- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরে কাস্তে হাতে শিশুরা

সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
ইউএনও’র মাইকিং, চারদিকে পানির উলি, গাঙ্গের পানি খালি বাড়ের, সব সময় ডরের মধ্যে থাকি, কোন সময় বাঁধ ভাইঙ্গা ক্ষেত তলইয়া যায় ! এদিকে ব্যাপারী (ধান কাটার শ্রমিক) আসে নাই, ক্ষেত করছিলাম ত্রিশ কেদার, কাটছি মাত্র আটারো কেদার, তাই উপায় না দেইখ্যা আমার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়–য়া একমাত্র ছেলে, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পড়–য়া দুই ভাতিজা ও ভাই মিলে নিজেরাই ধান কাটা লাগাইছি। কামলার লাইগ্যা বইয়া থাকলে পাইন্যে ভাসাইয়া নিলে তো সব শেষ। আগে খাওয়া, পরে লেখা-পড়া। বাড়ির বেটাইনতে মিলে ধান কাটি, রাতে ধান ভাঙ্গাই আর বাড়ির বেইটাইনে খলাত ধান শুকায়। আর চার-পাঁচ দিন সময় পাইলেই অয়।
উপরের কথাগুলো বলছিলেন শাল্লা উপজেলার ভান্ডাবিল হাওর উপ-প্রকল্পের আওতাধীন প্রতাপপুর গ্রামের কৃষক দুলাল চন্দ্র দাস (৫৮)।
হাওরে বাঁধ ভেঙ্গে বা উপচে ফসল ডুবির ঘটনা ঘটছে। চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতে হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে শাল্লা উপজেলার ছোট ছোট কিছু হাওর তলিয়ে যায়। এরপর নদীর পানি আবার কমতে শুরু করলে কৃষকেরা আশায় বুক বাধে। কিন্তু বৈশাখের শুরুতেই আবার নদীর পানি আগের থেকে বেশী বেড়ে যাওয়ায় যেকেনো সময় বাঁধ ভেঙ্গে হাওরের ফসলহানির আশংকা থেকে ধান কিছুটা পাকার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ধান কাটার তোড় জোড়। বয়স্ক মানুষের পাশাপাশি এখন একাজে হাত লাগাচ্ছে শিশুরাও।
গত দু’দিন শাল্লা উপজেলার অধিকাংশ হাওর ঘুরে দেখা গেছে, মহিলা ও শিশুরা কাস্তে হাতে পরিবারের পুরুষ সদস্য ও শ্রমিকদের পাশাপাশি ধান কাটছে। ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশংকা থেকেই দ্রুত ধান কেটে গোলায় তুলতেই মহিলা ও শিশুরা একাজে অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
শনিবার সকাল ১০টায় ছায়ার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, সুখলাইন গ্রামের কল্যাণব্রত দাস (৫৫) তাঁর সপ্তম শ্রেণিতে পড়–য়া একমাত্র ছেলে স¤্রাটকে নিয়ে ধান কাটছেন। তিনি বলেন, দশ কেদারের মধ্যে সাত কেদার কাটছি। ক্ষেতে ডগইরা (বৃষ্টির পানি) লেগেছে। শ্রমিকরা কাটতে চায় না, তাই বাপ-বেটা মিল্লাই কাটা লাগাইছি। একটু অদূরে ছাওর হাওর উপ-প্রকল্পের শান্তিপুরের লাগোয়া বন্দে একদল শিশু শ্রমিককে ধান কাটতে দেখে তাদের কাছে গিয়ে কথা হয় মিঠুন, প্রহর, ইমন, কনক, স্বচ্ছ ও পলাশদের সাথে। তাদের প্রত্যেকের বাড়ি ডুমরা গ্রামে এবং প্রত্যেকেই শাল্লা উপজেলা সদরের শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র।
তাদের দলনেতা একদশ শ্রেণিতে পড়–য়া কনক এ প্রতিবেদককে বলে, আমাদের গ্রামের লাগোয়া কৈয়ারবন ও পুটিয়ার বন চৈত্র মাসেই তলিয়ে গেছে। তাই অন্যের জমিতে ধান কেটে পারিশ্রমিক নিয়ে নিজের পরিবারের সাহায্যের পাশাপাশি যাদের ধান কাটছি তাদেরও কিছুটা উপকার হচ্ছে। আসলে আমরা বিশ জন ছাত্র আমাদের বিবেক-বোধ থেকেই এটা করছি।

  • [১]