন্তু নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং নদী নালার পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় হাওরের ফসল রক্ষা অত্যন্ত ঝুঁকির সম্মুখিন। নদীর পানি বেড়ে গেলেই হাওরের সোনা ফলা ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এতে শুধু কৃষকেরই সর্বনাশ হয় না, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা। হাওরের ফসল রক্ষার জন্য সরকার বাঁধ নির্মাণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। প্রতি বছরই বাঁধ নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমান অর্থ বরাদ্দ দিয়ে আসছেন কিন্তু কোন বছরই সঠিক সময়ে ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়মিত হয় না। দুর্নীতি, কারচুপি অবহেলা ও উদাসিনতার জন্য ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এতে হাওর পাড়ের মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ, দুশ্চিন্তা ও আশংখার পরিধি বাড়ে।
বিগত বছরের কথা বাদ দিলেও বর্তমানে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে কি হচ্ছে? ফসল রক্ষা বাঁধের দিকে তাকালেই সহজেই অনুমিত হবে যেন একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই।
হাওর এলাকার মানুষ এবং কৃষক সংঘটন যথা সময়ে বাঁধ নির্মাণের সোচ্ছার দাবি জানালেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। ঢিমে তেতালা গতিতে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ চলছে। কোন কোন প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে আবার কোন কোন প্রকল্পে কাজই শুরু হয়নি। সর্বত্র একই চিত্র বিরাজ করছে। চলতি বছরে জেলায় ৭১৬টি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার ৬৩.৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাত্র ৪২০টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ২৯৬টি প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি। কবে শুরু হবে নিশ্চয়তা নাই। ২৮ শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ হওয়ার কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না। ২৮ শে ফেব্রুয়ারী সীমারেখা দেওয়া হয়েছে ভৌগলিক অবস্থা বিবেচনা করেই। এই সময়েই অকাল বন্যার প্রকোপ দেখা দেওয়ার আশংকা রয়েছে। বাঁধ যদি সঠিক সময়ে নির্মাণ করা না হয় তাহলে প্রায় প্রতিটি হাওর অরক্ষিত থাকে। অকাল বন্যার পানি প্রবল বেগে হাওরে প্রবেশ করে কৃষকের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফসল কেড়ে নিয়ে যায়। মানুষের চোখের সামনেই তাঁর স্বপ্নের ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। ফসল তুলতে না পারলে হাওর এলাকার মানুষের জীবনে ঘোর অন্ধকার দেখা দেয়। মানুষের জীবন যাত্রায় ছন্দ পতন ঘটে ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য যে, হাওর এলাকা এক ফসলের এলাকা। ধান ছাড়া আর কোন ফসল নেই। হাওরে মাছের ফসল আছে। কিন্তু সে মাছ ইজারাদারের। হাওরের মৎস্য সম্পদে কৃষকের কোন অধিকার নেই।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বাঁধ নির্মাণের কাজ পরিদর্শন করছেন। তাগিদ দিচ্ছেন যথা সময়ে বাঁধ নির্মাণের জন্য। কিন্তু এতেও কোন কাজ হচ্ছে না। বাঁধ নির্মাণে কর্তৃপক্ষকে কঠোর মনোভাব নিতে হবে। এই ব্যাপারে কোন ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বাঁধ নির্মাণে ছিনিমিনি বা লুকোচুরির ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ফসল রক্ষা বাঁধ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যাপার। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগুতে হবে। এতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সর্বাধিক। কর্তৃপক্ষকে যথা সময়ে প্রয়োজনীয় বিধি ব্যবস্থা গ্রহণে কোন বিকল্প নেই। সবাইকে সক্রিয় ও কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন বোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে কর্তব্য পালন জনগণ প্রত্যাশা করে।
লেখক : আইনজীবী-কলামিষ্ট।